পুনর্মৃত্যু পুনর্জন্ম
প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০১৩, ১৭:৫১
বাঘ খাইল নেকড়ে। তারপর আরামে ঘুম দিয়ে উঠবার পর আয়েশ করে ঘুরে ফিরে বেড়ানোর সময়ই সে নেকড়ে হয়ে গেল। জানি আপনারা অবিশ্বাস করছেন তবে ঘটনা এটাই সত্যি ছিল। আমি বুকে হাত রেখে বলতে পারি নেকড়েটা খাবার পর বাঘটাই নেকড়ে হয়ে যায়। বাঘ কি নেকড়ে খায়? নিশ্চয়ই আপনি ভুল দেখেছেন, হয়তো বাঘ যেখানে ঘুমিয়ে ছিল সেখানে খানিক পর আপনার চোখের ফাঁক দিয়ে আরেকটা নেকড়ে এসে ঘুমিয়েছিল, এ ধরনের প্রশ্ন আর কথার উত্তর না দিয়ে আমি আপনাদের মূল ঘটনাটাই খুলে বলতে আগ্রহী। তারপর আপনারই সব মিলিয়ে নিতে পারবেন, বুঝতে পারবেন সমস্ত ঘটনাটা। কথাগুলো বলে একটু জিরানোর জন্য দম নিতে থামলেন বন বিভাগের প্রাক্তন রেঞ্জার অফিসার আলী আশরাফ। শুকনো মুখের একরাশ দাড়ির মাঝ দিয়ে তার চোখদুটো জ্বলজ্বল করছিল। সমস্ত শরীরটা টানটান হয়ে যাচ্ছিল, যেন চোখের সামনে কোনো ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। আমি অনেকবারই খেয়াল করেছি বিশেষ কোনো ঘটনা বর্ণনার আগে তার শরীর এরকম শিকারীর মতো হয়ে যায়। চালাক, ভয়ঙ্কর কোনো নির্মম শিকারি। নিজের হাতে বউ আর বউয়ের প্রেমিককে গুলি করে মারার অপরাধে জেল খাটার সময় তার সাথে আমার পরিচয়। আমিও বউ মারার অপরাধে জেল খাটছি শুনে প্রথম থেকেই তার সাথে আমার পরিচয় গাঢ় হয়ে ওঠে। আমি অবশ্য ওনার মতো এক গুলিতেই কাজ সারতে পারিনি, কারণ আমার বন্দুকই নেই এবং গুলি করে মারার মতো ধৈর্যও আমার হতো না।
বন্দুকের অভাব বা ইচ্ছা কিংবা রেঞ্জার সাহেবের সাথে পরিচয়ের অভাবেই হোক বউটারে আমি মনে হয় একটু নৃশংসভাবেই মেরেছিলাম। খুন করার পদ্ধতি শুনে রেঞ্জার সাহেব ঠিক এই শব্দটাই উচ্চারণ করেছিলেন? ‘নৃশংস’। যা হোক গল্প আবার শুরু হয়ে গেছে, কয়েদিরা সব তন্ময় হয়ে তাকিয়ে আছে দেয়ালের কোণ ঘেঁষে বসে থাকা লোকটার দিকে। এমন সময় বাইরের কারাপ্রহরীরা ঝামেলা করে। অবশ্য করারই কথা, এই গল্পের আসর দেখে প্রত্যেকেরই মনে হবে, নতুন কোনো ধর্মপ্রচারক বুঝি তার শিষ্যদের দীক্ষা দিচ্ছেন। আমার মাঝে মাঝেই বিভ্রম লেগে যায়, আলী আশরাফ বুঝি সত্যই কোনো ধর্মপ্রচারক, রাজ্যের পাপী রাজা হয়তো তাকে সেই অপরাধেই কারাগারে পুরে রেখেছেন। আমি লোহার ঠান্ডা শিকে হেলান দিয়ে আমার বিভ্রমের নবীর দিকে তাকাই। তিনি বলে চলেন, ব্যাপারটা তলিয়ে দেখতে আমি গাছ থেকে নেমে পড়ি। চারপাশে গভীর জঙ্গল এত নীরব যে সেখানে মানুষও গাছ হয়ে যায়। নেকড়েটা ধীর পায়ে হেঁটে চলছিল উত্তর থেকে দক্ষিণে। সেখানে জঙ্গল হালকা থাকলেও বিপদটা সেখানেই বেশি। বিষাক্ত সব সাপেরা সেখানে হিসহিস করে কিলবিল করছে। একসাথে এত সাপ যে কী ভয়ঙ্কর সুন্দরের জন্ম দেয় তা যে দেখেনি তাকে বোঝানো দায়। ইচ্ছে হয় সবগুলো সাপের মাঝে গিয়ে শুয়ে পড়ি, সাপের সাথে মনে হয় সঙ্গমের কোনো সর্ম্পক আছে, বুঝলে? কেমন আদিম আদিম একটা রতিক্রিয়া। নেকড়েটা নির্দ্বিধায় সেই সাপের আবাসে ঢুকে লম্বা চকরা-বকরা হলদে কালোয় মেশানো একটা সাপ তুলে নিয়ে এক থাবায় মাথাটাকে ধর থেকে আলাদা করে কোত্ করে গিলে ফেলল। তারপর সেই বাঘটার মতোই আয়েশ করে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। আমি গাছের আড়ালে লতার মতো মিশে আছি। নিজের কাছেই ভয় লাগতে লাগল আবার গাছ না হয়ে যাই!
দুপুরের আলো কমে এসে বিকালের আলো গায়ে লাগতেই নেকড়ের শরীরের পরিবর্তন স্পষ্ট দেখতে পেলাম। চকচকে বিশালাকার এক উজ্জ্বল সাপ হয়ে সে তখন বুকে ভর দিয়ে চলা শুরু করেছে। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি, সত্যি বলতে কি এত সুন্দর সাপ আমি কখনো দেখিনি আমার সঙ্গমের ইচ্ছা আবার বেড়ে যায়। বোধহয় সেই কামনাতেই আমি সাপটার পিছু নেই। সাপ তখন চলছে আরও দক্ষিণে। সেখানে ভীষণ পচা এক ডোবা। তার জল এত কালো যে দেখলে মনে হয় কালো পাথর। গুটিসুটি মেরে নিজেকে পেঁচিয়ে সাপটা খানিক সেখানে ঝিম মেরে থাকল। আঁধার তখন জাঁকিয়ে আসছে, সেই আবছা আলোয় ব্যাঙের ক্যাঁককোঁত আর সাপের নড়াচড়া দেখে বুঝলাম সাপ তার খাবার পেয়ে গেছে। আমি চোখের আলোয় কুলিয়ে উঠতে না পেরে আরও কাছে এগিয়ে যাই। ব্যাঙের ককানিই এখন ভরসা। সন্ধ্যার ডাকাডাকি জাঁকিয়ে বসতেই ব্যাঙ নিস্তেজ হয়ে এলো। সাপের হলদে গা কুণ্ডলী পাকিয়ে সরসর করে পুরোনো পাতার ঝোপের মাঝে আস্তানা গাড়ল। আমি পাতার শব্দ অনুসরণ করে কান পেতে থাকি, কান ব্যাথা হয়ে আসতে আসতেই যা ভাবছিলাম ঠিক তাই ঘটে যায়। ঝোপটা নাড়া দিতেই ঘ্যাংঘ্যাং করতে করতে হলুদ একটা সোনা ব্যাঙ লাফ দিয়ে বের হয়। বাপরে বড় সোনাব্যাঙ। সমস্ত কিছুই কেমন যেন রহস্যের, তবুও আলোয় বিবেচনা করে দেখব বলে আমি ব্যাঙটাকে নিয়ে আসি। বলে বিশাল এক দীর্ঘশ্বাস ঝরে পড়ল প্রাক্তন রেঞ্জারের গাঁজালো নাক থেকে।
কয়েদিরা সবাই আরও এঁটে ধরে, তারপর কী হলো, তারপর আর কী, সেই ব্যাঙ গেলো বউয়ের প্যাটে। নিজের চোখের সামনে বউটা তারপর ব্যাঙ হয়ে পোকা খেতে লাগল। আমার ইচ্ছা ছিল সাপের, বুঝলে? সাপের সাথে শোয়ার ইচ্ছা ছিল, ঠান্ডা শিরশিরে সাপের সাথে। আগে থেকে যদি সাপটাকেই ধরতাম! তার সেই সাপ না ধরতে পারার হাহাকার সমস্ত প্রাচীরে যেন সাপের মতো হিসহিস করে ওঠে। বুঝলে তো বিষয়টা হলো তা-ই, তুমি যা খাও তুমি তা-ই হয়ে যাও। রেঞ্জার সাব গল্পের নীতিকথা টেনে নোংরা গন্ধময় বাথরুমের মতো জায়গায় জয়নালকে নিয়ে ঢুকে পড়ে। পরিচিত শব্দের ভিড়ে আমরা অপেক্ষা করি জয়নালের আলী আশরাফ হয়ে যাবার।