দিলওয়ার, শাহ আবদুল করিম
ও কিছু কথা
প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০১৩, ১৭:৫৩
দিলু ভাই চলে গেলেন। ‘গণমানুষের কবি’ হিসেবে খ্যাত দিলওয়ার গত ১০ অক্টোবর ৭৬ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন। তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ছিল বেশ মধুর। কবিপুত্র কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে তিনি আমাকে বেশ পছন্দই করতেন। বারকয়েক তাঁর প্রেরিত খুদেবার্তায় এ বিষয়টি টের পেয়েছিলাম। বছর সাতেক আগে কিছু বিষয়ে মতভিন্নতা তৈরি হওয়ায় ধীরে ধীরে তাঁর কাছ থেকে সরে যেতে থাকি। একই সময়ের ব্যবধানে কিশওয়ার মারা যাওয়ায় কবির বাসভবন ভার্থখলার ‘খান মঞ্জিল’-এ আমার উপস্থিতি অনেকটাই অনিয়মিত হতে থাকে। সেসব ভিন্ন কথা, অন্য প্রসঙ্গ। এর বাইরেও কবির সঙ্গে রয়েছে বেশকিছু স্মরণীয় মুহূর্ত, অম্ল-মধুর স্মৃতি। সেসবই বরং বলা যেতে পারে।
সময়টা ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দ। তখন এমসি কলেজে পড়াশোনা করতাম। ওইসময় একদিন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেত্রী সুহাসিনী দাসের নির্দেশে ‘রবীন্দ্র-নজরুল জন্মজয়ন্তী উত্সব’-এর আমন্ত্রণপত্র নিয়ে তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলাম। কবি আমাকে পেয়ে কাছে বসিয়ে কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন। এরপর প্রায় তিন ঘণ্টা নানা বিষয়ে একনাগাড়ে কথা বললেন। আমি বারকয়েক ওঠার চেষ্টা করেও পারিনি। অনেকটা বিরক্তি, অনিচ্ছা সত্ত্বেও আগ্রহ নিয়ে তাঁর কথাগুলো শুনি। ধীরে ধীরে বুঝতে পারি—তাঁর নির্দেশনামূলক বক্তব্য আর কবিতাপাঠ আমাকে মোহাবিষ্ট করে ফেলেছে।
ওইদিন কবির স্বকণ্ঠে শুনেছিলাম তাঁরই লেখা বিখ্যাত ‘কীনব্রিজে সূর্যোদয়’ কবিতাটি। কবি সেদিনই জানিয়েছিলেন, ভাটির বাউলসাধক শাহ আবদুল করিমের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সখ্যের প্রসঙ্গ, নানা অনুষঙ্গ। আবদুল করিম প্রণীত ‘কালনীর ঢেউ’ (১৯৮১) বইয়ের ভূমিকা লিখে দেওয়ার কথাও কথাপ্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন। এভাবেই তাঁর সঙ্গে পরিচয়। ওইদিনের পরিচয়ের সূত্র ধরে সময়-অসময়ে তাঁর কাছে ছুটে যেতাম। এ সময়টাতেই কবিপুত্র কিশওয়ারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। অল্প সময়ের ব্যবধানে কবিও আমাকে আপন করে নেন।
দিলওয়ারের বাড়িতে আমার উপস্থিতি বেড়েই চলে। কবির অনুপ্রেরণায় আমার আড্ডা আর কাব্যচর্চায় নতুন মাত্রা যোগ হয়। তখনই গোগ্রাসে পড়তে শুরু করি শঙ্খ ঘোষ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, শামসুর রাহমান থেকে শুরু করে দিলওয়ারের কবিতা। আমার আগ্রহ দেখে দিলওয়ার তাঁর দুষপ্রাপ্য কিছু পুরোনো বইয়ের ফটোকপি করিয়ে আমাকে পড়তে দেন। এভাবেই দিলওয়ার-পাঠ চলে। সময় যায়। কবির সঙ্গে হূদ্যতা বাড়ে। আমার অনুরোধে কয়েকজন নবীন সাহিত্যকর্মীর জন্মদিন ও বিয়েকে উপলক্ষ করে বেশকিছু কবিতা রচনা করেন, যা আমার সম্পাদিত একাধিক ছোটকাগজে প্রকাশিত হয়। কবির দু-একটা ছোটখাটো সাক্ষাত্কারও অডিও-রেকর্ড করে নিই।
সময়টা ঘোরের মধ্যে কাটতে থাকে। পড়াশোনার ফাঁকে সময়-সুযোগ পেলেই কবির কাছে ছুটে যেতাম। কবির বাড়িতে শুরু হয় আমাদের তরুণ কয়েক বন্ধুর অবাধ যাতায়াত। আমরা বিমুগ্ধ হয়ে একের পর এক দিলওয়ারের কবিতা, গান ও লেখা পাঠ করতে থাকি। আবিষ্ট হয়ে পড়তে শুরু করি ‘কীনব্রিজে সূর্যোদয়’, ‘নেলসন মানদেলা : একটি আগ্নেয় স্মরণ’, ‘সূর্য অস্ত যায় না কখনো’, ‘মানচিত্রে যে-পৃথিবী’, ‘একদিন হিটলারও ভাবতেন’, ‘কোনো এক এগারো বত্সরের ধর্ষিতা মেয়েকে’, ‘মাতৃভূমির প্রশ্নে’, ‘শ্রদ্ধেয় পিতা ক্ষমা করবেন’, ‘অতীন তোমাকে’, ‘রক্তে আমার অনাদি অস্থি’, ‘কীনব্রিজে গোধূলি’, ‘জনৈক অনাগত নেতার ঘোষণা’ কবিতাগুলো। এসব কবিতার অনেক পঙিক্ত এখনো আমার মুখস্থ রয়েছে।
কবির লেখা বিখ্যাত ও বহুল পঠিত কবিতাগুলোর প্রায় সবকটিই ১৯৫৩ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে লেখা। এ সময়ের ভেতরেই প্রকাশিত হয়েছিল কবির লেখা ‘জিজ্ঞাসা’ (১৯৫৩), ‘ঐকতান’ (১৯৬৪), ‘উদ্ভিন্ন উল্লাস’ (১৯৬৯), ‘বাংলা তোমার আমার’ (১৯৭২), ‘স্বনিষ্ট সনেট’ (১৯৭৯), ‘রক্তে আমার অনাদি অস্থি’ (১৯৮১), ‘নির্বাচিত কবিতা’ (১৯৮৭) কাব্যগ্রন্থগুলো। অসামপ্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ, বস্তুবাদী, মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন ও যুক্তিবাদী মানুষকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করত দিলওয়ারের কবিতা। বয়সের কারণেই তখন কবির লেখা আমাদের কাছে হয়ে উঠেছিল তারুণ্যের স্লোগান : ‘বিপ্লবের রক্তঅশ্ব ডেকে গেছে বহুবার/ বাঁধন ছিঁড়ে—/ সর্বহারা মানুষের ভিড়ে \’
আমরা তরুণেরা যখন দলবেঁধে দিলওয়ার-সংশ্রবে যেতাম, তখন তিনি প্রায়শই একটি কবিতার বিশেষ কিছু পঙিক্ত বারবার আওড়াতেন। কবি বলতেন—‘এই কবিতা পুরো বাংলাদেশকে ধারণ করে রয়েছে, এই কবিতা পুরো বিশ্বকে ধারণ করে রয়েছে।’ কবি নিজেই যখন তাঁর কবিতার এমন প্রশংসা করতেন, সেখানে আমরা কবিতাটির বিশেষত্ব খোঁজার চেষ্টা করতাম। কবির মুখে এত বেশিসংখ্যকবার পঙিক্তগুলো আমাদের শোনা হয়েছিল, যার কারণে কবিতাটি বারবার পাঠ না-করেই অনেকটা মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল।
‘শ্রদ্ধেয় পিতা ক্ষমা করবেন’ শীর্ষক এই কবিতাটি তখন আমাদের মুখে মুখে ফিরত। ২৯ পঙিক্তর এ কবিতাটি আমাদের এত বেশিই আকর্ষণ করেছিল, সেটা কম্পিউটার কম্পোজ করে পড়ার টেবিলের ঠিক সামনে সেঁটে দিয়েছিলাম। যে-কেউ কক্ষে ঢুকলেই প্রথমে চোখে পড়ত ওই কবিতার পঙিক্তগুলো : ‘শ্রদ্ধেয় পিতা ক্ষমা করবেন যদি অপরাধ হয়/ আমরা কি আজো দিতে পারলাম/ মানুষের পরিচয়?/ ডুবে আছি আজো খণ্ডে খণ্ডে সামপ্রদায়িক পাঁকে/ দম্ভদূষিত নাগপাশে বেঁধে/ মানুষের বিধাতাকে।/ [...]/ শুধু মুখে নয় বুকেও ক্ষরিত সামপ্রদায়িক বিষ,/ অঘ্রানে তাই ব্যথারক্তিম ঐশী ধানের শিষ।/ কতকাল ধরে, বলতে পারি না,/ আত্মহনন কাজে—/ ব্যস্ত রয়েছি আমরা সবাই। প্রভাত মথিত সাঁঝে।/ [...]/ ঔরসজাত মানবতা চাই/ কালের শুদ্ধসুধা/ রক্তে আমার এই তো ধর্ম,/ এই তো মাতৃক্ষুধা।’
কবি দিলওয়ারের বাড়িতে যেতে-যেতেই পরিচয় ঘটে আমার সমবয়সী বেশ কয়েকজন যশপ্রত্যাশী নবীন কাব্যচর্চাকারীদের সঙ্গে। যাদের কেউ কেউ এরই মধ্যে কবি হিসেবে বিশেষ তকমাও পেয়ে গেছেন। এদের নিয়েই কবি-তনয় কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ারকেন্দ্রিক আরও একটা ছোটখাটো আড্ডার জটলা তৈরি হয়ে পড়ে। বিশেষ করে সিলেট শহরের জিন্দাবাজার এলাকার প্রীতিরাজ রেষ্টুরেন্টে সন্ধ্যার পর নবীন-প্রবীণ কবিদের সমন্বয়ে আড্ডা ব্যাপকতা লাভ করতে থাকে। তখনকার সময়ে সপ্তাহের কিছু বিশেষ দিনে শহরে একাধিক সাহিত্য সংগঠন সাহিত্য-আড্ডার আয়োজন করত। সেসব আড্ডায়ও কিশওয়ারসমেত আমাদের ছিল নিয়মিত উপস্থিতি।
কিশওয়ারের কাব্য-প্রতিভায় আমরা কয়েকজন অনতিতরুণ ক্রমশ মুগ্ধ হতে থাকি। ধীরে ধীরে তাঁর পিতা দিলওয়ারের চেয়ে তিনিই আমাদের কাছে আরও আপন হয়ে ওঠেন। তিনি নতুন কবিতা লেখার পর প্রথমেই পাঠ করে আমাদের শোনাতেন। আমরাও কবিতা লিখে কিশওয়ারকে দেখাতাম। তিনি ভুল-ত্রুটি ধরিয়ে দিতেন আর ছন্দ-উপমা-উেপ্রক্ষা সম্পর্কে ধারণা দিতেন। কেবল কবিতা পাঠই নয়, কিশওয়ারের শরীরে দীর্ঘদিন ধরে বাস-করা সিজোফ্রেনিয়া রোগ সম্পর্কে তিনি আমাদের অভিজ্ঞতার কথা বলতেন। তাঁর কাছে এ রোগের ভয়াবহতা শুনে শিউরে উঠতাম। এভাবে নানা কথা ও কাব্যচর্চায় প্রীতিরাজ রেষ্টুরেন্টের আড্ডা ব্যাপকতা পেতে শুরু করে। একসময় আড্ডায় সব বয়সী সাহিত্যকর্মীর জটলা বাড়তে থাকে। আমাদের এ আড্ডার খবর যখন শহরের সাহিত্যকর্মীদের মধ্যে ভিন্ন উদ্দীপনা তৈরি করতে সবেমাত্র শুরু করেছে, তখনই না-ফেরার দেশে চলে গেলেন কিশওয়ার। দিনটি ছিল খুব সম্ভবত ২০০৬ সালের ৮ ডিসেম্বর।
কিশওয়ারের প্রস্থানের সঙ্গে সঙ্গে আড্ডারও পরিসমাপ্তি ঘটে। অতঃপর বিচ্ছিন্নভাবে কিছুদিন আড্ডা চলে, তবে সে আড্ডায় মোটেই প্রাণ ছিল না। কিন্তু এভাবে আর কতদিন? একদিন ঠিকই আড্ডার মৃত্যু হয়। ফলে কিশওয়ারবিহীন আমরা যে যার মতো করে সাহিত্যচর্চা শুরু করে দিই। কিশওয়ারের প্রয়াণের পর তেমন করে আর কখনোই দিলওয়ারের সঙ্গে আড্ডা হয়ে ওঠেনি। তবে কোনো বিশেষ প্রয়োজনে যখন দিলওয়ারের কাছে যেতাম, তখন কিশওয়ারের ঘনিষ্ঠজন ভেবেই হয়তো তিনি স্বপুত্রের জন্য খেদ প্রকাশ করতেন, ছেলের অকাল প্রয়াণে আফসোস করতেন। সেসব শুনে আমার চোখ ভিজে উঠত। তাঁদের বাবা-ছেলের বিচ্ছেদের মতোই নানা কারণে একসময় প্রায় আমারও বিচ্ছেদ ঘটে কবি দিলওয়ারের সঙ্গে। অতি-ঘনিষ্ঠজন দিলওয়ারের সঙ্গে তৈরি হওয়া কিছু দূরত্বের মধ্যেই চলতে থাকে আমার মতো অখ্যাত এক তরুণের সাহিত্যচর্চা।
২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘শাহ আবদুল করিম সংবর্ধন-গ্রন্থ’। বেশ কয়েক বছর ধরেই বাউলসাধক শাহ আবদুল করিমের জীবন ও সাহিত্যের মূল্যায়নধর্মী একটি বই প্রকাশের পরিকল্পনা নিয়েছিলাম। সেটি কিশওয়ার ভাইকে জানিয়ে তাঁর একটা লেখাও চেয়েছিলাম। কিন্তু সময়ের অভাবে কিশওয়ার সে লেখা প্রস্তুত করতে না-পেরে আমাকে তাঁর পুরোনো একটি লেখা পুনঃমুদ্রণের জন্য দিয়েছিলেন। ওই লেখাটি সিলেটের স্থানীয় পত্রিকা সিলেট বাণী ও যুগভেরী পত্রিকায় মুদ্রিত হয়েছিল। পত্রিকা দুটির ফটোকপি এবং ওই লেখাটি প্রকাশের অনুমতিপত্র (চিরকুট জাতীয় কাগজের টুকরো) একটি খাকি খামে ঢুকিয়ে কোনো এক আড্ডায় আমাকে দিয়েছিলেন।
শাহ আবদুল করিম সংবর্ধন-গ্রন্থ প্রকাশের আগে যেহেতু ওই বাউলসাধককে নিয়ে কোনো মূল্যায়নধর্মী গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি, তাই আমি চেয়েছিলাম করিম বিষয়ক অমুদ্রিত লেখার পাশাপাশি ইতঃপূর্বে পত্র-পত্রিকা-সাময়িকীতে মুদ্রিত যাবতীয় লেখা সংকলিত করব। এ পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮১ সালে শাহ আবদুল করিমের প্রকাশিত গানের সংকলন কালনীর ঢেউ বইয়ের ভূমিকাটিও সংকলিত করি। ‘কালনীর ঢেউ প্রসঙ্গে দুটি কথা’ শীর্ষক ওই ভূমিকাটি লিখেছিলেন করিমের বন্ধুতুল্য ঘনিষ্ঠজন কবি দিলওয়ার। তাড়াহুড়ো আর বেখেয়ালে কবি দিলওয়ারের লেখাটি পুনঃমুদ্রণের ব্যাপারে লেখকের মৌখিক কিংবা লিখিত কোনো অনুমতিই আমার নেওয়া হয়নি।
শাহ আবদুল করিম সংবর্ধন-গ্রন্থ প্রকাশিত হয়ে যখন বাজারে এল তখন দেশের জাতীয় ও স্থানীয় একাধিক পত্র-পত্রিকায় বইটির মুদ্রণের সংবাদ প্রকাশিত হয়। এ বইয়ে যাঁদের লেখা ছাপা হয়েছিল, সেটারও একটা সংক্ষিপ্ত তালিকা ছাপা হয়েছিল। সে তালিকায় দিলওয়ারের নাম ছিল একেবারেই শুরুর দিকে। সেটা দেখেই ক্ষেপে যান কবি দিলওয়ার। তিনি মুঠোফোনে চড়াও হন আমার ওপর। একাধিক খুদে বার্তায় তাঁর ক্ষুব্ধতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। আমি ভুল স্বীকার করে কবিকে পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন করলে তিনি আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। ক্ষুব্ধ কবি খুদেবার্তায় এ-রকমটাই লিখেছিলেন, ‘তোমার যুক্তি ও ব্যাখ্যা সুন্দর। তবে আমার অনুমতি ছাড়া এ লেখাটা ছাপা তোমার একদম উচিত হয়নি। সাহিত্যের তালিম নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে বিরামহীন পথ চলছি। কোনটা যুক্তিসঙ্গত সেটা এই বয়সে এসে শিখতে হবে না।’ আমি বুঝতে পারি—কবি ক্রমশই ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছেন। তত্ক্ষণাত্ তাঁর বাসায় ছুটে গিয়ে ভুল স্বীকার করলাম। কবি সেদিন অনেক কথাই বলেছিলেন। এ মুহূর্তে সেসব বলাটাই বোধহয় উচিত হবে না।
কবি দিলওয়ার ‘কালনীর ঢেউ প্রসঙ্গে দুটি কথা’ শীর্ষক লেখায় শাহ আবদুল করিমের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, ‘শিল্পী শাহ আবদুল করিম আমাদের কর্মবিমুখ বন্ধ্যাত্বজনিত নৈরাশ্যের জগতে একটি গভীর নলকূপের সমান’। দিলওয়ার আরও লিখেছিলেন, ‘আমাদের দিগ্ভ্রান্ত সমাজে হাজার হাজার আবদুল করিম নীরবে এসে নীরবে চলে যায়। আমাদের আবদুল করিম এই অমাবস্যার পাহাড়ে উজ্জ্বলতম অন্তর্জ্বালা নিয়ে প্রতিবাদে বিস্ফোরণ হয়ে সক্রিয় থাকুন, এটাই কাম্য।’
কবি দিলওয়ার ১৯৮১ সালে শাহ আবদুল করিমকে নিয়ে উল্লিখিত লেখাটি লিখেছিলেন। এরপর দুজনেই দীর্ঘদিন বেঁচে ছিলেন। ঘনিষ্ঠ এই দুই বন্ধুর অন্তরঙ্গতা শেষ বয়সে এসে কিছুটা চির ধরেছিল। উভয়ের মত ও পথের কিছু ভিন্নতা তৈরি হলেও গান এবং কাব্যচর্চায় আজীবন সক্রিয় ছিলেন নিজেদের মতো করে। ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর মারা গিয়েছিলেন বাউলসাধক শাহ আবদুল করিম আর ২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর মারা গেলেন গণমানুষের কবি দিলওয়ার। উভয়ের শারীরিক প্রয়াণ সত্ত্বেও তাঁদের সৃষ্টির অমিয়ধারা বাঙালির সাহিত্যক্ষুধা মেটাবে যুগের পর যুগ। উভয়ের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা।