হূদয়ে লিখো নাম সে নাম রয়ে যাবে

বাংলা সংগীতের প্রবাদপ্রতিম, কিংবদন্তি শিল্পী মান্না দে ৯৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর ঈশ্বরপ্রদত্ত কণ্ঠ দীর্ঘ সাত দশকের বেশি সময় ধরে উপমহাদেশের বিভিন্ন ভাষা-ভাষী মানুষকে সুরের ইন্দ্রজালে মোহাবিষ্ট করে রেখেছিল। কেউ কেউ বলেছেন, বাংলা সংগীতের জগতে ইন্দ্রপতন হয়েছে। তার গাওয়া গানের বাণীর উদ্ধৃতি দিয়ে একজন সাংবাদিক বলেছেন, শুধু মুকুট পরে আছে কিন্তু রাজা নেই। বস্তুত ভারতীয় সংগীত জগতে তিনি ছিলেন প্রবাদপ্রতিম, কিংবদন্তি শিল্পী। মান্না দে ছিলেন মেলোডির রাজা। জাদুকরী কণ্ঠ দিয়ে তিনি তাঁর লক্ষ-কোটি শ্রোতাকে সম্মোহিত করেন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই সংগীতশিল্পী ছিলেন সুদক্ষ, গুণবান সফল সংগীত ব্যক্তিত্ব। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অনন্য, অদ্বিতীয়। তিনি নতুন সংগীত পরিমণ্ডলের স্রষ্টা। গানের শব্দকে দ্বিতীয়বার গাওয়ার সময় তাত্ক্ষণিক নতুনভাবে তৈরি করতেন। ফলে শব্দের অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য নতুন ব্যঞ্জনা লাভ করত। তিনি ছিলেন সহজাত, সৃজনশীল বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ব্যক্তিত্ব। তাঁর সবচেয়ে স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তিনি অতি সহজেই গানের বাণীর কোনো শব্দ বা পঙিক্তর ক্ষেত্রে বিষয়বস্তুর প্রয়োজন অনুযায়ী তাঁর কণ্ঠকে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে পরিবর্তন করতে পারতেন। কণ্ঠের এ নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় একমাত্র সৃজনশীল শিল্পীর পক্ষেই করা সম্ভব। প্রবাহিত নদীর স্থির জলে মৃদু, শান্ত ঢেউয়ের ওঠা-নামার মতোই মনে হয় তাঁর কণ্ঠের ওঠানামা। মান্নাদের কণ্ঠে শব্দ ও ধ্বনি ঐশ্বরিক ঐক্যতানে সকলকে বিমুগ্ধ করে। মান্না দে-র মহত্তম অবদান সম্পূর্ণ নতুন রাগ-রাগিনীর উদ্ভাবনায় সৃষ্ট নতুন গানে। ১৯৪২ থেকে ২০১৩—এ সময়কালের মধ্যে মান্না দে প্রায় চার হাজার গান গেয়েছেন। সব ভাষাতেই তিনি সমান দক্ষতার সঙ্গে গান করেছেন। একটি গানকে চূড়ান্তভাবে নিখুঁত ও উত্কৃষ্ট করে গাওয়া ছিল তাঁর অন্বিষ্ট। হিন্দি এবং উর্দু ভাষার শব্দ তিনি এমনভাবে উচ্চারণ করতেন, শ্রোতারা ভুলে যেত যে তার মাতৃভাষা হচ্ছে বাংলা। এ মুনশিয়ানার ভেতর রয়েছে সংগীতস্রষ্টা মান্না দে-র স্বাতন্ত্র্যের প্রকৃত রহস্য। মান্না দে-র গান মানবিক অনুভূতির বিভিন্ন সংক্ষোভে সংরক্ত। গানে সহজ, ঘরোয়া মানবিক আবেগই ছিল তাঁর প্রধান উপজীব্য। এ আবেগ রূপায়ণের জন্য যে সুর তিনি ব্যবহার করেছেন তার আবেদন ছিল সর্বজনগ্রাহ্য। বাণী ও সুরের অপূর্ব সমন্বয়ে মান্না দে যে সাফল্য অর্জন করেন তার পরিণামে বাংলা গান নতুন জীবন লাভ করে। গান পরিবেশনের ক্ষেত্রে তাঁর পরিমিতিবোধ যেমন বিস্ময়কর, তেমনি অনন্য ছিল তাঁর গানের সুরবৈচিত্র্য। বলতে দ্বিধা নেই বাংলা গানের সম্ভাবনা তাঁর হাতে নতুনভাবে পূর্ণতা পেয়েছে। মান্না দে সাত দশকে এত অজস্র স্মরণীয় গান আমাদের উপহার দিয়েছেন, বলতে গেলে তাঁর গানের ছায়ায় আমাদের প্রজন্ম জীবনের সুদীর্ঘ পথ পেরিয়ে অনেকেই জীবন সায়াহ্নের মুখোমুখি। ইংরেজ রোমান্টিক কবি শেলি একবার বলেছিলেন, আমাদের মধুরতম সংগীত তা-ই যাতে ব্যক্ত হয় বিষাদ, বিষণ্নতার ভাব। নজরুলের প্রেমের বেদনা-বিধুর গানগুলো বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। নজরুলের পর মান্না দে-র প্রেমের গানে বিষণ্নতার এমন অতুলনীয় রূপ আমরা দেখতে পাই। নিচের গানটি লক্ষ করুন—‘তুমি আর ডেকোনা পিছু ডেকোনা/ আমি চলে যাই শুধু বলে যাই/ তোমার হূদয়ে মোর স্মৃতি রেখোনা।/ আঁখিজল কভু ফেলোনা/ নিবিড় আঁধারে একা/ নেভা দীপ আর জ্বেলোনা/ পথ আর চেয়ে থেকো না।...’ গানটির গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। সুরকার ও শিল্পী মান্না দে। তাঁর এরকম অনেক গানে আছে না-পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস, আর্তি। কথা ও সুরের আশ্চর্য সহযোগে গোটা গানের সীমাবদ্ধ রূপ মুহূর্তে বদলে গিয়ে তাঁর কণ্ঠে পেয়েছে নতুন অবয়ব। মান্না দে ১৯১৯ সালের ১ মে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম পূর্ণচন্দ্র দে এবং মায়ের নাম মহামায়া দে। ত্রিশের দশকে আন্তঃকলেজ সংগীত প্রতিযোগিতায় পরপর তিন বছর প্রথম স্থান অধিকার করেন। তাঁর কাকা অন্ধ শিল্পী কৃষ্ণ চন্দ্র দে ছিলেন একাধারে মান্না দে-র সংগীত গুরু ও সংগীত প্রেরণার উত্স। কাকার সূত্র ধরেই উপমহাদেশের বিখ্যাত সংগীত ব্যক্তিদের সান্নিধ্য লাভ করেন। সরাসরি তাঁদের হাত থেকে তালিম নেওয়ার বিরল সৌভাগ্যের অধিকারী হন। মান্না দে একাধারে ছিলেন কণ্ঠশিল্পী, সুরকার এবং চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালক। একটি পরিসংখ্যান মতে, ভারতের বিভিন্ন ভাষায় তিনি চার হাজারের মতো গান গেয়েছেন। এর মধ্যে বাংলা গানের সংখ্যা আড়াই হাজারের মতো। এসব গানের নব্বই শতাংশের সুর তাঁর নিজের দেওয়া। তাঁর অসংখ্য গান বাঙালির প্রেম-বিরহ, আবেগের প্লাবিত হূদয়ে ঝংকৃত হবে অনন্তকাল। ১৯৪২ সালে কাকা কৃষ্ণ চন্দ্রের সঙ্গে তিনি মুম্বাইতে যান। পরের বছর তামান্না ছবিতে সুরাইয়ার সঙ্গে দ্বৈত গান করার সুযোগ পান। গানটি জনপ্রিয়তা লাভ করে। তারপরের ইতিহাস হলো তিনি আসলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন। বাংলাদেশের কুমিল্লার সংগীতের আরেক দিকপাল শচীন দেব বর্মণের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান তিনি। তিনি বিভিন্ন ভাষায় গান করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—হিন্দি, বাংলা, গুজরাটি, মারাঠি, ভোজপুরি, পাঞ্জাবি, কানাড়া, অসমিয়া। রবীন্দ্রনাথের গান ও নজরুল ইসলামের গানেও তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর বিদ্যমান। কেরালার মেয়ে মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী সুলোচনা কুমারণ-কে বিয়ে করেন ১৯৫৩ সালে। তাঁদের দুই মেয়ে সুরমা দে ও সুমিতা দে। তিনি অকপটে বলেছেন, তাঁর জীবনের সেরা পাওয়া তাঁর স্ত্রী। তিনি ছিলেন মান্না দে-র বন্ধু, ফিলোসফার এবং গাইড। সংগীত জগতে অসামান্য অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭১ সালে ভারত সরকারের পদ্মশ্রী, ২০০৫ সালে পদ্মভূষণ, ২০০৭ সালে দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার পান। এছাড়া, ভারতের রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডিলিট উপাধিতে ভূষিত করে। মান্না দে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা (Friends of Liberation War Honour) প্রদান করে। সম্মাননাপত্রে তাঁর অবদানের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়—‘মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী শ্রী মান্না দে পদ্মভূষণ, পদ্মশ্রী, মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের সাহায্য ও সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন এবং নিজে তাতে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর গান সেই দুঃসময়ে বাংলাদেশের মানুষকে উজ্জীবিত করেছিল। অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ শ্রী মান্না দে পদ্মভূষণ, পদ্মশ্রী-কে মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা প্রদান করা হল’। ২০১২ সালের ১৫ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সম্মাননা প্রদানের চতুর্থ পর্বের অনুষ্ঠানে তাঁর আসার কথা ছিল। কিন্তু শারীরিক অবস্থার কারণে তিনি আসতে পারেননি। প্রতিনিধি হিসেবে সম্মাননা গ্রহণ করেন তাঁর ভাইপো শ্রী সুদেব দে। মান্না দে বাংলা সংগীতকে শুদ্ধতার একটি নতুন মাত্রায় প্রতিষ্ঠিত করেন। এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পীর মহাপ্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলা সংগীতের একটি স্বর্ণযুগের অবসান ঘটেছে। গান নিয়ে তিনি নিরন্তর ভাবতেন। গান যে কত ঢংয়ে, রূপে গাওয়া যায় সে দক্ষতা তাঁর ছিল। বাংলা গানের ঐতিহ্যকে ধারণ করেই তাঁর গানের ভুবন তৈরি করেছেন। কবিতার মতো একটি গানে তিনি বলেছেন—যদি কাগজে লিখো নাম কাগজ ছিঁড়ে যাবে/ পাথরে লিখো নাম পাথর ক্ষয়ে যাবে/ হূদয়ে লিখো নাম সে নাম রয়ে যাবে।’