অবসরপ্রাপ্ত লেখকের নোবেলপ্রাপ্তি
প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০১৩, ১৭:৫৬
এক জরিপে দেখা গেছে, ৮৬% তাঁর কোনো লেখা পড়েননি। যদিও কানাডার সাহিত্যজগতে তিনি পরিচিত। বিশেষ করে ছোটগল্পে। স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে তাঁর গল্প পাঠ্য। ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার পর এবং বয়সের কারণে তিনি গত বছর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়ে লেখালেখির জগত্ থেকে অবসর নিয়েছেন
কানাডিয়ান ঔপন্যাসিক ও কবি মার্গারেট অ্যাটউড এবার নোবেল পাবার তালিকায় ছিলেন। তাঁর ‘দ্য ব্লাইন্ড আসাসিন’ উপন্যাসটি ২০০০ সালে বুকার পুরস্কার লাভ করে। মার্গারেট থাকেন টরন্টোতে। সেই বিবেচনায় যোগাযোগ করলাম। ২ অক্টোবর তাঁর সেক্রেটারি লাউরা স্টেনবার্গ উত্তর দিলেন। অপেক্ষা করছিলাম, মার্গারেট অ্যাটউড নোবেল পেলে আমি একটা ইন্টারভিউ করব।
কিন্তু ১০ অক্টোবর যেমন হতাশ হলাম, পাশাপাশি চমকে উঠলাম। অবসরপ্রাপ্ত লেখকের নোবেলপ্রাপ্তি! কারণ, নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আমেরিকান জয়েস ক্যারল ওটস, ফিলিপ রথ, জাপানের হারুকি মুরাকামি এবং স্বদেশি মার্গারেট অ্যাটউডকে ছাড়িয়ে বিজয়ীর হাসি হাসলেন আরেক কানাডিয়ান লেখক অ্যালিস মুনরো। যার কথা অনেকেই জানেন না। এক জরিপে দেখা গেছে, ৮৬% তাঁর কোনো লেখা পড়েননি। যদিও কানাডার সাহিত্যজগতে তিনি পরিচিত। বিশেষ করে ছোটগল্পে। স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে তাঁর গল্প পাঠ্য। ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার পর এবং বয়সের কারণে তিনি গত বছর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়ে লেখালেখির জগত্ থেকে অবসর নিয়েছেন।
তিনি অন্টারিওবাসী হলেও থাকেন ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ভিক্টোরিয়া শহরে, মেয়ের সাথে। তাই সুইডিশ অ্যাকাডেমি অ্যালিসের সঙ্গে ফোনে তাত্ক্ষণিক যোগাযোগ করতে না পেরে তাঁর টুইটার অ্যাকাউন্টে নোবেলপ্রাপ্তির বার্তাটি রেখে দেয়। অ্যালিস খবরটা পাওয়ার আগেই খবর পেয়ে যান প্রধানমন্ত্রি স্টিফেন হারপার। হারপার আনন্দের সংবাদটি ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়ে মনরোকে অভিনন্দন জানান।
এদিকে সংবাদমাধ্যম তথা সিবিসি টেলিভিশনের সাংবাদিক হিদার হিস্কং মনরোর ছোট মেয়ে জেনিকে ফোন করেন। ঘুম ভেঙে রাতের স্বপ্নে পাওয়া যেন এ এক সোনার হরিণ। খুব ভোরে মাত্র বিছানা ছেড়ে মনরো তখন পায়চারি করছিলেন। জেনি মাকে বলেন—মা, তুমি জিতেছ। লেখিকা অবাক বিস্ময়ে মেয়েকে বলেন, কী জিতেছি? মেয়ে বলেন, নোবেল প্রাইজ! এভাবেই তিনি খরবটা পেয়ে নিজেই চমকে ওঠেন।
উল্লেখ্য, প্রথম কানাডিয়ান সাহিত্যিক হিসেবে তিনি এ পুরস্কার অর্জন করলেন। কারণ, ১৯৭৬ সালে সাহিত্যে নোবেল অর্জনকারী আমেরিকান সাউল বেলো কানাডার বংশোদ্ভূত লেখক। তাঁর জন্ম ক্যুইবেকের লেসিনে হলেও তিনি শৈশব থেকে শিকাগোয় বেড়ে ওঠেন। ফলে কানাডার ভাগ্যে তা জুটেনি, স্থলে স্থান পায় যুক্তরাষ্ট্র।
প্রসঙ্গক্রমে একটি ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা উল্লেখ করছি। গত বছর অর্থাত্ ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের দুই বৈজ্ঞানিকের সাথে যৌথভাবে কানাডার মৃত বিজ্ঞানী রলফ স্টেইনম্যানকে চিকিত্সাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। অথচ ৬৮ বছর বয়সী রলফ ২০১২ সালের গত ৩০ সেপ্টেম্বর অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারজনিত কারণে মারা গেছেন। ফলে প্রথমবারের মতো একজন মৃত ব্যক্তির নামে নোবেল পুরস্কার ঘোষিত হলো। নিয়ম অনুযায়ী মৃত কারও নাম নোবেল পুরস্কারের জন্য বিবেচনা করা হয় না। পুরস্কারের ইতিহাসে এটা নজিরবিহীন ঘটনা। নোবেল কমিটি তাঁর পুরস্কার বহাল রেখেছে।
১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যে নোবেল পদক পান, আর একশ বছর পর অর্থাত্ ২০১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পদক পেলেন অ্যালিস মুনরো। আমি বাংলাদেশ বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান হিসেবে আমাদের রবীন্দ্র-মনরোকে নিয়ে ভিন্নভাবে গর্বিত। একজন লেখক হিসেবেও আমি দুভাবে দুজনের নৈকট্য অনুভব করছি।
আরও একটি মজার ব্যাপার, ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অন্টারিওতে অ্যালিস মুনরো সাংবাদিকতা ও ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করেছেন। এখন সেই ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট ও ভাইস চ্যান্সেলর হচ্ছেন—আমাদের চাটগাঁ-র অমিত চাকমা। তিনি আনন্দের সাথে জানিয়েছেন, অ্যালিস এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ছিলেন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গর্বিত এবং আমরাও সম্মানিত।
তিনি এখন কানাডিয়ান আইকন। নিজের আলোতে আলোকিত করেছেন কানাডিয়ানদের। কানাডার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে দিয়েছেন আনন্দধারা। তাঁকে মূল্যায়ন করে বলা হচ্ছে—মুনরো এখন কানাডার সাহিত্যের হূদয়। কানাডার প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপার বলেছেন, মিস মুনরো শুধু কানাডার সাহিত্যেই নয়; এখন বিশ্বসাহিত্যেও উঁচুমানের লেখক হিসেবে স্বীকৃত এবং সন্মানিত। তাঁর এই নোবেলপ্রাপ্তি বিভিন্ন দেশের সেরা লেখকদের সারিতে কানাডাকে স্থান করে দিলো।
তিনি সবসময় সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। কিন্তু জীবনকে তিনি দেখতেন খুব সূক্ষ আর অন্তর্নিহিতভাবে। তাই কদিন আগে টরন্টো থেকে প্রকাশিত ডেইলি গ্লোব অ্যান্ড মেইলকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেন, ‘জীবনের চাকচিক্য কখনোই আমাকে টানেনি। আমি নিজের মতো সহজ একটি জীবনযাপন করতে চেয়েছি। চেয়েছি ছোটগল্পের মধ্যে আমার দেখা মানুষ ও তার জটিলতাগুলো উপস্থাপন করতে। আর চেয়েছি সব কোলাহল ছেড়ে দূরে এই ছোট্ট অন্টারিওতে নিরিবিলি বেঁচে থাকতে। এখানে খুব বেশি মানুষ আমাকে লেখক হিসেবে চেনে না। তাই আমি আর দশজন মানুষের মতো এখানে নিজের মতো একটি নির্ভার জীবনযাপন করতে পারি।’ এবং সেভাবেই তিনি নির্জন-নিভৃত গ্রামতুল্য উইংহামে জীবন কাটিয়ে একাগ্র মনে লিখেছেন জাদুকরী গার্হস্থ্য গ্রন্থ। তবে তিনি প্রথম থেকে শেষ অব্দি এক ধরনের লেখকই থেকে গেছেন।
নর-নারীর সম্পর্কের জটিলতা, মফস্বল শহরে বসবাসের বাস্তবতা এবং স্মৃতির নানা বিন্যাস তাঁর রচনার মূল বিষয়। তাই সমালোচকরা তাঁর সম্পর্কিত মূল্যায়ন নেটে ছড়িয়ে দিয়েছেন, বালিকা থেকে নারী হয়ে ওঠার পথে মেয়েজীবনের টানাপড়েনের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাকে তিনি মুনশিয়ানায় ফুটিয়ে তোলেন এবং একই সঙ্গে উপস্থাপন করেন নৈতিক দ্বন্দ্ব্ব, অনুভূতি ও উপলব্ধি, অস্তিত্ব।
‘কানাডার আন্তন চেখভ’ হিসেবে খ্যাত অ্যালিস মুনরো ছোটগল্প ছাড়া আর কিছু লিখেননি। তাই এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বছরের পর বছর আমি এ বিশ্বাস নিয়েই বেঁচে আছি যে, ছোটগল্প লেখা একটি অভ্যাসবিশেষ; অবশ্য সেক্ষেত্রে এখনো উপন্যাস রচনা করে উঠবার মতো অবসর আমি পাইনি!’ ১০ অক্টোবর ২০১৩, নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পর দূরভাষে সাক্ষাত্কার নিয়েছেন Nobelprize.org’s-এর অ্যাডাম স্মিথ। সেই সাক্ষাত্কারে অ্যালিস বলেন, ‘আমি চাইব গল্প যেন তার নিজের জোরেই প্রথম সারির আসন নিতে পারে, যেন তার জন্য কোনো উপন্যাস লেখার দরকার না পড়ে’। তাঁর কোনো কোনো বড়গল্প উপন্যাসের সমতুল্য।
মুনরো মাঝেমধ্যে শখ করে কবিতাও লেখেন। তবে তাঁর কোনো কবিতার বই বের হয়নি। কবিতা সম্পর্কে বলেন, ‘হ্যাঁ, কখনো সখনো লিখি। কবিতার
ধারণাগুলো আমার ভালো লাগে কিন্তু তুমি জানো যখন তুমি গদ্য লিখ, আমি মনে করি তুমি সচেতনভাবেই কাব্যিকতাকে পরিহার কর। গদ্য চায় কিছু সোজাসাপ্টা তীব্রতা, এবং এখন এভাবেই লিখি। এমনভাবে লিখতে চাই যে পদ্ধতিটি আমি জানি না’।
বাবা রবার্ট অ্যারিক লেইডল কৃষক আর মা অ্যানি ক্লার্ক লেইডল স্কুল শিক্ষিকা। তাঁদের কন্যা অ্যালিস অ্যান লেইডল-এর জন্ম ১৯৩১ সালের ১০ জুলাই অন্টারিওর ইউংহ্যামে। ১৯৫১ সালে সহপাঠী জেমস মুনরোর সঙ্গে প্রথম বিয়ের পরই ‘অ্যালিস অ্যান লেইডল’ থেকে হয়ে ওঠেন অ্যালিস মুনরো। তিনি হোটেলে-রেস্তোরাঁয়, ক্ষেত-খামারে, গ্রন্থগারের কেরানির কাজ করেছেন। পরে স্বামীর সঙ্গে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ভিক্টোরিয়ায় আবাস গড়েন। সেখানে তাঁরা ‘মুনরো বুকস’ নামে লাইব্রেরির ব্যবসা শুরু করেন, যা এখনো চালু রয়েছে। তবে জেমসের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তিনি ১৯৭৬ সালে ভূগোলবিদ জেরাল্ড ফ্রেমলিনকে বিয়ে করে আবার অন্টারিও ক্লিনটনে চলে আসেন। জেমস মুনরোর সাথে তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ হলেও তিনি তাঁর নামের শেষে ‘মুনরো’ যুক্ত রেখেছেন। এ বছর এপ্রিলে দ্বিতীয় স্বামী জেরাল্ড মারা যান। তাঁর তিন কন্যাসন্তান আন্দ্রেয়া, শায়লা এবং জেনি। সবাই প্রথম ঘরের। এখন তিনি মেয়ের কাছেই আছেন।
বাবা-মার সাথে তাঁর সম্পর্ক কিছুটা জটিল ছিল। ছিল স্ববিরোধী সম্পর্ক। তা তাঁর ‘প্রিয় জীবন’ গল্পে সেই স্ববিরোধী বিষয়ের অবতারণা করেছেন। কৈশোরে সাহিত্যচর্চা শুরু করলেও তাঁর প্রথম গল্প ‘দ্য ডাইমেনশনস অব অ্যা শ্যাডো’ প্রকাশিত হয় ১৯৫০ সালে, তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। তবে ৩৭ বছর বয়সে বের হয় প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘ড্যান্স অব হ্যাপি শেডস’। তাঁর সর্বশেষ বইটি বেরিয়েছে ‘ডিয়ার লাইফ’ নামে ২০১২ সালে। তিনি ইংরেজি ভাষায় সাহিত্যচর্চা করেন। তবে ফরাসি, সুইডিশ, স্প্যানিশ ও জার্মানসহ মোট চারটি ভাষায় বই বের হয়েছে। তাঁর কোনো বই বাংলায় অনুবাদ হয়নি। আমি টরন্টোর ডাউন টাউনের ইনডিগো বুক স্টোর থেকে কিনে আনলাম ‘ডিয়ার লাইফ’। ভাবছি অনুবাদ করব তাঁর নির্বাচিত গল্পগুলো। ভ্যাঙ্কুভারে পয়েট্রি সেন্টার এবং মুনরো লাইব্রেরিতে যোগাযোগ করলাম, তাঁর সাথে কথা বলার জন্য। কিন্তু পারলাম না।
সর্বমোট পনেরোটি গল্পগ্রন্থের জননী অ্যালিস মুনরো লেখালেখির স্বীকৃতিস্বরূপ বুকার ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কার, কানাডার সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার গভর্নর জেনারেল পদক, ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস সার্কল প্রাইজ, কমনওয়েলথ রাইটার্স প্রাইজসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেছেন। তাঁর গল্প নিয়ে সারাহ পলি নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র ‘অ্যাওয়ে ফ্রম হার’। তাতে অভিনয় করেন জুলি ক্রিস্টি এবং গর্ডন পিন্সেন্ট। ২০০৬ সালে টরন্টো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালে তা শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যের জন্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার পায়। এবং সেই ছবি অস্কার পুরস্কারের জন্যও মনোনয়ন পায়।
২০০৯২০০৯ সালে তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। এর মধ্যে তাঁর হূিপণ্ডে বাইপাস সার্জারিও হয়েছে। ‘তারপরও বেঁচে আছি আনন্দ নিয়ে, নিজের কাজ নিয়ে।’ যদিও গত বছর তিনি লেখালেখি থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তারপরও অবসরপ্রাপ্ত লেখকের নোবেল খ্যাতি ঘটল! পুরস্কার পাবার পর আবার কি তিনি লেখালেখির ভুবনে ফিরে আসবেন? এই প্রাপ্তি কি তাঁকে নতুন প্রেরণা দেবে? এইসব প্রশ্নের উত্তরে অ্যালিস মুনরো বলেছেন, এই প্রাপ্তি আমাকে প্রেরণা দিয়েছে। আমি লিখব।