আশুরায়ে মুহাররম সিয়াম পালনের ফজিলত

হিজরি সনের প্রথম মাস মহাররম। মহাররম মাসের ১০ম দিবস আশুরা। আশুরা বা ১০ মহররমের মর্যাদা অনেক বেশি। সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষে আছে, ‘মুসা (আ.)-এর সাফল্যে শাশ্বত ইসলামের বিজয় সুচিত হয়েছিল, জয় আল্লাহর দান এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ দাসের কর্তব্য—এই প্রেক্ষিতে সকল নবীতে সমভাবে বিশ্বাসী মুহাম্মদ (স.) এবং তাঁহার উম্মত এই দিবসটিকে মর্যাদাপূর্ণ মনে করেন। কথিত আছে, এই দিনটিতে নূহ (আ.) প্লাবনের পর জাহাজ হইতে ভূমিতে অবতরণ করিয়াছিলেন। আবার এই দশম মহাররমে কারবালা প্রান্তরে হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর দৌহিত্র হুসাইন (রা.) শাহাদাত্ বরণ করিয়াছিলেন। চরম বিষাদপূর্ণ হইলেও সত্যের পতাকাবাহী হুসাইন (রা.)-এর এই অপূর্ব আত্মত্যাগ ইসলামের ইতিহাসে দিবসটিকে আরও গাম্ভীর্যপূর্ণ করিয়াছে। সুতারং সুন্নী-শিয়া সকলেই নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিবসটি উদ্যাপন করে।’ হযরত মুসা (আ.) এই দিনে প্রথম সিয়াম পালন শুরু করেন এবং পরবর্তীতে হযরত ঈসা (আ.) ও মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (স.) সিয়াম পালন করেন এবং উম্মতে মুহাম্মদীকেও সিয়াম পালনের আদেশ করেন। আইয়ামে জাহেলিয়াতেও আশুরার সিয়াম পালিত হত। আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) বলেন, ‘রসূলুল্লাহ (স.) মদীনায় হিজরত করে ইহুদীদেরকে আশুরার সিয়াম রাখতে দেখে কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা বলেন, এটি একটি মহান দিন। এদিনে আল্লাহ পাক মুসা (আ.) ও তাঁর কওমকে নাজাত দিয়েছিলেন এবং ফেরাউন ও তার কওমকে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। তার শুকরিয়া হিসাবে মুসা (আ.) এদিন সিয়াম পালন করেছেন। আমরাও (ইহুদীরা) এদিন সিয়াম পালন করি। তখন রাসূল্লাহ (স.) বললেন, তোমাদের চাইতে আমরাই মুসা (আ.)-এর (আদর্শের) অধিক হকদার ও অধিকার দাবীদার। অতঃপর তিনি সিয়াম রাখেন ও সকলকে রাখতে বলেন’ (মুসলিম হা/১১৩০)। আশুরার সিয়াম পালন মুসা (আ.) থেকে শুরু। মহানবী (স.) নিজে পালন করেছেন এবং উম্মতে মুহাম্মদীকে পালন করতে বলেছেন। এই সিয়াম পালনে রয়েছে আল্লাহর অনুগ্রহ ও অফুরন্ত রহমত। রসূলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘আশুরা বা ১০ মুহাররমের সিয়াম আমি আশা করি আল্লাহর নিকটে বান্দার বিগত ১ বছরের (ছাগীরা) গোনাহের কাফফারা হিসাবে গণ্য হবে’ (মুসলিম, মিশকাত হা/২০৪৪)। তিনি অন্যত্র বলেন, ‘তোমরা আশুরার দিন সিয়াম রাখ এবং ইহুদীদের খেলাফ কর। তোমরা আশুরার সাথে তার পূর্বে একদিন বা পরে একদিন সিয়াম পালন কর’ (বায়হাকী ৪র্থ খণ্ড ২৮৭ পৃঃ)। আশুরায়ে মুহাররম মুলতঃ মুসা (আ.)-এর আদর্শ। আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁকে ও তাঁর কওমকে ফের‘আউনের হাত থেকে রক্ষা এবং ফের‘আউন ও তার কওমকে নীল নদে ডুবিয়ে মারার শুকরিয়া হিসাবে তিনি আশুরার সিয়াম পালন করেন। আর এই সিয়াম পালনের মধ্যদিয়েই আশুরা দিবস পালিত হয়ে এসেছে। সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষে বলা হয়েছে, ‘যদিও কেহ কেহ এই রোযাকে ওয়াজিব মনে করিয়াছেন বলিয়া বর্ণিত, প্রকৃতপক্ষে ইহা নফল। “নবম” দিবসে রোযা রাখিবার অবকাশ হযরত (স.)-এর জীবনে ঘটে নাই। জীবিত থাকিলে তিনি মনে হয় নবম এবং দশম উভয় দিনের রোযা রাখিতেন, ইহাতে একাধিক দিনের রোযা রাখা— যথা রামাদান ছাড়া অন্য মাসগুলির শুক্ল পক্ষের শেষের তিন দিনে (আইয়্যামে বীজ) রোযা রাখার যে বিশেষ সুন্নত, তাহা কতকটা পালিত হইত এবং ইহুদীদের অনুষ্ঠানের সহিত বৈসাদৃশ্য বা স্বাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইত।’ দ্বিতীয় হিজরিতে রমজানের সিয়াম ফরজ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এই সিয়াম সকল মুসলমানের জন্য পালিত নিয়মিত সিয়াম হিসাবে পরিগণিত ছিল। রমজানের সিয়াম ফরজ হওয়ার পর এই সিয়াম ঐচ্ছিক সিয়ামম পরিণত হয়। মু’আবিয়া বিন আবু সুফিয়ান (রা.) মদীনার মসজিদে নববীতে খুত্বা দানকালে বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (স.) কে বলতে শুনেছি যে, আজ আশুরার দিন। এদিনের সিয়াম তোমাদের ওপরে আল্লাহ ফরজ করেননি। তবে আমি সিয়াম রেখেছি। এক্ষণে তোমাদের মধ্যে যে ইচ্ছা কর সিয়াম পালন কর, যে ইচ্ছা কর পরিত্যাগ কর’ (বুখারী, মুসলিম হা/ ১১২৯)।