পোশাক শিল্প দুর্নীতির কবলে

টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদন  অনিয়মে জড়িত উদ্যোক্তা এবং সরকারি-বেসরকারি ১৭টি দপ্তর। তাদের আইনের আওতায় আনার বিকল্প নেই  ট্রেড ইউনিয়নের নেতারা ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থে কাজ করেন দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে অল্প কিছু অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত বাদে এ খাতের সর্বক্ষেত্রেই সুশাসনের অভাব রয়েছে। আর এ কারণেই এ শিল্পের উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি সংশ্লিষ্ট ১৭টি দপ্তর অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে। দপ্তরগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় না থাকা এ অনিয়ম ও দুর্নীতি বাড়ছে। এজন্য দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা এবং দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের জন্য পৃথক একটি মন্ত্রণালয় করা প্রয়োজন। দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য ও সুপারিশ উঠে এসেছে। ‘তৈরি পোশাক খাত: সুশাসনের সমস্যা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত হয়। এতে মূল প্রতিবেদন তুলে ধরেন সংস্থাটির গবেষণা ও নীতি বিভাগের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার শরীফ আহমদ চৌধুরী ও একই বিভাগের সহকারী প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাজমুল হুদা মিনা। এসময় সংস্থাটির ট্রাস্ট্রি বোর্ডের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ও উপনির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে সম্পৃক্তদের আইনের আওতায় আনার বিকল্প নেই। আমরা জানি অনেক সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি গার্মেন্টের মালিক, তারা শুধু আইন ভঙ্গ করেই শ্রমিকের অধিকার ক্ষুণ্ন করেন না, আইন করেও শ্রমিকের অধিকার ক্ষুণ্ন্ন করে থাকেন। এজন্য সংসদীয় কমিটিতে তাদের না রাখার অনুরোধ জানান তিনি। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মালিকদের রাজনীতিকীকরণই এ খাতের সুশাসনের অভাবের জন্য দায়ী। ১০ শতাংশের বেশি গার্মেন্টের মালিক রাজনৈতিক পরিবারের। এরা ক্ষমতার বলয়ে থেকে ইচ্ছেমতো নিজেদের স্বার্থ রক্ষা হয় এমন আইন তৈরি করে নিচ্ছেন। সরকারের কাছ থেকেও সবরকম সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নিচ্ছেন। অথচ খাতটির মূল চালিকা শক্তি শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষায় সব সময় মালিকরা গড়িমসি মনোভাব দেখিয়ে আসছেন। এজন্য আইন ভঙ্গকারিদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। এ উদ্যোগ না নিলে এ খাত আরও বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, তৈরি পোশাক শিল্পের এ সমস্যার জন্য প্রধান সমন্বয়কারি মন্ত্রণালয়ের অভাব, তদারকি সংস্থার সক্ষমতার অভাব, শ্রম আইনের সীমাবদ্ধতা, কমপ্লায়েন্স প্রয়োগে মালিকদের অনীহা, ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে মালিকদের নেতিবাচক মনোভাব, অপর্যাপ্ত মজুরি কাঠামো, মালিক ও ক্রেতাদের অতিমুনাফার প্রবণতা, নীতি প্রণয়ন ও প্রয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব, বিজিএমইএর জবাবদিহিতার অভাব। গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নতুন একটি কারখানা স্থাপন করার বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে ৭ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত দিতে হয়। এসব অর্থ কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তর, শ্রম পরিদপ্তর, রাজউক, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয়, পরিবেশ অধিদপ্তরকে দিতে হয়। এছাড়া বিনিয়োগ বোর্ড, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, প্রধান আমদানি-রফতানি নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, কাস্টমস এন্ড এক্সসাইজ, জয়েন্ট স্টক কোম্পানি, ডেসা, ডেসকো, তিতাস গ্যাস, বিটিসিএল ও ওয়াসা কর্তৃপক্ষকেও এসব অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। গবেষণায় উঠে এসেছে, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স জানে যে দেশের মোট তৈরি পোশাক কারখানার ২৩ দশমিক ২৮ শতাংশ কারখানার অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই নাজুক। তবুও তারা ওইসব কারখানাকে ফায়ার লাইসেন্স দিচ্ছে। এজন্য তাদের ন্যূনতম ৩০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়পত্র পেতে কারখানার মালিকদের গড়ে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা অতিরিক্ত খরচ করতে হয়। অন্যদিকে পরিদর্শকরা কারখানা পরিদর্শন না করে অফিসে বসেই নিবন্ধন ও নবায়ন সনদ প্রদান করে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তর থেকে নিবন্ধন নিতে অতিরিক্ত ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা ও নবায়নের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, তৈরি পোশাক শিল্পে ১৫৭টি ট্রেড ইউনিয়নের মধ্যে ৪০ থেকে ৫০টি সক্রিয়। এসব ট্রেড ইউনিয়নের নেতৃত্ব দিচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ জন। অনির্বাচিত এসব নেতাদের যৌথ দর-কষাকষির দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে এবং এসব নেতারা ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থে কাজ করে থাকেন। অন্যদিকে বিদেশি বায়াররা যথাযথভাবে নিয়ম কানুনের মধ্যে থেকে কাজ করেন না। টিআইবি বলছে, তৈরি পোশাক শিল্পের এসব সমস্যার কারণে কমপ্লায়েন্সে ঘাটতি, অগ্নি দুর্ঘটনা, ভবন ধস, আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন, ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠায় বাধা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবহারে অস্বচ্ছতা দেখা দিচ্ছে। ফলে তৈরি পোশাক খাতে অস্থিরতাসহ নানান সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। পোশাক শিল্পে এসব সমস্যা সমাধান ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে শ্রমিকদের নিরাপত্তা, অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে ২৫ দফা সুপারিশ উপস্থাপন ও বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে টিআইবি। ঢাকা, সাভার, গাজীপুর, আশুলিয়া ও যাত্রাবাড়ী এলাকার ৮০টি কারখানার মালিক-শ্রমিক, ট্রেড ইউনিয়ন নেতা, বিজিএমইএ এবং সংশ্লিস্ট সেবা প্রদানকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলে এ গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করেছে টিআইবি। এছাড়া পত্রিকা ও টিভির খবর, বিভিন্ন প্রবন্ধ এবং ওয়েবসাইটের সহায়তা নেয়া হয়েছে। চলতি বছরের জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে গবেষণার তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হয়েছে