ধাঁধা হয়েই রইল পাওয়ার প্লে
প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০১৩, ২২:০৪
ক্রিকেটে ২০০৫ সালে ‘পাওয়ার প্লে’ ব্যাপারটা যখন চালু হল সেসময়ে অনেকে লিখেছিলেন—শাওয়ার প্লে! মানে, এই সময়ে বৃষ্টির মতো রান আসবে। কিন্তু এই এতো বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও পাওয়ার প্লে’র চরিত্রটা আসলে বোঝা গেল না—এটা কী বৃষ্টির মতো রান তোলার সময়, নাকি বৃষ্টির মতো উইকেট পতনের সময়!
গতকাল বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং পাওয়ার প্লে আরও একবার প্রশ্নটাকে সামনে নিয়ে এলো। আসলেই পাওয়ার প্লে কী কাজে লাগাতে পারছেন ব্যাটসম্যানরা? আগের ম্যাচগুলোর কথা বাদ। এই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেই গতকাল পর্যন্ত দুটি ম্যাচে বাংলাদেশের পাওয়ার প্লে’র পাঁচ ওভারের পারফরম্যান্স যথাক্রমে দুই উইকেট হারিয়ে ২৬ রান এবং তিন উইকেট হারিয়ে ৩৭ রান!
এ দেখে আর যাই হোক, এটাকে রানের বৃষ্টি বলা যায় না। বরং মনে করা যেতে পারে একটা ধাঁধাই রয়ে গেল পাওয়ার প্লে নিয়ে।
আইসিসি নিজেই অবশ্য পাওয়ার প্লে নিয়ে সবচেয়ে বেশি রহস্য করেছে। পুরো ক্রিকেট খেলার আইন নিয়ে যেমন তেমন, আইসিসি এই পাওয়ার প্লের আইন নিয়ে ২০০৫ সাল থেকে রীতিমতো ছেলেখেলা শুরু করেছে। ওয়ানডে ক্রিকেটে ১৯৯২ সাল থেকেই ‘ফিল্ডিং রেস্ট্রিকশন’ নামে প্রথম ১৫ ওভারের একটা ‘পাওয়ার প্লে’ ছিল। তখন সেটাকে অনেকে শুরুর ‘স্লগ ওভার’ বলে ডাকতেন। সে সময় নিয়মটা ছিল, এই ১৫ ওভারে দুজন খেলোয়াড় ৩০ গজ সীমানার বাইরে থাকতে পারবেন; বাকী ৩৫ ওভারে ওই সীমানার বাইরে থাকতে পারবেন পাঁচজন খেলোয়াড়।
এরপর ২০০৫ সালে বাধ্যতামূলক এই ফিল্ডিং সীমাবদ্ধতা কমিয়ে আনা হল দশ ওভারে। সঙ্গে যোগ করা হল দুটি পাওয়ার প্লের ১০ ওভার; পাঁচ ওভার করে একটি ব্লক। তখন দুটি পাওয়ার প্লেই ছিল ফিল্ডিং দলের হাতে। এরপর ২০০৮ সালে এই দুটির একটি পাওয়ার প্লে দিয়ে দেয়া হয় ব্যাটসম্যানদের হাতে। এর ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছিল ফিল্ডিং দল ১১ থেকে ১৫তম ওভার এবং ব্যাটিং দল ৪৬ থেকে ৫০তম ওভার পাওয়ার প্লে নিচ্ছে।
২০১১ সালে এই প্রচলন ঠেকাতে আইন করে দেয়া হয়—১১ থেকে ১৫তম ও ৪১ থেকে ৫০তম ওভারে পাওয়ার প্লে নেয়া যাবে না; মানে যা পাওয়ার প্লে নেওয়ার নিতে হবে ১৬তম থেকে ৪০তম ওভারের মধ্যে। এই আইন এখনও আছে। তবে গত বছর অক্টোবর মাসে আবার আইন সংশোধন করে ফিল্ডিং দলের পাওয়ার প্লে ব্যাপারটাই বাদ দিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে এখন বাধ্যতামূলক ১০ ওভার ফিল্ডিং রেস্ট্রিকশনের বাইরে একটাই ৫ ওভার পাওয়ার প্লে আছে—সেটা ব্যাটসম্যানদের হাতে।
এই ব্যাটিং পাওয়ার প্লে নিয়েই যত গোলমাল। এ ব্যাপারে বৈশ্বিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও ক্রিকেট বোদ্ধাদের বিশ্লেষণ বলছে, কোনো দলই এই ব্যাটিং পাওয়ার প্লে নিয়ে খুব স্বস্তিতে নেই। এই সময়ে কিছুটা রান বেশি ওঠে বটে; কিন্তু বেশি বেশি উইকেট পড়ে গিয়ে আরও বিপাক ঘটায়। দেখা গেল, ভারত-পাকিস্তান-ইংল্যান্ড অধিনায়ক প্রকাশ্যেই বলেছেন, তারা এখনও ঠিক জানেন না, ব্যাটিং পাওয়ার প্লে ব্যাটসম্যানদের উপকার করে কী না!
কেন? যেখানে তাদের জন্য সীমানা উন্মুক্ত করে দেয়া হয়, সেখানেই ব্যাটসম্যানরা কেন ব্যর্থ হন?
এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে সাবেক জাতীয় দল অধিনায়ক ও বর্তমান নির্বাচক হাবিবুল বাশার তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতেই বললেন, ‘ঠিক যে কারণে অধিকাংশ ফ্রি হিটে একটাও রান হয় না’!
এরপর ব্যাখ্যাটা আরো বিস্তৃত করে তিনি বলেন,‘এটা একই সঙ্গে টেকনিক্যাল ও মানসিক একটা খেলা হয়ে দাঁড়ায়। ফিল্ডিং রেস্ট্রিকশন কিছু বাড়তি রান বের করে দেয়। কিন্তু ফ্রি হিটের মতোই ব্যাটসম্যানদের একটা মেন্টাল ব্লক হয়ে যায়। তারা আগে থেকেই ধরে রাখে, এই পাঁচ ওভারের প্রতিটা বলেই চালাতে হবে। এখন প্রতিটা বল তো আর চালানোর মতো হয় না। ফলে ক্লোজে চলে আসা ফিল্ডারদের হাতে ক্যাচ চলে যায় অনেক বেশি। আসলে পূর্বনির্ধারিত এই রান করতেই হবে ধারণাটা চেপে বসায় ব্যাটসম্যানরা এই সমস্যায় ভোগে।’
এখান থেকে বের হওয়ার উপায় কী? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটাই উপায় পাওয়ার প্লেতেই সব রান করতে হবে—এই চ্যালেঞ্জ নেয়ার মানসিকতাটা ঝেরে ফেলা।
চাইলেই কী সেটা ঝেরে ফেলা যাবে!