প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দৈনন্দিন চাহিদা ও বিভিন্ন সমস্যা সমাধানেও এসেছে পরিবর্তন। কৃত্রিক বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমরা এর আগেও প্রতিবেদন করেছিলাম। এরই ধারাবহিকতায় এবার স্বাস্থ্যখাতে এইআই প্রযুক্তি ব্যবহার নিয়ে একটি আয়োজন করেছি। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে ডাক্তার ও রোগীরা কী ধরনের সমস্যার সমাধান পাবেন তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা রয়েছে এ লেখায়। সম্প্রতি লন্ডন সরকার এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের মধ্যদিয়ে স্বাস্থসেবার উন্নয়নের যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে তার আলোকে বিস্তারিত লিখেছেন মাহবুব শরীফ
বর্তমানে ইউকে সরকার ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস)-এ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের জন্য সু-স্পস্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এর মধ্যমে তথ্য ও উদ্ভাবনী কার্যে এবং প্রাথমিক রোগ নির্ণয়, দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিত্সায় আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ সিস্টেমের পরিবর্তন আনতে চায়। যুক্তরাজ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মধ্যমে খুব দ্রুত সময়ে রোগ নির্ণয়ের কাজ করবে।
এই ভিশনের ফলে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রথমত একজন মানুষ ডাক্তারের পরিবর্তে অসুস্থ রোগীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবে। স্বাস্থ্য বিষয়ক পেশাদারদের চিকিত্সা সংক্রান্ত বিষয়ে এই মাধ্যমটি সহয়ক হতে পারে। এমনকি তারযুক্ত, পরিধানযোগ্য স্মার্ট ডিভাইস ও স্মার্ট হোম সেন্সরগুলোর ডাটা বিশ্লেষণেও এআই প্রযুক্তি সহায়তা করবে। এটি একটি উচ্চাকাঙ্খার প্রযুক্তির উন্নয়ন যার মাধ্যমে আগামীতে টেকনোলজির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে। বর্তমানে এই প্রযুক্তি স্বাস্থ্যসেবায় তুলনামূলক কম ব্যবহূত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মনে প্রশ্ন, আসলেই এআই প্রযুক্তি কি আগামীতে ন্যাশনাল হেল্থ সার্ভিসে পরিবর্তন আনতে পারবে?
স্বাস্থ্যসেবায় এআই প্রযুক্তির ব্যবহারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা লক্ষণীয়। জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার সংশ্লিষ্ট অর্ধেকের বেশি মানুষ মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় এখন বিনিয়োগ হতে শুরু করেছে। বর্তমানে সামান্য কিছু কাজে এগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত এই অভিযোজনটি ব্যবহারের দুইটি লক্ষ্যের মধ্যে একটি পরিস্কার হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- ক্লিনিক্যাল অভ্যাস উন্নতকরণ, চিকিত্সকদের রোগ নির্ণয়ে সহায়তা করা, প্রসাশনের কাজে সহায়তা করা, বিভিন্ন অফিস ব্যবস্থপনায় সহয়তাসহ বিভিন্ন সংস্থানের বরাদ্দজনিত কাজগুলো সু-সজ্জিত করার কাজে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে।
ঠিক যেমনটি প্রয়োজন; এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবায় প্রসাশনিক কার্য আরো সহজতর হতে পারে। এই প্রযুক্তিটির আরো কার্যকরী ব্যবহার করা যেতে পারে। এটির মাধ্যমে ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কর্মসূচি সম্পর্কে সহায়তা করতে পারে এবং রোগীদের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। এতে করে রোগীদের সময় নষ্ট কম হবে এবং তাদের অনেক অর্থ বেঁচে যেতে পারে। উদাহারণ হিসেবে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবায় রোগীদের সরাসরি ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলার পরিবর্তে মেসেজিং চ্যাটবট ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্রকৃত স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি এই খাতে এআই প্রযুক্তির বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার ও মেশিন লার্নিং ব্যবহারের অনেকগুলো প্রকল্প রয়েছে। জাতীয় স্বাস্থ্য খাতে এআই প্রযুক্তি সর্বাধিক ব্যবহারের মধ্যে গুগলের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার দেখা গিয়েছে। রোগিদের চোখে সমস্যা হলে ও চোখের রেটিনাতে সমস্যা হলে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে স্থিরচিত্র স্ক্যান করে এবং চিকিত্সকের সুপারিশগুলো তৈরিতে সহায়তা করে। ইউনিভার্সিটি লন্ডন হসপিটালস ট্রাস্টে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে রেডিও থেরাপি দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এআই প্রযুক্তি ব্যবহারে দুইটি খাতে কাজের গতি কমে যাবে। অধিক পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে এবং নৈতিক উদ্বেগ এখানে কাজ করবে না। যাইহোক, কিছু নির্দিষ্ট ক্লিনিক্যাল ব্যবহারের ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে এআই প্রযুুক্তি ব্যবহার করে আগামীতে আরো শক্তিশালী পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব। যেমন ধরুন— একটি নতুন রোগ নির্ণয় ও বিদ্যমান অবস্থার অগ্রগতি জানতে স্ক্যানের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা করা। যথেষ্ট কঠিন তথ্যের বিষয়ে এআই প্রযুক্তি একজন মানুষ ডাক্তারের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুল ও তা দ্রুত সময়ে দিতে সক্ষম। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে অল্প সময়ে রোগীর দেহের বাইরে থেকে রোগ নির্ণয় করতে পরবে। এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে ন্যাশনাল হেল্থ সার্ভিসে প্রশিক্ষণ কার্যও পরিচালনা করতে পারবে। বিশ্বের বৃহত্তম একক স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা হিসেবে, প্রতি ৩৬ ঘণ্টায় ১ মিলিয়ন রোগী ও ১.৭ মিলিয়ন কর্মীর তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এমন কাজের বিশাল তথ্যভান্ডার সংরক্ষণ করা উচিত। বাসস্থান ও শিল্পে এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের দিক থেকে লন্ডন বিশ্বের চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে।
কাগজভিত্তিক রোগীর তথ্যগুলো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক উভয় ক্ষেত্রেই সংরক্ষণের জন্য তথ্য সরবরাহ করার আগে ডিজিটানাইজেশন করার প্রয়োজন রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই টেকনোলজি নিজেই এই সমস্যার সমাধান দিতে পারে। এছাড়াও, রোগীদের পুন:চিকিত্সা প্রদানে, রোগীর পুরানো তথ্য যাচাই করা, পুরানো তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থপত্র প্রদান করাসহ যাবতীয় বিষয়ে এআই প্রযুক্তি সহায়তা করতে পারে। ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস এআই প্রযুক্তি নিয়ে দূর্দান্ত কিছু করার পরিকল্পনা করছে। এজন্য প্রথমেই আইটি বেসিক সাজানোর প্রয়োজন।
এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে, স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধি, খরচ কমানো এবং ক্রমবর্ধমান ব্যবহার স্বাস্থ্যসেবায় নতুন দিগন্ত সৃষ্টি করতে পারে। বায়োয়িথিক্স কাউন্সিলের মুখপাত্র জনসন বলেন, ‘আমরা একটি বিশাল সিকোয়েন্স তৈরি করতে পারি তবে আমরা জানিনা এর পরে আর কি করতে হবে। জেনিটিক ডাটা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এআই এর সম্ভাবনা অনেক। আমাদের স্বাস্থ্যের অনেক ডাটা থাকে যা, জেনিটিক ডাটা বুঝতে সহায়তা করে।’ তিনি আরো বলেন, জিনেম সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তি খুব দ্রুততার সঙ্গে চলছে এটি বিশ্লেষণ করার মতো প্রযুক্তি পাইনি।’
এভাবেই স্বাস্থ্যসেবায় এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে জনসংখ্যা বিষয়ক বিশ্লেষণ, স্বাস্থ্যজনিত জীবন ধারা পরিবেশগত বিষয়গুলো কীভাবে অগ্রসর হবে তা নিয়েও কাজ করবে দেশটি।
যেহেতু এটি একটি নতুন প্রযুক্তি তাই স্বাস্থ্যসেবায় এই প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে এর চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করাও প্রয়োজন বলে মনে করে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস।
পরিস্কারভাবে, ডাটার নিরাপত্তা এবং রোগীদের আস্থার বিষয়টি উন্নত হতে হবে। প্রত্যেকটি মেডিক্যাল রেকর্ডে কিছু ব্যক্তিগত তথ্য বিদ্যমান থাকে এবং তাদের এই তথ্যগুলো ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে ব্যবহারের জন্য এআই প্রযুক্তিই তা পরিচালনা করবে। ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে আমরা আরো অনেক প্রযুক্তি ব্যবহার হতে দেখেছি। এগুলোর মধ্যে অনেকগুলো গোপনীয়তা ও কিছু সন্দেহ প্রবাণতাও রয়েছে। এআই প্রযুক্তির ক্ষেত্রে, ছোট ছোট অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলো এই টেকনোলজির প্রতি বিশ্বাস অর্জনের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ওয়ারউইক বিজনেস স্কুল এআই ইনেভেশন নেটওয়ার্কের ডিজিটাল উদ্ভাবক ও একাডেমিক পরিচালক সহযোগী অধ্যাপক ড.প্যানোস বলেন,‘ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে এআই প্রযুক্তির প্রতি মানুষের আস্থা অর্জন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘কোথাও একটি সমস্যা আছে, তথ্যগুলো সঠিকভাবে পরিচালিত হয় না। অনুমতিব্যতীত তথ্য সংক্রান্ত বিষয়ে মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করেছে যে তারা নতুন টেকনোলজি থেকে কী ধরনের সুবিধা পেতে পারে। তবে এই প্রযুক্তি অনেক কিছুই করতে পারে।
সূত্র: জেটডি নেট ডটকম