তিনি লেখাপড়া পছন্দ করেন না বলে পরীক্ষা এলেই হরতাল দেন
মুজিবুর রহমান, গাজীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০১৩, ২২:৫১
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিরোধীদলীয় নেতা হরতালের নামে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চান। হরতাল দিয়ে তিনি মানুষ খুন করছেন। তিনি বলেন, আজকের শিশুই আগামী দিনে প্রধানমন্ত্রী হবে। অথচ তিনি তাদের পরীক্ষা এলে হরতাল দেন। শেখ হাসিনা বলেন, বিরোধী দলীয় নেত্রী লেখাপড়া ‘পছন্দ করেন না’ বলেই পরীক্ষা এলে হরতাল দিয়ে তা বন্ধ করেন। এর একটা কারণ আছে। উনি একবার মেট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন। বাংলা, উর্দু আর অংক ছাড়া সব বিষয়ে ফেল করেছিলেন। উনি ভাবেন নিজে যখন পারেননি, ছেলে-মেয়েরা কেন পাস করবে।
বিরোধী দলীয় নেতার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুখে উনি বলেন কি, আর কাজে করেন কি? উনি সংবাদ সম্মেলন করে শান্তির বাণী শোনালেন, সন্ত্রাস জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দেবেন না বললেন। আর করলেন কি? বোমা মেরে শিশুর চোখ নষ্ট করলেন। তার লেলিয়ে দেয়া সন্ত্রাসীরা পুলিশ, বিজিবি আর সেনা সদস্য হত্যা করল।... সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালাল।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে গাজীপুরে চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ মাঠে জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতাকে আলোচনার জন্য আমি ফোনে আহ্বান জানিয়েছিলাম। তিনি তার সহকারীর মাধ্যমে আমার এডিসিকে জবাব দিলেন রাত ৯টার আগে ফোন ধরতে পারবেন না। যার তৈরি হতে রাত ৯টা বাজে, তিনি দেশ চালাবেন কিভাবে? তিনি (খালেদা) আবার প্রধানমন্ত্রীও হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, মোবাইলে আলাপকালে বিরোধীদলীয় নেতাকে আলোচনার অনুরোধ জানিয়ে ঘোষিত হরতাল প্রত্যাহারের অনুরোধ জানালাম। কিন্তু তিনি আমার অনুরোধ রাখলেন না। হরতাল প্রত্যাহার করলেন না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করার জন্য এ হরতাল দেয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, সম্প্রতি ৬০ ঘণ্টার হরতালে ২০টি প্রাণ ঝরে গেল। তারা হরতাল না দিলে এতগুলো প্রাণহানী ঘটতো না। হরতালে দেশের শিল্প কলকারখানার উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছিলেন। পরে জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতায় এসে সে বিচার বন্ধ করে দেন। তিনি বলেন, বিএনপি নেত্রী দেশের উন্নয়ন চান না। তিনি চান হাসিনামুক্ত বাংলাদেশ। আর এ জন্যই তিনি (খালেদা) ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তার ছেলে ও মন্ত্রীকে দিয়ে গ্রেনেড হামলা চালালেন। তারা এই গ্রেনেড হামলা চালিয়ে আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী নির্বাচন বর্তমান সংবিধান অনুসারেই অনুষ্ঠিত হবে। সে নির্বাচন হবে সম্পূর্ণ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। নির্বাচন কমিশন সে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করবে। জনগণ ভোটের মালিক। আমরা জনগণের সেই অধিকার নিশ্চিত করেছি। জনগণ স্বাধীনভাবে ভোট দেবে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর যতগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে সেসব নির্বাচন নিয়ে কোন প্রশ্ন উঠেনি। কাজেই আগাীম নির্বাচন নিয়েও কোন প্রশ্ন উঠবে না। তিনি অভিযোগ করেন, খালেদা জিয়া মুখে বলেন একটা আর করেন আরেকটা। তিনি শান্তির বাণী শুনান অথচ তার সরকারের আমলে জঙ্গীবাদ, সন্ত্রাস মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। আমরা ক্ষমতায় এসে জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাস দমন করেছি। বাংলাদেশকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি। বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উন্নয়নের রোড ম্যাপ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট আকম মোজাম্মেল হক এমপি’র সভাপতিত্বে জনসভায় আরো বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি, অ্যাডভোকেট রহমত আলী এমপি, গাজীপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আখতারউজ্জামান, সিমিন হোসেন রিমি এমপি, জাহিদ আহসান রাসেল এমপি, জাহানারা বেগম এমপি, আহমদ হোসেন, এনামুল হক শামীম, ওমর ফারুক চৌধুরী, পংকজ দেবনাথ, রুহুল আমিন মাদানী, হারুন অর রশিদ, মোতাহার হোসেন মোল্লা, নাজমা আক্তার এমপি, অধ্যাপিকা অপু উকিল এমপি, অ্যাডভোকেট সফিকুল ইসলাম বাবুল, আমানত হোসেন খান প্রমুখ। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক টঙ্গী পৌরসভার মেয়র অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খান সভা পরিচালনা করেন।
প্রধানমন্ত্রী বেলা তিনটার দিকে হেলিকপ্টারযোগে গাজীপুরে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের হেলিপ্যাডে এসে অবতরণ করেন। সেখান থেকে তিনি সড়ক পথে ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ মাঠে জনসভায় যোগ দেন। প্রধানমন্ত্রী বেলা সোয়া তিনটার দিকে সরাসরি জনসভা মঞ্চে এসে পৌঁছেন। এসময় সমবেত হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সমর্থকরা নানা শ্লোগান দিয়ে তাকে শুভেচ্ছা জানান। প্রধানমন্ত্রীও হাত নেড়ে জনতাকে অভিনন্দন জানান। জনসভা মঞ্চে উঠার আগে প্রধানমন্ত্রী জনসভাস্থলের পাশে সুইচ টিপে ৩৭ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০টি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ফলক উন্মোচন করেন। সেখানে তিনি যেসব প্রকল্প উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন সেগুলো হচ্ছে- বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, সাসেক সড়ক সংযোগ (জয়দেবপুর-চন্দ্রা-টাঙ্গাইল-এলেঙ্গা) মহাসড়ক ৪ লেনে উন্নীতকরণ, নবীনগর-ডিইপিজেড-চন্দ্রা সড়ক ৪ লেনে উন্নীতকরণ, গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট (বিআরটি, গাজীপুর-এয়ারপোর্ট), দ্বিতীয় কাচপুর, দ্বিতীয় মেঘনা ও দ্বিতীয় গোমতী সেতু নির্মাণ এবং বিদ্যমান সেতু পুনর্বাসন প্রকল্প, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ভবন-শ্রীপুর, সম্প্রসারিত শ্রীপুর উপজেলা কমপ্লেক্স ভবন, গাজীপুর ৫২ মেগাওয়াট ডুয়েল ফুয়েল পাওয়ার প্ল্যান্ট, ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়ি মাঠের সংস্কার/সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প, শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়াম-টঙ্গী, ৪০ মি: গার্ডার ব্রিজসহ লতিফপুর (আরএন্ডএইচ), ভাওয়াল মির্জাপুর জিসি রাস্তা (মরহুম হাবিল উদ্দিন শিকদার সড়ক) কার্পেটিং দ্বারা উন্নয়ন, হবুয়ারচালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অতিরিক্ত শ্রেণীকক্ষ নির্মাণ কাজ, শ্রীফলতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শ্রেণীকক্ষ ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ নির্মাণ কাজ, ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল-টঙ্গী নির্মাণ প্রকল্প।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রী ঢাকা বাস রেপিট ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট- এর আওতায় নির্মিতব্য (এমআরটি) লাইন-৬ (মেট্টোরেল), ১৫০ মেগাওয়াট ডুয়েট ফুয়েল পাওয়ার প্ল্যান্ট, ৫০০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল গাজীপুর, ট্রমা সেন্টার, নার্সিং ইনস্টিটিউট, উপজেলা আইসিটি ট্রেনিং এন্ড রিসোর্স সেন্টার ফর এডুকেশন এর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। এর মধ্যে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ৫টি প্রকল্প রয়েছে। জনসভা শুরুর আগে থেকেই কালিয়াকৈর, শ্রীপুর, কালিগঞ্জ, কাপাসিয়া, টঙ্গীসহ আশপাশের এলাকা থেকে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা মিছিল ও বাদ্যযন্ত্র সহকারে সভাস্থলে এসে উপস্থিত হন। দুপুর দুইটার আগেই জনসভাস্থল কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।