১৮ দলের প্রতিবাদ সমাবেশ

সরকার সংবিধানের ফাঁদে পড়েছে

সরকার নিজেই এখন সংবিধান সংশোধনীর ফাঁদে পড়েছে বলে দাবি করেছেন বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট নেতারা। তারা বলেছেন, নিজেদের আনা পঞ্চদশ সংশোধনীর ফাঁদে পড়ে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই সরকারের গণতান্ত্রিক মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তাছাড়া নির্বাচনকালীন সময়ে দেশে যে ধরনের সরকার থাকার কথা, বর্তমানে তা নেই। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জোট আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে তারা একথা বলেছেন। টানা ৬০ ঘণ্টার হরতাল পালন শেষে গত কয়েকদিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীদের হত্যা, নির্যাতন, গ্রেফতার ও ‘মিথ্যা’ মামলা দায়েরের প্রতিবাদে পূর্বঘোষিত এই কর্মসূচি পালন করা হয়। সমাবেশে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকার মুখে সমঝোতা-সংলাপের কথা বললেও আসলে তারা সেটি চায় না। জনগণের চাপে পড়ে টেলিফোনের নামে একটি নাটক সাজিয়ে সরকার দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। টেলিফোন আলাপে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলীয় নেতাকে বারবার একটি কথাই বলেছেন-হরতাল প্রত্যাহার করুন, আসুন সর্বদলীয় সরকার নিয়ে আলোচনা করি। সব বিষয়ে আলোচনার কথা বললেও প্রধানমন্ত্রী কার্যত শুধু নিজের ফর্মুলা নিয়েই আলোচনার কথা বলেছেন। আমাদের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট- দেশের ৯০ ভাগ মানুষ যে নির্দলীয় সরকারের দাবিতে সোচ্চার, তা নিয়েই আলোচনা হতে হবে। মির্জা ফখরুল বলেন, নির্দলীয় সরকার ছাড়া এদেশে নির্বাচন হবে না। আমরা ক্ষমতার জন্য নির্দলীয় সরকার চাচ্ছি না। সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরির মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থেই আমরা এটা চাচ্ছি। নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশে তিনি বলেন, আরপিও সংশোধন ও আচরণ বিধি তৈরি করে জনগণকে বিভ্রান্ত করবেন না। এগুলো এখন বন্ধ করে পকেটে রাখুন, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন। তা না হলে জনগণ আপনাদেরও ক্ষমা করবে না। তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর তীব্র সমালোচনা করে বিএনপির মুখপাত্র বলেন, ইনু সাহেব একদিন আগে বললেন, দুই নেত্রীর ফোনালাপের রেকর্ড আছে, তা প্রকাশ করা হবে। পরদিন তা টেলিভিশনসহ গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হলো। এটা সম্পূর্ণ আইন বিরোধী ও অপরাধমূলক কাজ। কারণ সংশ্লিষ্টদের অনুমতি ছাড়া এই ধরনের কথোপকথন জনসমক্ষে প্রকাশ করা যায় না। ফোনালাপ প্রকাশ করে তথ্যমন্ত্রী আসলে কার পক্ষে কাজ করলেন ? ‘সংলাপ ও নির্বাচনের ট্রেন ধরতে না পারলে জামায়াত-হেফাজতের ট্রেন ধরে পাকিস্তান চলে যান’-বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উদ্দেশে বলা ইনুর এই মন্তব্যের নিন্দা জানিয়ে ফখরুল বলেন, আপনার এ কথার ধিক্কার জানাই। আপনার এই ধরনের উক্তি ঔদ্ধত্যের শামিল। তিনি বলেন, আপনি (ইনু) ’৭১ এ কোথায় ছিলেন? আজ আপনি যাদের মন্ত্রী, তাদের নেতা শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে গণবাহিনী সৃষ্টি করে আপনি অস্ত্র হাতে লড়াই করেছিলেন। আপনার কারণে সেদিন হাজার-হাজার মেধাবী তরুণ-যুবককে প্রাণ দিতে হয়েছিল। তথাকথিত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে আপনারা হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিলেন। তাই বলবো, আপনি আগে জনগণের কাছে ক্ষমা চান। সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী স্ববিরোধী ও অস্বচ্ছ। এ কারণে সরকার নিজেই এখন এর ফাঁদে পড়েছে। নির্দলীয় সরকারের অধীনেই এদেশে নির্বাচন হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনদিনের হরতালে সরকার আগের জায়গা থেকে নড়ে এখন বলছে, দলীয় নয়, সর্বদলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে। আন্দোলন যখন আরও বেগবান হবে তখন আপনারাই বাধ্য হয়ে বলবেন, নির্দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্য ও সরকারের গুণ্ডা বাহিনী ৬০ ঘণ্টার হরতালে বিরোধী দলের ২২ জনকে হত্যা করেছে। এই খুনের দায় শেখ হাসিনাকেই নিতে হবে। পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি’র উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, অতি উত্সাহী হয়ে ও সরকারের অন্যায় নির্দেশে যারা বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের হত্যা করছেন, তালিকা করে একদিন তাদের বিচার করা হবে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার বলেন, আওয়ামী লীগের বাকশালের মোহ এখনও কাটেনি। সংবিধানে যে পঞ্চদশ সংশোধনী আনা হয়েছে তা কোনো সভ্য দেশে হতে পারে না। ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেন, তত্ত্বাবধায়ক বাতিল করা বেআইনি। কারণ জনগণ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থেই তত্ত্বাবধায়ক করা হয়েছিল। ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, শেখ হাসিনা উপলব্ধি করেছেন, তত্ত্বাবধায়ক হলে তিনি আর ক্ষমতায় আসতে পারবেন না। এজন্য তিনি ২২ জনকে হত্যা করেছেন। তার ‘খায়েসে’র কারণেই আজ সংকট। তাই এর সমাধানও তাকেই করতে হবে। মির্জা আব্বাস বলেন, মানুষ রাস্তায় নেমেছে, দাবি আদায় না করে আর ঘরে ফিরবে না। বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। তাই যতই চেষ্টা করুক, তারা ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। সমাবেশে সভাপতি ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাদেক হোসেন খোকা বলেন, এই সরকারের পতন অনেকটাই হয়ে গেছে। কাঁপতে-কাঁপতে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলীয় নেতাকে ফোন করেছেন। যে কথা শুনেছেন, তাতে প্রধানমন্ত্রীর নাকি তিনদিন ধরে ঘুম হয়নি। সরকারকে বলবো, তত্ত্বাবধায়কের দাবি মানুন, তাতে আপনাদের লাভ হবে। কারণ এর ফলে ২০১৯ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার অন্তত চেষ্টা করতে পারবেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নেতারা কথায়-কথায় সংবিধানের দোহাই দেন। কিন্তু এই সংবিধান তো একটি ক্লাব বা সমিতির গঠনতন্ত্রের চেয়েও নিকৃষ্ট। তিনি আওয়ামী লীগের হানাদার বাহিনীকে সমুচিত শিক্ষা দেয়ার জন্য দলীয় কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান। সমাবেশে জামায়াত নেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের নামে সরকার প্রহসন করছে। জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান বলেন, ঐতিহাসিক এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই শেখ হাসিনাকে আত্মসমর্পণ করানো হবে। আজ গায়েবানা জানাজা, কাল সারাদেশে বিক্ষোভ হরতাল চলাকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতায় নিহত বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের স্মরণে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আজ শুক্রবার বাদ জুমা দেশব্যাপী গায়েবানা জানাজার আয়োজন করেছে ১৮ দল। ঢাকায় নয়াপল্টনে বাদ আসর বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এই জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত মঙ্গলবার এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এছাড়া গ্রেপ্তারকৃত নেতা-কর্মীদের মুক্তি দাবিতে এবং ‘মিথ্যা’ মামলার প্রতিবাদে আগামীকাল শনিবার সারাদেশে উপজেলা পর্যায়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ১৮ দল। গতকাল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশ থেকে এই কর্মসূচির ঘোষণা দেন মির্জা ফখরুল।