অচল অর্থনীতি স্থবির বাণিজ্য

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, হরতালসহ সহিংস ঘটনার ফলে দেশের শিল্প-বাণিজ্য খাতে ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে পণ্য পরিবহনে জটিলতা, অন্যদিকে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে স্থবিরতা- সবমিলিয়ে কলকারখানায় উত্পাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। স্থবিরতা নেমে এসেছে অর্থনীতিতে। রাজনৈতিক সংকট সমাধান না হলে শিল্পের চাকা ঘুরবে না- এমনটাই শেষ কথা নয়। শিল্প টিকিয়ে রাখা যাবে কি না, তা নিয়েই সংশয় এখন ব্যবসায়ী মহলে। এক হরতাল শেষ হলো তো আরেক হরতাল শুরু, বিক্ষোভ, অবরোধ এভাবেই চলবে—এমন হুঁশিয়ারি বিরোধীদলীয় নেতাদের। শুনে আতঙ্কিত মনেও ফুঁসছেন ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা। যদি এভাবেই চলতে থাকে তবে ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের বোঝা আরও বাড়বে। মন্দ ঋণের দায়ে গলা নিচু করতে হবে ব্যবসায়ীদের। কিন্তু দোষটা কার? ‘ইচ্ছেকৃত খেলাপি’দের কথা বাদ দিয়েও ব্যাংক ঋণ শোধের ভাল ট্র্যাক রেকর্ড আছে—এমন উদ্যোক্তাদেরও হতে হবে ঋণ খেলাপি। ব্যাংকগুলোরও করার কিছু নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মেই তাদের হাত-পা বাঁধা। যদিও ‘ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কে’র বিষয়টি ব্যাংকে গুরুত্ব বহন করে। কিন্তু পরিস্থিতির কাছে অসহায় উদ্যোক্তারা এখন ভয়ানক অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৯১ শতাংশ খেলাপী ঋণে পরিণত হয়েছে। জুন প্রান্তিক শেষে মোট খেলাপী ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ৩১০ কোটি টাকায়। যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৩ হাজার ৩১০ কোটি টাকা বেশি। আর চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকের চেয়ে এক হাজার ২৯০ কোটি টাকা বেশি। এ অবস্থায় পরিস্থিতির শিকার শিল্পখাতের জন্য অন্তর্বর্তী মেয়াদের জন্য কিছু প্রণোদনা দেয়ার প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফিনান্সিয়াল ইকনোমিস্ট ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, বাংলাদেশে গ্যাস-বিদ্যুত্ সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিল্পখাত। এখনো সবখানে জ্বালানির স্বাভাবিক সরবরাহ নেই। এরই মধ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচি। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পগুলোর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করতে পারে। বিশেষত: ব্যাংকগুলো যেহেতু মন্দ ঋণে আটকে যাচ্ছে, সেখানে সুদহারে কিছু ছাড় দেয়া যেতে পারে। তাতে গ্রাহকের সুবিধা হবে। আপতকালীন সংকট মোকাবেলায় এ ধরনের ব্যবস্থাপনা দোষণীয় নয়। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, হরতালসহ দেশব্যাপী সহিংস ঘটনার ফলে যে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তার ইতি ঘটুক এটাই চান ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ রকম স্থবিরতায় সময়মতো ব্যাংক ঋণের কিস্তি শোধ করা, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেয়া নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। ফলে শ্রমিক অসন্তোষের আতঙ্কে রয়েছেন অনেকেই। দেশের রপ্তানির চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্পে নেমে এসেছে স্থবিরতা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করে দিচ্ছেন বলেও জানিয়েছেন অনেকে। গত তিনদিনের টানা হরতালে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি ও রপ্তানি কন্টেইনারের জট স্বাভাবিক অবস্থায় আনতে কম সময় লাগছে না। আগামী সপ্তাহে আরো ৩ দিনের হরতাল-অবরোধের ডাক দিয়েছে বিরোধীদলীয় জোট। ফলে অর্থনৈতিক সংকট আরো ঘনীভূত হওয়ার আশংকা করছেন ব্যবসায়ীরা। তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর হিসাব অনুযায়ী, একদিনে হরতালে উত্পাদন ব্যাহত হয় প্রায় ২৫০ কোটি টাকার। জানুয়ারি-মার্চ এ তিন মাসে হরতালের কারণে শুধু এয়ারফ্রেইট বাবদ স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩৯০ কোটি টাকা ব্যয় বেড়েছে। এই সময়ে ৩৫টি কারখানার ২৬ লাখ ৫৪ হাজার ডলারের অর্ডার বাতিল হয়েছে। শুধু গার্মেন্ট শিল্পই নয়, সব ধরনের শিল্পখাতই চলমান রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিজিএমইএ’র সভাপতি আতিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, তৈরি পোশাক কারখানাগুলো হরতালের আওতামুক্ত হলেও এ খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রায় সকল খাতই হরতালে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে সময়মতো অর্ডারগুলো শিপমেন্ট করা সম্ভব হয় না। ফলে শ্রমিকদের সময়মতো বেতন-ভাতা দেয়া ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি। হরতালে তৈরি পোশাক শিল্প সংশ্লিষ্ট সকল খাতকে হরতালের আওতামুক্ত রাখার আহ্বান জানান তিনি। চলমান অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি সবুর খান ইত্তেফাককে বলেন, একদল আরেক দলকে ঘায়েল করার জন্য রাস্তায় নামে। কিন্তু ক্ষতির শিকার হই আমরা ব্যবসায়ীরা। উভয় রাজনৈতিক দলকে সমঝোতার জন্য আমরা চাপ দেব। তারা একত্রিত হয়ে সংকট সমাধানে উদ্যোগী না হলে আমরা আমাদের কর্মসূচি ঠিক করব।