বাংলাদেশ- পৃথিবীর মানচিত্রে ছোট একটি দেশ যার প্রত্যেকটি মানুষ স্বপ্ন দেখে এবং শৌখিনতা করতে ভালোবাসে। এই দেশে শৌখিনতার অনেক বড় একটি আইটেম টেকনোলজির ব্যবহার - সেটা হোক না ছোট একটি মোবাইল ব্যবহার। যদিও টেকনোলজি আজ শুধু শৌখিনতার মধ্যেই নেই- ডিজিটাল বাংলাদেশে নিজস্ব স্যাটেলাইট ব্যবহারও শুরু হয়ে গেছে। দৈনন্দিন জীবনে যেকোনো টেকনোলজি ব্যবহারের একটি অপরিহার্য অঙ্গ সফটওয়্যার টেকনোলজি যেটি একাই একটি বড় ইন্ডাস্ট্রি।
সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি বাংলাদেশে খুব বেশি পুরাতন না হলেও গত ২০ বছরে এটি অনেক বাধা বিপত্তির মধ্যদিয়ে বড় হচ্ছে। এই বাধাগুলো কাঁটিয়ে উঠতে পারলে সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি গার্মেন্টস বা বিদেশে মানবসম্পদের মতো বড় একটা আয়ের খাত হবে। আমার এই লেখাটির প্রধান উদ্দেশ্য লোকাল সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রির এই বাধাগুলো চিহ্নিত করা, যাতে করে বিষয়গুলোর সমাধানের উদ্দ্যোগ নেয়া যায়। সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোতে বাধাগুলো হলো-
যথাযথ ইনভেস্টমেন্ট না হওয়া
আমাদের দেশে সফটওয়্যার প্রোডাক্ট/প্লাটফর্মে পর্যাপ্ত ইনভেস্টমেন্ট হচ্ছে না। এর প্রধান কারণ হিসেবে বলা যায় — আমাদের কাছে পর্যাপ্ত বাজার তথ্য না থাকা। দক্ষ এবং উচ্চ মানসম্পন্ন বিজনেস প্রফেশনালের অভাব। বড় গ্রুপ প্রতিষ্ঠান গুলোর বিভিন্ন কারণে সফটওয়্যার ব্যবসায় অনীহা। বেশিরভাগই ইঞ্জিনিয়ারদের গড়া স্টার্টআপ যারা ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টে অদক্ষ। ব্যাংক ফাইনেন্স এর অভাব। সর্বোপরি সফটওয়্যার ইন্টেঞ্জিবল হওয়া।
দক্ষ ও মানসম্পন্ন কর্মীর অভাব
আইটি ইঞ্জিনিয়ারদের ক্যারিয়ার সিলেকশন ও তৈরি যথারীতি ভুল হচ্ছে। কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া বেশির ভাগ শিক্ষার্থীরাই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়। এই বিষয়ে পড়ে অনেক ধরনের ইঞ্জিনিয়ারিং পোস্টের জন্য কীভাবে তৈরি হওয়া যায় সেই জ্ঞানের অভাব। যার ফলে পড়ালেখা শেষ করে শিক্ষার্থীরা বলছে জব পাচ্ছে না অন্যদিকে সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো যোগ্যকর্মী খুঁজে পাচ্ছে না।
পর্যাপ্ত পরিমাণ আইটি কোম্পানি থাকার পরও এস্টাব্লিশমেন্টের অভাবে অন্য বিষয় থেকে পড়াশোনা করা প্রফেশনালরা সফটওয়্যার কোম্পানিতে আসার প্রবণতা খুবই কম।
সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ সিনিয়রের অভাবে নতুন প্রফেশনালরা এটাকে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিতে ভয় পাচ্ছে।
অপরিকল্পিত সফটওয়্যার/আইটি কোম্পানি গড়ে তোলা
অপরিকল্পিতভাবে সফটওয়্যার কোম্পানি শুরু হচ্ছে প্রতিনিয়ত, যেখানে উন্নত দেশে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া কোনো সফটওয়্যার কোম্পানি শুরু হয় না। এই অপরিকল্পিত সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো সকল ধরনের প্রোডাক্ট ও সার্ভিস বিক্রি করার চেষ্টা করে। ফলে, বাজারে অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা, মূল্য বৈচিত্র এবং দিন শেষে কাস্টমার ট্রাস্ট নষ্ট হচ্ছে। এই হুজুগ থেকে আমরা বের হতে না পারলে সফটওয়্যার বাজার আরো নষ্ট হয়ে পরবে।
সফটওয়্যার এমন একটি ব্যবসা যা কোনো স্বল্প মেয়াদি পরিকল্পনা দিয়ে করা সম্ভব নয়। অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। যার অভাবে আমরা দেখতে পাই একটি কোম্পানি এক ধরণের সার্ভিস থেকে আরেক ধরনের সার্ভিসে দ্রুত শিফট হয়ে যাচ্ছে। এর মানে প্রথম সার্ভিস ব্যবসার পরিকল্পনাটি দীর্ঘমেয়াদি ছিল না। যেকোন ব্যবসায় ভিশনারি হওয়ার জন্য ধৈর্যশীলতা ও কঠিন মনোবল প্রয়োজন। আজকে যাদেরকে ৪০-৪৫ বছর ইন্ডাস্ট্রিতে দেখছেন তাদের ইতিহাস পড়লে দেখা যায় তাদের দক্ষতার সঙ্গে মানসিক শক্তি ও ধৈর্যশীলতা তাদেরকে আজকের দিনে উপনীত করেছে।
সফটওয়্যার ব্যবসাকে সার্ভিস ওরিয়েন্টেড না করতে পারা
দেশের অধিকাংশ সফটওয়্যার কোম্পানি প্রথম কয়েক বছর বেশ কিছু কাস্টমারের কাছে সফটওয়্যার দিচ্ছে। কিন্তু এক বা একাধিক বছর পর কাস্টমারগুলোকে সার্ভিস/সাপোর্ট দেয়ার অবস্থায় থাকছে না। বেশির ভাগ সফটওয়্যারের আর্কিটেকচার এবং কোম্পানির অবকাঠামো পরবর্তীতে কাস্টমার সাপোর্ট দেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকছে না, দিন শেষে সফটওয়্যারগুলো ফেইল করছে। ফলে কাস্টমার সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোর উপর ট্রাষ্ট হারাচ্ছে অন্যদিকে সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো কাস্টমারের দোষ দিচ্ছে। সর্বোপরি সফটওয়্যার বাজারের বাঁধাগুলোর মধ্যে সার্ভিস ওরিয়েন্টেড না হওয়া অনেক মুখ্য কারণ। প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট এবং বাজারজাত করার সময় সর্বনিম্ন ২০ বছর সার্ভিস দেয়ার কথা চিন্তা করা উচিত।
লেখক :ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ডিভাইন আইটি লিমিটেড