উচ্চ সুদের ঋণ নিয়ে উত্পাদন
প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০১৩, ২২:৫৬
ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ হার দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দীর্ঘমেয়াদী ও চলতি মূলধন ঋণে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ঋণের সুদের হার বর্তমানে সবচেয়ে বেশি। আর উচ্চ হারে সুদ গুণতে গিয়ে বেড়ে যাচ্ছে বিনিয়োগ ব্যয়। এর সঙ্গে বর্তমান হরতাল-অবরোধের মত কর্মসূচির ফলে বেড়ে যাচ্ছে উত্পাদন খরচও। যার প্রভাব পড়ছে ভোক্তাদের ওপরে।
সংশ্লিষ্টরা বর্তমানে প্রযোজ্য নতুন ঋণ শ্রেণীবিন্যাসকরণ নীতিমালার পরিবর্তে পূর্ববর্তী নীতিমালা বহাল রাখার সুপারিশ করেছেন। তারা বলেছেন, প্রয়োজনে এক বছর পরে নতুন নীতিমালা চালু করা যেতে পারে।
দেশীয় শিল্প-উদ্যোক্তারা বলেন, প্রতিযোগী বেশিরভাগ দেশের সুদের হার কম থাকায় এসব দেশের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের তুলনায় প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকতে না পেরে শিল্প উদ্যোক্তাদের পক্ষে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে দীর্ঘদিন ধরে অর্জিত প্রবৃদ্ধির ধারা ব্যাহত হতে পারে।
এদিকে, উচ্চ সুদ হারের ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে চিঠি লিখে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই বলেছে, সুদের হার কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া জরুরি। সংগঠনটির পক্ষে বলা হয়, উচ্চ সুদের কারণে একদিকে যেমন ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ও ঋণপ্রবাহ কমে যাচ্ছে, তেমনি খেলাপি ঋণের পরিমাণও বেড়ে যাচ্ছে।
এফবিসিসিআই সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ বলেন, উত্পাদন ব্যবস্থাকে গতিশীল করার জন্য ব্যাংকের সুদের হার সহনীয় বা সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকা বাঞ্ছনীয়।
সুদের হার ও চার্জের বর্তমান পরিস্থিতি ঃ
২০১২ সালে সুদের হারের ঊর্ধ্বসীমা তুলে নেয়ার পর থেকে দেশে ব্যাংক ঋণের সুদ হার ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদী মূলধনের ক্ষেত্রে দেশে সুদের হার বর্তমানে ১৬-১৯ শতাংশ। এর সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণীতে সার্ভিস চার্জ আদায় করা হচ্ছে সমন্বয়হীনভাবে। এছাড়াও মেয়াদ পূর্তির আগে ঋণ সমন্বয় করতে চাইলে কখনও কখনও অতিরিক্ত চার্জ আদায় করা হয়ে থাকে যা সুদের হারকে আরও বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, আমানত ও ঋণের সুদ হারের পার্থক্য বা স্প্রেড ৫ শতাংশের মধ্যে থাকার কথা থাকলেও ৫২টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে বেশকয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের স্প্রেড এখনো ৫.০ শতাংশের বেশি, এর মধ্যে সবগুলো বিদেশি ব্যাংক রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিশেষায়িত চারটি ব্যাংকের স্প্রেড ২.৭০ শতাংশ যা ব্যাংকিং খাতে সর্বনিম্ন পর্যায়ে অবস্থান করছে। এর পরের অবস্থানে রয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংক, স্প্রেড এখন ৩.৩৪ শতাংশ। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের গড় স্প্রেড হলো ৫.২৬ শতাংশ এবং বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের গড় স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৮.৬৭ শতাংশে।
ব্যাংকগুলো সাধারণত বৈদেশিক বাণিজ্য থেকে শুরু করে সাধারণ ব্যাংকিং-এর জন্য বিভিন্ন ধরনের চার্জ, ফি ও কমিশন নিয়ে থাকে। এর মধ্যে আমদানি ও রফতানি বাণিজ্যের জন্যে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের চার্জ, কমিশন ও ফি আরোপ করে। এছাড়াও অধুনা অন-লাইন ব্যাংকিং সুবিধার নামেও অতিরিক্ত চার্জ নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর বাইরে বিভাগীয় বা জেলা পর্যায়ের শাখায় অন-লাইন সুবিধার আওতায় টাকা উত্তোলন করতে গেলে অতিরিক্ত চার্জ দিতে হয় বলেও জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
উচ্চ সুদ হারের কারণ ঃ
বাংলাদেশে সুদের হার উচ্চ হওয়ার কিছু কারণ চিহ্নিত রয়েছে। এগুলো হচ্ছে সুদের হারের ঊর্ধ্বসীমা তুলে নেয়া, ব্যাংকের উচ্চ পরিচালনা ব্যয়, খেলাপি ঋণ বেশি হওয়ার ফলে বেশি মাত্রায় প্রভিশনিং, সাড়ে ৪২ শতাংশ হারে করপোরেট ট্যাক্স, উচ্চ মুনাফা করার প্রবণতা।
সুদের হার কমাতে কিছু সুপারিশ:
বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য অর্থমন্ত্রণালয়ের কাছে বেশ কিছু সুপারিশ দিয়েছে এফবিসিসিআই। এরমধ্যে রয়েছে, ব্যাংকসমূহকে খাতভিত্তিক ঋণ প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে উত্পাদনশীল খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা। যদিও এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে নির্দেশনা জারি করেছে। তথাপি ঋণ বিতরণে গুণগত মানের প্রতি বেশি নজর দেয়ার পাশাপাশি মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
দেশে এখন আমানত ও ঋণের সুদ হারের মধ্যকার ব্যবধান (স্প্রেড) ৫ শতাংশ। এটাকে ৩ শতাংশের মধ্যে কমিয়ে আনা প্রয়োজন। ব্যাংকের পরিচালনা ব্যয়, সঞ্চিতির পরিমাণ, করপোরেট ট্যাক্স ও মুনাফা কমিয়ে আনলেই স্প্রেড কমে আসবে। ফলে সুদের হারও কমবে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাসহ বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে আপাতত: দুই বছরের জন্য প্রকল্প ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ ১১ শতাংশে নির্ধারণের সুপারিশ করে এফবিসিসিআই বলেছে, খেলাপি ঋণ বেশি হলে সুদের হার কমানো কঠিন। খেলাপী ঋণ নির্ধারণের নীতিমালা শিথিল করা দরকার।