নতুন অফিস নতুন সহকর্মী
প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০১৩, ২০:১৭
‘খুব অস্বস্তির সাথে এক ডেস্ক থেকে আরেক ডেস্কের সামনে যাচ্ছি আর ব্যাংকের ম্যানেজার আমাকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। সবসময়ই নিজেকে এ জায়গায় এক অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথি হিসেবে অনুভব করছি। মনের মধ্যে এক অস্বাভাবিক জড়তা তৈরি হচ্ছে। নতুন শাখায় নতুন লোকদের মাঝে এক ধরনের ভীতিই অনুভব করছি।’ এভাবেই ব্যাংক কর্মী নিপা (ছদ্মনাম), বদলি হয়ে নতুন শাখায় যোগ দেয়ার সময়ের মনের অবস্থার কথা বলছিলেন। তিনি বলেন, ব্যাংকের চাকরি জীবনে অনেক জেলার নানা শাখায় আমি বদলি হয়েছি। এক জায়গায় দুই কি তিন বছরের বেশি কখনই থাকিনি। একটি শাখার সবাইকে বুঝে, চিনে নিজেকে মানিয়ে নেবার পরই বদলি হতে হয় অন্য শাখায়। এটাই নিয়ম আমাদের ব্যাংকের।
অবাকভাবে আমি লক্ষ্য করেছি যে, নতুন সব শাখায় যোগ দেয়ার সময় সবার পক্ষ থেকেই আমি খুব অসহযোগিতা পেয়েছি। একজনকে নতুন জায়গায় মানিয়ে নিতে সাহায্য করতে কেউ সাধারণত এগিয়ে আসেনি। অফিসের পুরোনোরা একজন আরেকজনকে চেনে। তাদের জগত্টা থাকে চেনা। সেখানে এই অচেনা গ্রহে একজনের একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতাকে কেন্দ্র করে যেন এক ধরনের মজা করা হয়। যা আমার জড়তাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিত। সাহায্যের জন্য কেউ অনেক সময় এগিয়ে এলেও ভাবতে হয়েছে সেটিও এক ধরনের মজা বা বিপদে ফেলার চেষ্টা। নানা জায়গায় বদলি হয়ে ঠেকে ঠেকেই এ ধরনের ভাবনার উদয়। আমাদের এ ধরনের প্রবণতার পেছনের কারণ নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি তবে উত্তর পাইনি।
এটি শুধু নিপার অভিজ্ঞতা নয়। প্রতিটি চাকরিজীবীর জীবনের ঘটনা। আমারা যদি আমাদের জীবনকে বিশ্লেষণ করি, তবে লক্ষ্য করব যে ছোটবেলায় প্রথম স্কুলে ঢোকার পরেও আমাদের মধ্যে প্রায় সবাইকে একই রকম ব্যবহার সহ্য করতে হয়েছে। প্রথম নতুন কেউ এলে ক্লাসের কেউই তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে না। ইচ্ছা করে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে তাকে বিপদে ফেলা হয়, এমনকি ক্লাসের শিক্ষকদের সম্পর্কেও কোন ধারণা তাকে দেয়া হয় না। শিশুটির মনে সেই থেকেই নতুন জায়গার প্রতি একধরনের ভীতি সৃষ্টি হয়। ক্লাসের কেউ নতুন আসা অতিথিকে সাহায্য করতে গেলে অন্যরা মিলে তাকে নানাভাবে ভয় দেখায়, যেন সে তা না করতে পারে। এভাবে নতুন একজনকে অপদস্থ করার মাধ্যমে আনন্দ খুঁজে পায়। এ ধরনের আচরণ ছোটবেলাতেই আমাদের মধ্যে নতুন স্থানে, নতুনদের মাঝে জড়তা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।
ছোটবেলার এ মনোভাব যেন বড় হয়েও দূর হয় না। বুদ্ধি-বিচার অনুধাবনের ক্ষমতা বহুগুণে বাড়লেও সে সমস্যা থেকেই যায়। তাই এক শাখা থেকে অন্য শাখায় বদলি হলে বা নতুন কোন চাকরিতে যুক্ত হলে, একই ধরনের বিপদে পড়তে হয় একজন চাকরিজীবীকে। যা মনে করিয়ে দেয় আমাদের ছোটবেলার স্মৃতিকে। একজন মেয়ের জন্য নিজ শহরের বাইরে অন্য জেলায় বদলি হলে তার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। কেননা সামাজিকভাবে পরিবারের দেখাশোনা থেকে শুরু করে সব কাজ একজন নারীকেই করতে হয়। এ পরিস্থিতিতে নতুন অফিসারের প্রতি পুরোন কর্মীদের আচরণ যদি অসহযোগিতামূলক হয়, তখন তা তাকে মানসিকভাবে অনেক বেশি কাবু করে ফেলে। সব ধরনের চাকরির ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের হার পুরুষদের তুলনায় অনেক কম। তাই এক্ষেত্রে অফিসের পরিবেশে সবার সাথে মানিয়ে চলা তার জন্য কঠিন। আর যখন সহকর্মীরা সহযোগিতার বদলে প্রতিযোগিতার মনোভাব থেকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, নানাভাবে তার অসহায়ত্বকে উপভোগ করে তখন সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া একজন পুরুষের তুলনায় একজন নারীর জন্য বহুগুণে কঠিন হয়ে পড়ে।
সে সময়কার একজন নারীর মনের অভিজ্ঞতা জানতে কথা হচ্ছিল সাদিয়ার সাথে। তিনি বলেন, গত বিশ বছর ধরে আমি সরকারি অফিসার হিসেবে চাকরি করছি। আমার বদলির চাকরি। কখন কোন জেলায় বদলি হয় তার ঠিক নেই। সন্তানদের কথা ভেবে বহুবার চাকরি ছাড়তে গিয়েও শুধু মেয়ে দেখে ছেড়ে দেব, সে ভাবনা আমাকে আমার যুদ্ধ থেকে সরাতে পারেনি। এই বদলির জীবনে আমার সবচেয়ে ভীতিজনক পরিস্থিতি উপস্থিত হয় যখন সম্পূর্ণ নতুন এক জেলায় আমাকে বদলি করা হয়। এক অফিসে কিছু সময় পার করার পর, আমাকে নিয়ে আমার সহকর্মীদের অনেক রকম উক্তি সহ্য করতে হয়। যেমন, নারীদের তো মজা, তাদের বদলি কম করা হয়, তাদের অনেক সুবিধা- এসব নানা কথা। বহুজনের মাঝে আমি শুধু একা মেয়ে বলে নীরবে সহ্য করি। তারপর ছেলে, মেয়ে বিচার না করে যখন বদলি করা হয় অন্য জেলার অন্য শহরে যাই, নতুন জায়গায় একজন নারীকে একাকী পেয়ে তার অসহায়ত্বকে আরও অনেক বেশি উপভোগ করে। যেমন, সেখানকার সহকর্মীরা নানা জিনিস জানতে চাইলে, বুঝতে চাইলে তার সঠিক উত্তর কখনই পাই না।
সকলেই কেমন যেন গুরুগম্ভীর এক পরিবেশ গড়ে তোলে আমাকে ঘিরে। সবার মাঝে আমাকে একঘরে করার এক মানসিকতাও কাজ করে অনেক সময়। সবাইকে বুঝে পরিবেশকে যত বুঝতে চেষ্টা করি, তত সহকর্মীদের অসংগতিমূলক আচরণ পরিবেশকে আরও ঘোলাটে করে তুলে এবং তা হয় ইচ্ছাকৃত। অদ্ভুতভাবে নতুন কেউ যখন আমাদের শাখায় আসে, তার প্রতি আমাদের ব্যবহারও থাকে একই, কেননা আমরা সবাই সেটাকেই নিয়ম হিসেবে মেনে এসেছি। এ ধরনের আচরণকে খারাপ জেনে, সহযোগিতামূলক মনোভাবের প্রয়োজনীয়তা বুঝেও আমরা আমাদের আচরণকে পরিবর্তন করি না, করার আগ্রহও প্রকাশ করি না। প্রকৃতির নিয়ম হিসেবে সে ধারাই রক্ষা করে চলি।
যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা এ ধারার পরিবর্তন করা একান্ত প্রয়োজন। একজন নারী যখন প্রথম চাকরিক্ষেত্রে প্রবেশ করে, চাকরির পরিবেশ না বোঝায়, না জানায় তার অসহায়ত্ব হয় বহুগুণে বেশি। অফিসের পরিবেশ বুঝে উঠতে সাধারণ সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগে এধরনের আচরণের জন্য। অনেকসময় নানা বিপদে পড়তে হয়, সঠিক সময়ে সঠিক তথ্যের অভাবে কাজটি করতে না পারায়। তাদের এই দুর্বলতাকে উপভোগ না করে বরং নিজে যে বিপদে পড়েছে তার সহকর্মী যেন সে বিপদে না পড়ে সে লক্ষ্যে এগিয়ে আসতে হবে।
সহকর্মীর সাথে প্রতিযোগিতার কথা ভুলে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। নতুন আসা সহকর্মীকে কোণঠাসা করে রাখার প্রবণতাকে দূর করে বরং তাকে বন্ধু করে তুলতে হবে, যেন সহকর্মীর সাথে সে বন্ধুত্ব থাকে চাকরি জীবন সমাপ্তির পরেও। কেননা আমাদের জীবনের বড় অংশ জুড়ে থাকে চাকরিজীবন। চাকরি ক্ষেত্রে এখনও সংখ্যালঘু হিসেবে, নারীর জড়তা বহুগুণে বেশি কাজ করে। তাই তাদের এ জড়তাকে কাটিয়ে উঠতে, নতুন সহকর্মীদের বুঝতে, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেবার প্রক্রিয়াকে সহজ করতে সব সহকর্মীকেই এগিয়ে আসতে হবে।