কাশ্মীর সীমান্ত ফের উত্তপ্ত

মাঝে মাঝেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত। গত কয়েক মাসে সীমান্তে ভারত ও পাকিস্তানের সেনাদের চালানো হামলায় দুই দেশের কয়েকজন সেনার মৃত্যু হয়েছে। হত্যার জন্য একে অপরকে দোষারোপ করছে তারা। সর্বশেষ গত সপ্তাহে পাকিস্তানি সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর চালানো গুলিতে প্রকাশ চন্দর নামে এক ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। বিরোধপূর্ণ সীমান্তের লাইন অফ কন্ট্রোলের (এলওসি) উরি সেক্টরে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। উভয়পক্ষের দাবি বিনা উস্কানিতে সীমান্তে এসব গুলির ঘটনা ঘটছে। ভারতের দাবি প্রায় এক দশক আগে করা দুই দেশের যুদ্ধ বিরতি চুক্তির পর এ বছরের শুরু পর্যন্ত ২০০ বারের মতো এ চুক্তির লঙ্ঘন করে সীমান্তে গুলির ঘটনা ঘটেছে। ভারতের দাবি পাকিস্তানি সেনাদের বার বার গুলি চালানোর ঘটনায় অনেক আদিবাসী এখান থেকে পালিয়ে গেছে। গত ২২ আগস্ট ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুনচে এলাকার মোহাম্মদ দীনের ঠুনকো শান্তির সংসারটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। তিনি জানান, পাকিস্তান সীমান্ত থেকে ছোঁড়া শেলের আঘাতে স্ত্রী নুরজান গুরুতর আহত হয়েছেন। সে এখন চলাফেরাও করতে পারছে না। এ ঘটনার পর দুই ছেলে-মেয়ে ভয়ে স্কুলে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। তারা আমাকে বাড়ির বাইরে যেতে নিষেধ করছে। কিন্তু এসব ভয় উপেক্ষা করে মাঠে ফসলের জন্য আমাকে যেতেই হচ্ছে। শুধু দীন নন তার মতো অনেকেই এখন ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত সীমান্তে শেল নিক্ষেপের প্রায় ১০০টি ঘটনা ঘটেছে। পুনচের পুলিশ কর্মকর্তা শমসের হোসেন বলেন, যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘনের কারণে অনেকে আহত হয়েছে, অনেক সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে এক বা দুইবার শেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে। এর আগে ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধের সময় দুই পক্ষের মধ্যে গুলি ও শেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছিলো। জম্মু এবং কাশ্মীর হলো ভারতের একমাত্র মুসলিম অধ্যুষিত রাজ্য। কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ১৯৪৭-৪৮ ও ১৯৬৫ সালে দুই দেশের যুদ্ধের ঘটনা ঘটে। কারগিল সীমান্ত দিয়ে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে পাকিস্তান-মদদপুষ্ট সেনারা প্রবেশ করলে ১৯৯৯ সালে তৃতীয়বার যুদ্ধের ঘটনা ঘটে। ভারত শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে ১৯৮৯ সালে। তখন থেকে এখন পর্যন্ত ৫০ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে। এদের মধ্যে যেমন জঙ্গি রয়েছে তেমনি রয়েছে সেনা, পুলিশ ও সাধারণ মানুষ। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও ঘটছে অহরহ। কাশ্মীরে শান্তিবস্থা ফিরিয়ে আনতে দুই প্রতিবেশী পরমাণু শক্তিধর দেশের মধ্যে ২০০৩ সালে যুদ্ধ বিরতি চুক্তি হয়। তবে সব সময় যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি অটুট রয়েছে তা নয়। কেন হঠাত্ করে উত্তপ্ত হয়ে উঠলো এই দুটি দেশের সীমান্ত? অনেকের মতে, এটা হলো মনোযোগ দূরে সরানোর কৌশল। এর মাধ্যমে সেনা চেকপোস্টগুলোকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করা হয় যাতে করে জঙ্গিরা সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করতে পারে। গত কয়েক বছর শান্ত থাকার পর জঙ্গিরা আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। শ্রীনগরের চাতান সংবাদপত্রের প্রধান সম্পাদক তাহির মহিউদ্দিন বলেন, ১৯৯০-এর দশকের চেয়ে বর্তমান অবস্থা অনেক ভালো। তবে এসব আলামত দেখে মনে হচ্ছে জঙ্গিরা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে শিক্ষিত তরুণরা বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বিভিন্ন অংশে এখন তারা সক্রিয়। মূলত ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর থেকে কাশ্মীর বিভক্ত হয়। এখনো কাশ্মীর সংবাদপত্রের শিরোনাম হচ্ছে। দুই দেশের হাত থেকে কাশ্মীরিরা কবে নিস্তার পাবে প্রশ্ন এখনো কোটি কোটি মানুষের। গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনের সময় ভারত ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বৈঠক করেন। এ সময় তারা সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়ে একমত পোষণ করেন। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ বলেন, দুই দেশ আলোচনার মাধ্যমে সকল সমস্যার সমাধান করতে পারে। এমনকি কাশ্মীর সীমান্তের সমাধানও সম্ভব হতে পারে। এখন দেখার বিষয় সমস্যার সমাধান সংলাপের মাধ্যমে হয় নাকি দীর্ঘ যুদ্ধের যে চর্চা হয়ে আসছে তা জিইয়ে থাকে।