জাদুর কাঠি তরুণদের হাতেই

আমি জানি না, শব্দটা আমি কোথায় পেলাম। একেবারে ভেতর থেকেই বেরিয়ে এলো, এটা বাংলাদেশের বাংলাওয়াশ।’ আমাদের দায়িত্বই ছিল সুযোগ পেলে ম্যাচ জেতানো। আমি সেটা করতে পেরেই খুশি। এখন এরকম পারফরম্যান্স আমরা সিনিয়র, জুনিয়র; সবাই ধরে রাখতে চাই।’ ১৭ অক্টোবর ২০১০; ঢাকা। উত্তেজনায় ফুঁসছে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়াম। শেষ ওভারে নিউজিল্যান্ডের জয়ের জন্য চাই ৮ রান; বাংলাদেশের চাই ১ উইকেট। রুবেল হোসেনের প্রথম বলেই চার মেরে দিলেন কাইল মিলস! ৫ বলে চাই ৪ রান। পরের বলে রান নেই। পরের বল—লেগ স্ট্যাম্পের ওপর নিখুঁত ইয়র্কার; উড়ে গেল মিলসের স্ট্যাম্প। সমুদ্র গর্জন শুরু হয়ে গেল স্টেডিয়ামে। খেলোয়াড়রা মেতে উঠলেন বাঁধভাঙ্গা আনন্দে। টেলিভিশনে সবকিছু ছাপিয়ে আতাহার আলী খানের একটা চিত্কার শোনা যেতে থাকল—বাংলাওয়াশ, বাংলাওয়াশ! প্রায় চার বছর পর নিউজিল্যান্ডকে আরেকটি হোয়াইট ওয়াশের পর সেই ঘটনা মনে করিয়ে দিতেই আতাহার আলী খানের কণ্ঠে একইসঙ্গে গর্ব ও একটু লজ্জা যেন টের পাওয়া গেল। তার বলা শব্দটা এখন বিশ্বজুড়ে উচ্চারিত হয়। নিউজিল্যান্ডের আরেকটি হোয়াইট ওয়াশ কাণ্ডের পর যখন ‘নিউজিল্যান্ড হেরাল্ড’-এর মতো পত্রিকা বাংলাওয়াশ লেখে, তখন আতাহার আলী খান গর্ব করতেই পারেন। সাবেক এই জাতীয় দল তারকা, নির্বাচক ও বর্তমান ধারাভাষ্যকার আতাহার অবশ্য গর্ব না করে সেই গল্পটা মনে করিয়ে দিলেন, ‘ম্যাচ জিতে গেলে সবাই যখন উত্সব করছে, ড্যানি মরিসন সম্ভবত বললো, হোয়াইট ওয়াশ করলো বাংলাদেশ। আমি জানি না, শব্দটা আমি কোথায় পেলাম। একেবারে ভেতর থেকেই বেরিয়ে এলো, এটা বাংলাদেশের বাংলাওয়াশ।’ আজ সেই শব্দ যখন সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয়, সেই শব্দ দিয়ে যখন দেশ-বিদেশের সংবাদ মাধ্যমে সংবাদ লেখা হয়; তখন আতাহার আলী খান কথা বলতে গিয়ে তার ভেতরের ক্রীড়াবিদকেই বের করে আনেন, ‘শব্দটা চারদিকে শুনতে ভালো লাগে, দেশি-বিদেশি পত্রিকায় পড়তে ভালো লাগে। তবে এই শব্দের একমাত্র কৃতিত্বের দাবিদার আমাদের ক্রিকেটাররা। ওনারা এইরকম পারফরম্যান্স করতে পেরেছেন বলেই না আমরা এই শব্দ উচ্চারণ করতে পেরেছি। আমি এই সময়ে ক্রিকেটারদের আবারো অভিনন্দন জানাই এমন টানা জয় দেশকে উপহার দেয়ার জন্য।’ বাংলাওয়াশ বলুন আর হোয়াইট ওয়াশ; এই টানা জয়ের জন্য ক্রিকেটারদের অভিনন্দন জানাতে কেউ ভুল করছেন না। দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ পর্যন্ত মুগ্ধ হয়ে অভিনন্দন জানাচ্ছেন ক্রিকেটারদের। সেই সঙ্গে আপামর এই সব ক্রীড়াভক্তের একটা বিস্ময়—কিভাবে এমন করে টানা জিততে শিখে গেল বাংলাদেশ! শুধু নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টানা ৭ ম্যাচ জয়, ব্যাপারটা তো তা নয়। এই বাংলাদেশ নিজেদের সর্বশেষ ১৬ ম্যাচের দশটিতেই জিতেছে। তাও কাদের বিপক্ষে জয়? এই সময়ে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কাকে দুই বার, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও নিউজিল্যান্ডকে তিন বার করে এবং ভারতকে একবার হারিয়েছে। সত্যিই তো! কিভাবে এই টানা জিততে শিখে গেল বাংলাদেশ? বাংলাদেশ একটা দুটো করে ম্যাচ জিততে শুরু করা থেকে আরম্ভ করে আজকের এই টানা জয়ের মধ্যে চলে আসা; এই পুরোটা যাত্রায় নানা ভূমিকায় দলের সঙ্গী বা কাণ্ডারি হয়ে ছিলেন ও আছেন হাবিবুল বাশার। সাবেক সেই অধিনায়ক ও বর্তমান নির্বাচক সহজ করেই ব্যাখ্যা দিলেন এই বদলে যাওয়ার, ‘বাংলাদেশের এই দলটার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, এদের জয়ের ক্ষুধা, জেতার আকাঙ্ক্ষাটা অনেক তীব্র। এই শেষ ম্যাচটাই এর বড় উদাহরণ। সিরিজ জিতে যাওয়ার পর ডেড ম্যাচে অনেক বড় বড় দলও একটু রিল্যাক্স হয়ে যায়। কিন্তু দেখুন, আমাদের ছেলেরা এক মুহূর্তের জন্য ম্যাচটা না জিতলেও চলে এমন কোনো আচরণ করেনি।’ আর এই জয়ের ক্ষুধার পেছনে হাবিবুল বাশার বড় একটা ভূমিকা দেখছেন এক ঝাঁক তরুণ ও নতুন পারফরমারের। তরুণরা যে সিনিয়রদের অপেক্ষায় থাকছে না, আবার সিনিয়ররা তাদের দায়িত্ব পালন করছে; এই সমন্বয়েই আসলে রহস্যটা লুকানো বলে তার ধারণা। এই ব্যাপারটা আরেকটু ব্যাখ্যা করে বললেন আতাহার আলী খান, ‘দেখুন দুই বছর আগেও বাংলাদেশ ম্যাচ জিততো তামিম, সাকিব, মুশফিক বা রাজ্জাক পারফরম করলে। এখন কী হচ্ছে? তামিম-সাকিব না খেললেও বাংলাদেশ জিতছে, সিনিয়ররা কেউ না পারলেও নতুন ছেলেরা দায়িত্ব নিয়ে ম্যাচ বের করে আনছে। এটাই আসলে বদলে দিয়েছে বাংলাদেশকে।’ এই যে পরীক্ষিত পারফরমারদের বাইরেও এক ঝাঁক ‘উইনার’ পেয়ে যাওয়া; এটাকেই সবাই মূল রহস্য বলে চিহ্নিত করছেন। এখানেই উঠে আসছে নাসির হোসেন, সোহাগ হাজী, মুমিনুল হক বা একেবারে নতুন সামসুর রহমান শুভর নাম। এই তরুণরা কী বলছেন? অন্তত সোহাগ গাজী ব্যাপারটাকে মোটেও নিজেদের কৃতিত্ব হিসেবে দেখছেন না। তিনি বলছেন, এই সাফল্যযাত্রায় অবদান রাখতে, দলের একজন হিসেবে তার নামও রাখতে পেরে তিনি খুশি। আর এই যে দলকে জেতানোর জন্য যা যা করছেন, সেটাকে নিজেদের দায়িত্ব মনে করছেন সোহাগ, ‘এই সিরিজটার কথাই বলি। সাকিব ভাই অসুস্থ। শেষ ম্যাচে তামিম ভাইও অসুস্থ ছিলেন। এখন ওনারা তো সবসময় ম্যাচ জেতান। তো আমাদের দায়িত্বই ছিল সুযোগ পেলে ম্যাচ জেতানো। আমি সেটা করতে পেরেই খুশি। এখন এরকম পারফরম্যান্স আমরা সিনিয়র, জুনিয়র; সবাই ধরে রাখতে চাই।’ তাহলেই আমরা সত্যিকারের অপরাজেয় এক বাংলাদেশের সন্ধান পাবো।