যুক্তরাষ্ট্রে এতদিন তিনি ধর্মীয় নেতাই ছিলেন!
শহীদুল ইসলাম, যুক্তরাষ্ট্র
প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর ২০১৩, ২২:২২
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন ইসলামি সংগঠনের ব্যানারে বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষকে নিয়ে যুদ্ধবিরোধী সভা-সমাবেশে নিয়মিত অংশ নিতেন তিনি। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন মসজিদে ইমামতি। মসজিদ প্রতিষ্ঠার নামে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় নিয়েই কাটতো তার বেশিরভাগ সময়। এসব কারণে মার্কিন মুলুকে ধর্মীয় নেতা হিসাবেই পরিচিতি তার।
তবে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগ দায়েরের পর থেকেই নিজেকে অনেকটাই গুটিয়ে নিয়েছিলেন একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যার অন্যতম খলনায়ক ও আল-বদর বাহিনীর শীর্ষ নেতা আশরাফুজ্জামান খান। গত রবিবার ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের রায় ঘোষণা করে। একই অপরাধে বিদেশে পালিয়ে থাকা (যুক্তরাজ্য প্রবাসী) আরেক শীর্ষ আলবদর নেতা চৌধুরী মুঈনুদ্দিনকেও ফাঁসির আদেশ দেয় আদালত। রায় ঘোষণার পর নিজেকে আরও গুটিয়ে নেন আশরাফুজ্জামান।
গত কয়েকদিন ধরে আশরাফুজ্জামান খানকে নিয়ে নিউইয়র্ক প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে। জ্যামাইকার একটি মসজিদে অর্থ উত্তোলনের সময় মুসল্লিরা তাকে যুদ্ধাপরাধী চিহ্নিত করার পর থেকে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেন তিনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বাংলাদেশি দাবি করেন, গত শুক্রবার নিউইয়র্কের কুইন্সের জ্যামাইকায় একটি মসজিদে আশরাফুজ্জামান খান জুম্মার নামাজ আদায় করেন।
আশরাফুজ্জামান খান নিউইয়র্কের তথাকথিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ইসলামিক সার্কেল অব নর্থ আমেরিকার (ইকনা) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। দুই বছর তিনি এই সংগঠনের সভাপতিও ছিলেন। মুসলিম উম্মাহ অব নর্থ আমেরিকা (মুনা) নামে আরো একটি ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত। বিতর্ক ওঠার পর ইকনার পদ-পদবী ছেড়ে নেপথ্যে থেকে এসব সংগঠন পরিচালনা করছেন তিনি। আগে তিনি ইকনার মসজিদে ইমামতিও করতেন। জানা গেছে, আশরাফুজ্জামান খান নিউইয়র্কে ৪-৫টি স্থানে বসবাস করতেন। জ্যামাইকার হিলসাইড এভিনিউর ১৬৬ নং স্ট্রিট সংলগ্ন অভিজাত অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে ছোট বোনের নামে নেয়া একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন তিনি। দুই মাস আগে নতুন বাসার খোঁজে হিলসাইড অ্যাভিনিউর এক রিয়েলটর অফিসে (বাড়ি, ফ্ল্যাট ইত্যাদি বিক্রি বা ভাড়া দেয়ার প্রতিষ্ঠান) গিয়েছিলেন আশরাফুজ্জামান খান।
একাধিক সূত্র জানায়, আশরাফুজ্জামান খান যুক্তরাষ্ট্রে কাগজে-কলমে একজন পাকিস্তানী আমেরিকান। তিনি পাকিস্তানী পাসপোর্টেই মার্কিন ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন। মার্কিন বিচার বিভাগের তদন্তের মুখোমুখি হয়ে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন বরং নিজেকে অখণ্ড পাকিস্তান আন্দোলনের একজন কর্মী বলে দাবি করেন। যদিও নাগরিকত্ব গ্রহণের সময় এসব বিষয় কোথাও উল্লেখ করেননি তিনি। প্রায় তিন বছর আগে প্রবাসী বাংলাদেশিরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী রিপাবলিকান সিনেটর এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সিনেট কমিটির চেয়ারম্যান পিটার কিংয়ের সঙ্গে দেখা করে আশরাফুজ্জামান খানের ব্যাপারে অভিযোগ জানিয়েছিলেন। এ সময় পিটার কিং তাদের জানিয়েছিলেন, আশরাফুজ্জামান খান একজন ধর্মীয় নেতা। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব নয়।
তবে তার ওপর সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। কোনো ব্যক্তির তথ্য গোপনের অভিযোগ কোনোভাবে প্রমাণিত হলে মার্কিন নাগরিকত্ব বাতিল অথবা মোটা অংকের জরিমানার বিধান রয়েছে।
ফাঁসির দণ্ডাদেশের পর আশরাফুজ্জামান খানের মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়টি এখন জোরালোভাবে সামনে এসেছে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত মার্কিন এটর্নি মঈন চৌধুরী ইত্তেফাককে জানান, মার্কিন অভিবাসী আইনে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভিসা ও নাগরিকত্ব গ্রহণ দণ্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হয়। একাধিক সূত্র জানায়, আশরাফুজ্জামান খান মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তান চলে যান। সেখান থেকে মার্কিন ভিসা নেন এবং পরবর্তী সময়ে নাগরিকত্ব গ্রহণের সময় বুদ্বিজীবী হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা গোপন রাখেন। প্রায় দুই বছর আগে মার্কিন বিচার বিভাগ ’৭১-এ আলবদর বাহিনীর সঙ্গে আশরাফুজ্জামান খানের সম্পৃক্ততার বিষয়টি তদন্তের উদ্যোগ নেয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য আহ্বান করা হয় ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন চিফ এলি রোজেনবম তাদের দূতাবাসের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুর কাছে লিখিত একটি চিঠিতে এ বিষয়ে তদন্তে সহযোগিতার আহ্বান জানান। চিঠিতে এলি রোজেনবম লিখেছিলেন, আশরাফুজ্জামান খান যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ও পরবর্তী সময়ে সিটিজেনশিপ আবেদনের সময় ৭১-এ আলবদর বাহিনীর সঙ্গে তার যোগসূত্রের বিষয়টি গোপন রেখেছেন। বিভিন্ন মাধ্যমে আলবদর বাহিনী ও বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে আশরাফুজ্জামান খানের সম্পৃক্ততার বিষয়টি বেরিয়ে আসলে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ বিষয়টির তদন্ত করতে চায়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা চায় মার্কিন বিচার বিভাগ। এ ব্যাপারে আশরাফুজ্জামান খানের কাছ থেকেও কয়েক দফা বক্তব্য নিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা।
বাংলাদেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, এ ব্যাপারে মার্কিন বিচার বিভাগকে ওইসময় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেয়া হয়েছিল। মার্কিন বিচার বিভাগে বিষয়টির এখনো পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চলছে বলে জানা গেছে।
অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, সব অভিযোগ প্রমাণিত হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্দি বিনিময় চুক্তি না থাকায় আশরাফুজ্জামান খানকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তরের সুযোগ নেই। আর পাকিস্তানী পাসপোর্টে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে থাকলে এ বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনারও কিছু নেই।