মোটোর জন্য ভালবাসা

খুব ব্যস্ততার মাঝে মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। রিসিভ করতেই হাওমাও করে সজোরে কান্নার রোল। ভেসে এল, ‘আব্বু মোটো আর নেই, সে মারা গেছে ..........।’ ফোনটা পেয়ে বাবার দু‘চোখ অশ্রম্নসিক্ত হয়ে উঠল। বাসায় ফিরে মোটোকে আর দেখতে পাবেননা। দরজা খোলা মাত্র দৌড়ে এসে মোটো তার পায়ে আর অভিমানের ঠোঁকর দিবেনা। প্রতিদিন ভোরে মোটোর ডাকে আর ঘুম ভাঙবেনা। ‘মোটো’ যেন গোটা পরিবারকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে চির বিদায় নিল। বাবার কনিষ্ঠ পুত্র মোহাম্মদপুর সরকারি বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেনীর ছাত্র পোষা প্রাণী প্রেমিক শোকাহত মাহবুবুর রহমান শিশিরকে কোন ভাবেই তার কান্না থামিয়ে শান্ত করা যায়নি। বাবা যতবারই ফোনে খোঁজ নিয়েছেন ততবারই কেঁদে কেঁদে শিশির বলেছে, মোটো মরল কেন? আমি এখন কি করব? এসব বলেই ফোন রেখে দিয়েছে। শিশিরের বাবার সহকর্মীরা তাকে ফোনে নিবৃত করতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। তারা বিস্মিত হয়েছেন পোষা প্রাণীর প্রতি তার ভালবাসা দেখে। কিন্তু কে এই ‘মোটো’? কি তার ইতিহাস?? একটি পোষা মোরগের নাম ‘মোটো’। ‘শিশির’ পোষা প্রাণীর প্রতি বরাবারই খুব দুর্বল। টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে পোষা প্রাণী কেনা তার শখ। কয়েক মাস আগে স্কুল থেকে ফেরার পথে টিফিনের জমানো টাকা দিয়ে রাস্তা থেকে কিনে আনে ১টা মুরগীর বাচ্চা। নাম রাখে ‘মোটো’ । কয়েক দিনের মধ্যেই তরতর করে বেড়ে উঠে ‘মোটো’। বেড়ে উঠার সাথে সাথে পরিবারের সবার সংগেই মোটোর একটা ভাব জমে উঠে। সবাই প্রচন্ড ভালবাসে মোটোকে। মোটোও হয়ে উঠে সবার অত্যন্ত অনুগত ভক্ত। বিশেষ করে শিশির হয়ে উঠে মোটোর একান্ত প্রিয় বন্ধু। মোটো হয়ে যায় তার খেলার সাথী। লেখাপড়ার পাশাপাশি অবসর সময়টুকু সে মোটোকে নিয়েই কাটাত। প্রায় প্রতিদিনই শিশির স্কুল থেকে ফেরার সময় মোটোর জন্য নিয়ে আসত খাবার। ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই প্রতিদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় কেউ দরজায় নক করলেই মোটো হাজির হত দরজায় গিয়ে। ঘরে ঢুকেই মোটোকে কোলে নিয়ে আদর করত শিশির। একই ঘটনা ঘটে পরিবারের অন্যান্যদের বেলায়ও। পরিবারের কেউ দেরিতে বাসায় ফিরলে ভেতরে ঢুকামাত্র মোটো রাগকরে তার দু‘পা দিয়ে পা আটকিয়ে সজোরে দিত ঠোকর। রাগ নয় বাসায় ফিরতে দেরি হওয়ায় এটি ছিল তার অভিমানের বহিঃপ্রকাশ। মোটোর স্থান ছিল সবার কোলে কোলে। পড়ার সময় মোটো শিশিরের পাশে বসে থাকত। টেলিভিশন দেখার সময় সে বসে থাকত কোলে কিংবা পাশে । সে এতটাই বড় হয় যে উঠে তার ওজন হয়ে ছিল প্রায় পাঁচ কেজি। মোটো নামের শিশিরের এই পোষা মোরগটির কুককুরুক ডাকে প্রতিদিন ভোরে ঘুম ভাঙত পাড়া প্রতিবেশীর। মোটো ছিল শিশিরদের পরিবারের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিশিরের সেই আদরের মোটো হঠাত্ করে অকারণেই সবাইকে অকস্মাত্ ফাঁকি দিয়ে চলে গেল চিরতরে। তার এই চলে যাওয়াকে সহজেই মেনে নিতে পারেনি শিশির ও তার পরিবারবর্গ। মোটোর মৃত্যুতে শিশিরের গোটা পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। মোটোর শোকে শিশির ছেড়ে দেয় পানাহার । রাত দিন সে কান্না করে মোটোর জন্য। মোটোর বিয়োগ ব্যথা এবং স্মৃতিকে কিছুতেই সে মন থেকে মুছতে পারছেনা। গভীর রাতে সে একাকি কান্না করে মোটোর জন্য। মোটোর খাঁচা, খাবারের পাত্র সহ সমসত্ম স্মৃতি হয়ে আছে শিশির ও তার পরিবারের সকলের হূদয় মাঝে। একটি পোষা প্রাণীর মৃত্যু কোন ব্যক্তি বা পরিবারকে যে কতখানি শোকাহত করতে পারে সেটা কেবল মাত্র ভুক্তভোগীরাই অনুধাবন করতে পারে। পোষা প্রাণীর বিয়োগ বেদনা একটি পরিবারকে অবিশ্বাস্যভাবে তছনছ করে দিতে পারে। মোটোর বিয়োগ ব্যথা তেমনটি ব্যথিত করেছে শিশির ও তার পরিবারের সবাইকে । কারণ মোটোর জন্য তাদের অন্তরে আছে গভীর ভালবাসা।