রায়ের পর্যবেক্ষণ
প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০১৩, ২২:৪৩
ডাল-ভাতের মতো কর্মসূচিতে বিডিআরকে যুক্ত করা উচিত হয়নি
লিফলেটের অধিকাংশ দাবি অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন
কারণসমূহ----
দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নেতৃত্ব, ব্যবস্থাপনা ও গোয়েন্দা কার্যক্রমের দুর্বলতা
আর্মি ও আধা-সামরিক বাহিনীর মনোবল নষ্ট করা
সেনাবাহিনীতে যোগদান নিরুত্সাহিত করা
অর্থনৈতিকভাবে এ দেশকে দুর্বল করা
বহির্বিশ্বে আমাদের শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীকে উচ্ছৃঙ্খল দেখানো
সুপারিশ----
বিডিআর সদস্যদের জন্য আবাসন সুযোগ বৃদ্ধি
সন্তানের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন
প্রতিরক্ষা ভাতা ও ঝুঁকি ভাতা প্রদান
চাকরির সময়সীমা বৃদ্ধি
জাতিসংঘ মিশনে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি
প্রেষণে আসা সেনা কর্মকর্তাদের নতুন বাহিনীর সঙ্গে কাজ করার মানসিকতা তৈরি
পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যার বিচার শেষ হয়েছে। রায়ে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে ৫৭৫ জনকে দণ্ড দেয়া হয়েছে। আদালতের রায়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে জঘন্যতম এ হত্যাকাণ্ডের কিছু সম্ভাব্য কারণ উঠে এসেছে। একই সঙ্গে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে কিছু সুপারিশও করা হয়েছে। রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, অপারেশন ডাল-ভাতের মতো একটি কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করে বিডিআরের ঐতিহ্য নষ্ট করা হয়েছে। এ ধরনের কর্মসূচিতে সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীকে যুক্ত করা কখনোই উচিত না। এছাড়া দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নেতৃত্ব, ব্যবস্থাপনা ও গোয়েন্দা কার্যক্রমের দুর্বলতা, আর্মি ও আধাসামরিক বাহিনীর মনোবল ধ্বংস করা, সেনাবাহিনীতে যোগদান নিরুত্সাহিত করা এ হত্যাকাণ্ডের কারণ হতে পারে। অন্যদিকে, বিডিআর সদস্যদের জন্য আবাসন সুযোগ বৃদ্ধি, সন্তানদের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন, প্রতিরক্ষা ভাতা ও ঝুঁকি ভাতা প্রদান, চাকরির বয়সসীমা বৃদ্ধি, জাতিসংঘ মিশনে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি ও প্রেষণে আনা সেনা কর্মকর্তাদের নতুন বাহিনীর সঙ্গে কাজ করার মানসিকতা তৈরির উপর জোর দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
গতকাল পুরান ঢাকার বকশিবাজারের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ আদালতে রায়ের আদেশের আগে বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান পর্যবেক্ষণগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অত্যন্ত মর্মান্তিক এক ঘটনার পর এ মামলার সূত্রপাত হয়। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পিলখানায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এখানে শুধু হত্যা করা হয়নি, রিপোর্ট পড়ে আমার গা শিউরে উঠেছে। একটি মরদেহের যে আইনি অধিকার আছে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সে অধিকার রক্ষিত হয়নি।
রায়ে বলা হয়, এ বিদ্রোহের পেছনে সামরিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি উদ্দেশ্য থাকতে পারে। এর মাধ্যমে জাতির কাছে আর্মি ও আধাসামরিক বাহিনীর মনোবল নষ্ট, ধ্বংস করার চেষ্টা হতে পারে। কূটনৈতিক উদ্দেশ্যও রয়েছে। বিশেষ করে, বহির্বিশ্বে জাতি হিসেবে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা হিসেবে এ ঘটনা হতে পারে। অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য তো আছেই। এ ধরনের ঘটনার কারণে বিদেশি বিনিয়োগ হবে না। অস্থিরতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আমাদের দেশে আসতে চাইবে না। যারা এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে কলকাঠি নেড়েছেন, তারা হয়তো অর্থনৈতিকভাবে এ দেশকে দুর্বল করার চিন্তা করেছেন। রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্দেশ্য অবশ্যই রয়েছে। সামাজিক কারণের মধ্যে সেনা ও তাদের পরিবারকে হেয় করা ও সেনাবাহিনীতে যোগদান নিরুত্সাহিত করার বিষয়টি থাকতে পারে। এ কারণগুলো অবশ্যই বিবেচনা করা দরকার। এছাড়া বিডিআরে থাকা সেনা কর্মকর্তাদের প্রতি আনুগত্য ও শ্রদ্ধাবোধ না থাকাটাও একটি কারণ হতে পারে।
রায়ে বলা হয়, সেনা কর্মকর্তাদের দামি গাড়ি, বাড়ি ব্যবহার বিডিআর সদস্যদের বিদ্বেষের কারণ। বিদ্রোহের দিন বিতরণকৃত লিফলেটের ভাষাটাও এ ধরনের ছিলো। তবে একটি বিষয় সবার মনে রাখা দরকার, যার যে যোগ্যতা আছে সে সেই অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা পাবে এটাই স্বাভাবিক।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, অপারেশন ডাল-ভাতের মতো একটি কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করে ২১৮ বছর আগে গঠিত এই সুশৃঙ্খল বাহিনীর ঐতিহ্য নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এ কর্মসূচি বিডিআরের কর্মকাণ্ড ও সততার উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। আদালত মনে করে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের সুনির্দিষ্ট আর্থিক পদ্ধতি না থাকা এবং ব্যবসায়ীদের দিয়ে সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ না করে এ ধরনের কর্মসূচি ফলপ্রসূ হয়নি। তাই অপারেশন ডাল-ভাত হোক বা অন্য যেকোন নামেই হোক না কেন এ ধরনের কর্মসূচিতে সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীকে যুক্ত করা কখনোই উচিত না।
লিফলেটের ভাষ্য অনুযায়ী বিডিআর হত্যাকাণ্ডের একটি ক্ষোভের কারণ হচ্ছে, রাজধানীর ঝিগাতলার পিলখানায় অবস্থিত স্কুলে বিডিআর সদসদ্যের সন্তানদের ভর্তি করতে না পারা। পিলখানায় দুই বীরশ্রেষ্ঠের নামে দুটি স্বনামধন্য স্কুল ও কলেজ রয়েছে। যেখানে পিলখানায় কর্মরত বিডিআর সদস্যদের সন্তান ও ভর্তি পরীক্ষার মেধা অনুসারে বেসামরিক মানুুষের সন্তানদের এসব স্কুলে ভর্তি করা হয়। এক্ষেত্রে প্রত্যন্ত এলাকায় থাকা বিডিআর সদস্যের সন্তানদের পরীক্ষার মাধ্যমে বেশি করে ভর্তি করা যায় কিনা সে বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার। এছাড়া এ বাহিনীর সদস্যের সন্তানদের শিক্ষার ক্রমবর্ধমান চাহিদা অনুযায়ী আরো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা যায় কিনা সে বিষয়টিও বিবেচনার দরকার রয়েছে।
বিডিআর বিদ্রোহের পর পিলখানার আশেপাশের এলাকার মানুষ খাবার পানি ও গণমাধ্যমে সাক্ষাত্কার দিয়ে বিডিআরের প্রতি সমর্থন দেয়। এর কারণ হলো, কর্মরত বিডিআর সদস্যরা পিলখানায় আবাসন সুযোগ না পেয়ে আশেপাশের এলাকায় ভাড়া বাসায় সপরিবারে বসবাস করেন। তাই এসব এলাকার মানুষদেরকে বিডিআরের প্রতি সহমর্মী হয়ে সমর্থন দিতে দেখা গেছে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয় সেজন্য বাইরে বসবাসকারী সদস্যদের স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা উচিত। এজন্য অতিরিক্ত বাসা বাড়ি তৈরি করা যায় কিনা সে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভেবে দেখা উচিত।
এটি অনস্বীকার্য যে, কিছু লোকের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ, অপপ্রচার ও যড়যন্ত্রের কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। কিন্তু ষড়যন্ত্রের গভীরতা ও ব্যাপকতা নির্ণয়ে এসব বাহিনী পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নেতৃত্ব, ব্যবস্থাপনা ও গোয়েন্দা কার্যক্রমের দুর্বলতা ছিলো। তাই গোয়েন্দা কার্যক্রমকে গতিশীল ও কার্যকর করতে বাস্তবতার নিরিখে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন।
চাকরির ক্ষেত্রে সুনাম অর্জন করা কর্মকর্তাদের এ বাহিনীতে পদায়নের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। সত্ ও কর্মস্পৃহ কর্মকর্তাদের প্রেষণের মেয়াদকাল আরো বাড়ানো যেতে পারে। কার্যক্রমের পরিধি ও নিয়মের ক্ষেত্রে বিডিআর ও সেনা বাহিনীর মধ্যে কিছু ভিন্নতা রয়েছে। তাই সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের বিডিআরে প্রেষণে আনার ক্ষেত্রে সতর্কতা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন বাহিনীর সাথে কাজ করার জন্য মানসিকভাবে উপযোগী করে গড়ে তোলার উপর জোর দেয়া উচিত।
পর্যবেক্ষণে আরো বলা হয়, ঘটনার মূলহোতাসহ প্রায় এক প্লাটুন বিডিআর সদস্য পুলিশের সঙ্গে ২০০৬-৭ সালে জাতিসংঘ মিশনে কাজ করেছিলো। কিন্তু জাতিসংঘ মিশনে বিডিআর বাহিনীর যাওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো বাহিনীতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই যথাযথ কর্তৃপক্ষের উচিত জাতিসংঘের সঙ্গে যোগাযোগ করে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিডিআর সদস্যদের জাতিসংঘ মিশনে পাঠানোর ব্যবস্থা করা। বিডিআরের অল্প সংখ্যক সদস্য হলেও তাদেরকে সেনাবাহিনীতে প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দেয়া যায় কিনা সে বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন বিচারক।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আরো বলা হয়, ২১৮ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী ও গৌরব গাঁথা এ বাহিনী পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রেষণে আসা অনেক সেনা কর্মকর্তার সুনিপুণ নেতৃত্ব ও অক্লান্ত পরিশ্রম রয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে এ বাহিনীর অসংখ্য কৃতী সন্তান যুদ্ধ করেছেন। সেনাবাহিনীর পাশাপাশি তারা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। প্রতিবেশী দেশগুলোতে আধাসামরিক বাহিনী পরিচালনার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী দায়িত্ব পালন করে। যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর সঙ্গে এ বাহিনীর লড়াই করার দায়িত্ব থাকায় তাদেরও ২০ শতাংশ প্রতিরক্ষা ভাতা ও অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করায় তাদের ঝুঁকি ভাতা প্রদানের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিবেচনা করতে হবে। এছাড়া এই বাহিনীর চাকরির বয়সসীমা বৃদ্ধির বিষয়টিও পর্যালোচনা করা উচিত। সেনাবাহিনীর মতো এ বাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যদের চাকরির বয়সসীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
পর্যবেক্ষণে বলা হয়, লিফলেট তৈরি, হত্যার ষড়যন্ত্র, গোপন বৈঠক এগুলো কোনো সুশৃঙ্খল বাহিনীর কাজ হতে পারে না। কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক সংগঠনের মতো সুশৃঙ্খল বাহিনীর কার্যক্রম হতে পারে না। তাই লিফলেটে যেসব দাবির কথা বিডিআর উল্লেখ করেছিলো তার কিছু যৌক্তিক হলেও অনেকগুলো যৌক্তিক নয়।