বুদ্ধদেব বসুর ‘পুনর্মিলন’ নাটকে সার্ত্রের ছায়া

Adieu, adieu, Delony House dear, We leave you because the sea is near, And the sea will swallow you, we fear. Adieu, adieu. কবিতার লাইনগুলো কোনো বিদেশি কবির কবিতা নয়। বুদ্ধদেব বসুর লেখা জীবনের প্রথম কবিতা। এই কবিতার মাধ্যমেই মাত্র ন-দশ বছর বয়সে তিনি পরিবার থেকে প্রথম কবি-স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছিলেন। একজন প্রথম সারির বাঙালি কবি কেন তাঁর কবিতা লেখার শুরুটা ইংরেজি দিয়ে করলেন, এই প্রশ্নটা হয়তো অনেকের মনেই উদয় হতে পারে। সংশয়ের সৃষ্টি হতে পারে ভিন্ন একটি প্রশ্ন মাথায় নিয়ে বাংলা ভাষা কিংবা বাংলা সাহিত্যের বিষয়েও— বিশ্বের হাজারো ভাষা আর সাহিত্যের ভিড়ে কোথায় অবস্থান আমাদের? একসময় মাইকেল মধুসূদন দত্ত চেয়েছিলেন শেলি, কিটস, বায়রন বা জন মিলটনের মতো কবি হতে, তাই বাংলা বাদ দিয়ে কবিতা লিখতে শুরু করেছিলেন ইংরেজিতে; স্ব-ধর্ম আর স্বদেশ ত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন বিদেশে। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর আবার বাংলা ভাষাতেই প্রত্যাবর্তন ঘটে এবং আমরা লক্ষ করি, বাংলা কবিতা তাঁর হাত ধরে মোড় নেয় আন্তর্জাতিকতার দিকে। প্রথমবারের মতো বাংলা কবিতায় আবির্ভাব ঘটে ‘সনেটে’র। এই মধুসূদনের হাত ধরেই আমরা পাই বাংলা ভাষার প্রথম মহাকাব্য ‘মেঘনাদবধ কাব্য’। বুদ্ধদেব বসুর শুরুতেই ইংরেজি কবিতা লেখার পেছনের কারণ কী ওইরকম কোনোকিছু সৃষ্টি করা? নিশ্চয়ই না, কেননা ওই বয়সে ওইভাবে ভাবার মতো চিন্তাশক্তি হয়তো তাঁর ছিল না! তাঁর ইংরেজি কবিতা লেখার মূল কারণ সম্ভবত ওই সময়ে হেমচন্দ্র-নবীনচন্দ্র-মধুসূদনের পাশাপাশি ইংরেজি কবিতা সংকলন ‘ওয়ান থাউজেন্ড অ্যান্ড ওয়ান জেমস অব ইংলিশ পোয়েট্রি’ পাঠ। সত্যি বলতে কি, এরপর তিনি মূলত বাংলাতেই লিখেছেন। এমনকি মাত্র বারো-তেরো বছর বয়সে তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে থাকে বিভিন্ন পত্রিকায়। তখন তাঁর মনে প্রিয় কবির জায়গা করে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথের কবিতার দ্বারা তিনি অনেকখানি প্রভাবিতও হয়েছিলেন ওই সময়। ১৯২৪ সালে বের হওয়া বুদ্ধদেব বসুর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘মর্ম্মবাণী’র কবিতাগুলো পাঠ করলেই বিষয়টা টের পাওয়া যায়। ওই বইয়ের কোনো কোনো কবিতার শিরোনামও যেন সরাসরি রবীন্দ্রনাথ থেকেই নেয়া, যেমন—‘জীবন দেবতা’, ‘অরূপ’, ‘যাত্রী’, ‘শঙ্খ’ ইত্যাদি। কিন্তু প্রথম বই বের হওয়ার তিন-চার বছরের মধ্যেই চিন্তায় ও চেতনায় পরিবর্তন ঘটে যায় বুদ্ধদেব বসুর। উপলব্ধি করেন রবীন্দ্রবলয় থেকে বের হয়ে নতুন ধরনের কবিতা লেখার তাগিদ। খুঁজতে থাকেন নিজস্ব কণ্ঠস্বর। কেননা—ততদিনে তাঁর পাঠের তালিকায় রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমের পাশাপাশি যোগ হয়ে গেছে—ডিকেন্স, বার্নাড শ, শেলি, বায়রন, কিটস, ব্রাউনিং, চেকভ, তুর্গেনিভ, ইবসেন, গোর্কি, অস্কার ওয়াইল্ডসহ বিভিন্ন ক্লাসিক সাহিত্যিক এবং ওই সময়ের বিশ্বসাহিত্যের অনেকেরই নাম। দুই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরই পশ্চিমা বিশ্বে প্রবাহিত হতে থাকে পরিবর্তনের হাওয়া। জন্ম হয় রোমান্টিক ধারার বিপক্ষে আধুনিক সাহিত্যের। বুদ্ধদেব বসু ওই পরিবর্তনের হাওয়ায় আলোড়িত হন। ১৯২৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি প্রকাশ করতে শুরু করেন ‘প্রগতি’ পত্রিকা। সেখানে দেশি সাহিত্যের পাশাপাশি বিদেশি সাহিত্যের প্রকাশ ছিল লক্ষ করার মতো। ১৯৩১ সালে বুদ্ধদেবের সঙ্গে যোগাযোগ হয় কলকাতায় সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘পরিচয়’ গোষ্ঠীর। একে একে পরিচয় ঘটে জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী, প্রেমেন্দ্র মিত্র ও সমর সেনের সঙ্গে। ১৯৩৫ সালে তিনি প্রকাশ করেন ‘কবিতা’ পত্রিকা। ১৯১২ সালে শিকাগো শহরে কবি হ্যারিয়েট মনরো বের করেন কবিতা-বিষয়ক পত্রিকা ‘পোয়েট্রি’। সম্ভবত এই ‘পোয়েট্রি’র অনুপ্রেরণাতেই বুদ্ধদেব বসু প্রকাশ করেন তাঁর ‘কবিতা’ পত্রিকাটি। ‘কবিতা’র প্রথম সংখ্যার লেখক ছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, সমর সেন, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, জীবনানন্দ দাশ, অজিত কুমার দত্ত, প্রণব রায়, স্মৃতিশেখর উপাধ্যায়, হেমচন্দ্র বাগচী। পরবর্তীকালে এই ‘কবিতা’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয় এক দল তরুণ কবির আধুনিক কবিতার অগ্রযাত্রা। ১৯৩০ সালে বের হয় তাঁর প্রথম রবীন্দ্র প্রভাবমুক্ত কবিতার বই ‘বন্দীর বন্দনা’। যেখানে তিনি উচ্চারণ করেছিলেন—‘মোর আপনারে আমি নবজন্ম করিয়াছি দান’। এই নবজন্মের পর তিনি একে একে লিখে ফেলেন— ‘একটি কথা’, ‘পৃথিবীর পথে’, ‘কঙ্কাবতী ও অন্যান্য কবিতা’, ‘মরচে-পড়া পেরেকের গান’, ‘দময়ন্তী’সহ বহু কবিতার বই। শুরু থেকেই তিনি কবিতা ছাড়াও লিখতেন সাহিত্যের প্রায় সবগুলো শাখায়ই। বাংলা ভাষায় প্রথমবারের মতো অনুবাদ করেন—বোদলেয়ার ও রিলকের কবিতা। লিখেছেন ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ছোটদের সাহিত্য, ভ্রমণকাহিনী, কাব্যনাট্য ও নাটক। বুদ্ধদেব বসুর লেখা নাটকগুলো হচ্ছে—তপস্বী ও তরঙ্গিণী (১৯৬৬), তুমি কেমন আছো (গল্প ও নাটিকা ১৯৬৭), কলকাতার ইলেকট্রা ও সত্যসন্ধ (১৯৬৮), কালসন্ধ্যা (কাব্যনাট্য—১৯৬৯), পুনর্মিলন (১৯৭০), অনাম্নী অঙ্গনা ও প্রথম পার্থ (১৯৭০), সংক্রান্তি/প্রায়শ্চিত্ত : ইক্কাকু সেন্নিন (কাব্যনাট্য—১৯৭৩)। বুদ্ধদেব বসু মূলত সিরিয়াসলি নাটক লিখতে শুরু করেন বেশি বয়সে এসে। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রায় সব নাটকই লিখিত হয় শেষ আট বছরের মধ্যে। এগুলোর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য নাটক হচ্ছে—‘পুনর্মিলন’। তিন পুনর্মিলন নাটকটি প্রথম মুদ্রিত হয় ‘দেশ’ পত্রিকায় ১৯৬৯ সালে। পরে অনেক পরিশোধন ও নতুন অংশ যোগ করে এটি বই আকারে বের হয় ১৯৭০ সালে। এই নাটকে কোনো অঙ্ক বিভাগ করা হয়নি। নাটকটি শুরুই হয় কোনো এক শীতরাতের পুরোনো এক স্টিমার ঘাটের যাত্রীরুমে স্টিমারের অপেক্ষায় থাকা চারজন যাত্রীর বেঞ্চে শুয়ে বসে থাকার বর্ণনা দিয়ে। নাটকটিতে মোট চরিত্র রয়েছে ছয়টি। নাটকটির সংক্ষেপে গল্পটা হচ্ছে—নীলকণ্ঠদের বাড়িতে শৈশব থেকেই আশ্রিতা জয়া। জয়া—নীলকণ্ঠদের বাড়ির রাঁধুনি বামুন দিদির মেয়ে। বামুন দিদি মারা গেলে জয়াকে নীলকণ্ঠদের পরিবার মেয়ের মতো লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করে। কিন্তু এসব ঘটনার মধ্যেই নীলকণ্ঠ ও জয়া যৌবনে একে অপরের প্রেমে পড়ে যায়। কিন্তু এই প্রেমের ক্ষেত্রে সামাজিক বৈষম্যের কথা বিবেচনা করে সন্তানসম্ভবা জয়া একসময় পালিয়ে যায় ওই পরিবার থেকে। সে আশ্রয় নেয় তার মায়ের বৃদ্ধ বাবার কাছে। তার এক ছেলে সন্তান হয়, তাকে নিয়েই চলে জয়ার সংগ্রাম। একসময় সে অন্য এক শহরে চাকরি করতে যায়। সেখানে অফিসের বস হিসেবে দেখা পায় মদন পালের। ততদিনে তার ছেলেসন্তানটি কিছুটা বড় হয়ে গেছে। নাম শিবেন্দু, মাকে সে মা হিসেবে নয়; জানে মাসি হিসেবে। বাবার পরিচয় সে জানে না। সম্পূর্ণ ব্যাপারটাই শিবেন্দুর কাছে গোপন রাখে জয়া। এদিকে একদিন শিবেন্দু অসুস্থ হয়ে পড়লে, এই রোগ সারানোর জন্য টাকার প্রয়োজনে ভিন্ন এক সম্পর্কে জয়া জড়িয়ে পড়ে মদন পালের সঙ্গে। বিনিময়ে মদন পাল শিবেন্দুর পড়াশোনারও খরচ বহন করে। একসময় সদ্য যৌবনে পা দেওয়া শিবেন্দু যখন মদন পালের বাসায় যাতায়াত করে, সে দেখা পায় মদন পালের কাছ থেকে দাম্পত্যজীবনে অবহেলিত অরুণার। অরুনাকে সে ডাকে কাকি বলে। কিন্তু তারপরেও বয়সের অসমতা পেরিয়ে এক গোপন অবৈধ সম্পর্ক হয় অরুণা ও শিবেন্দুর। ঘটনা মোড় নেয় নাটকীয়তার দিকে। মদন পাল বিষয়টা জানতে পেরে কৌশলে হত্যা করে অরুণাকে। শিবেন্দুকে লেলিয়ে দেয় নেশার দিকে। অপরদিকে কোনো এক ট্রেন জার্নির সময় নাটকীয়ভাবে মুখোমুখি হয় নীলকণ্ঠ ও জয়া। ওই ট্রেনে ছিল মদন পাল ও শিবেন্দু। ওখানেই শিবেন্দু জেনে ফেলে নীলকণ্ঠ তার বাবা। কিন্তু জানলে কী হবে, তার সামনেই ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে মারা যায় নীলকণ্ঠ। নীলকণ্ঠের এই মৃত্যুকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারে না জয়া ও শিবেন্দু। বিষয়টা ভালো চোখে দেখে না মদন পাল। একসময় শিবেন্দু চলে যায় যুদ্ধে। ছেলের খবরের প্রতীক্ষায় থাকা জয়া যখন জানতে পারে যুদ্ধে মারা গেছে শিবেন্দু; সন্তানের শোকে তখন এক শিশি পিল খেয়ে আত্মহত্যা করে জয়া। অপরদিকে মদন পালের মৃত্যু হয় নিজ-গাড়ি চালানোর সময় রোড অ্যাক্সিডেন্টে। চার ‘পুনর্মিলন’ নাটকটির চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে গেলে দেখা যায়—এখানে প্রেম এসেছে অনেকটাই আদিম কামনা ও ভোগতৃষ্ণা হয়ে। এক্ষেত্রে নাটকটির বিষয় নির্বাচনে বুদ্ধদেব বসু বাংলা নাটকে তাঁর পূর্বসূরিদের পথ অনুসরণ না করে যেন তাকিয়েছেন বিশ্বসাহিত্যের দিকেই। তিনি যেন কবিতা বা উপন্যাসের মতো নাটকেও হয়ে ওঠেন কথাসাহিত্যিক ডি. এইচ. লরেন্স (১৮৮৫—১৯৩০) কিংবা অল্ডাস হাক্সলি (১৮৯৪—১৯৬৩)-র অনুসারী। আমরা দেখি, নীলকণ্ঠের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে গর্ভবতী হয় জয়া। কিন্তু নীলকণ্ঠের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে পালিয়ে যায়। অথচ পরে নীলকণ্ঠের সন্তানকেই রক্ষার জন্য জয়া জড়িয়ে পড়ে লম্পট মদন পালের সঙ্গে। এই সম্পর্ক দুটির প্রথমটিতে যোগ হয় অশরীরি প্রেম ও শরীরি প্রেম একসাথে। অপরদিকে দ্বিতীয়টি কেবল বেঁচে থাকার প্রয়োজন ও প্রেমহীন এক বাধ্যতামূলক প্রেমের সম্পর্ক। এছাড়া নাটকটিতে আমরা পাই অসম সম্পর্কের মধ্যেও লুকানো যৌন সম্পর্কের ইঙ্গিত। তেমনই একটি সম্পর্ক হচ্ছে মদন পালের স্ত্রী অরুণার সঙ্গে জয়ার সতের বছরের ছেলে শিবুর। যেমন— শিবু : (ভারী গলায়)। তোমার চুল খুব সুন্দর, অরু-কাকি। অরুণা : তা-ই নাকি? শিবু : তুমি জানো না? অরুণা : কী করে জানবো। নিজের পিঠ কি কেউ দেখতে পায়? শিবু : কেউ বলেনি তোমাকে? (অরুণার এক গোছা চুল নিয়ে অন্যমনস্কভাবে আঙুলে জড়াতে লাগলো।) অরুণা : (চিরুনি নামিয়ে রেখে) চুলে টান দিয়ো না। লাগে। শিবু : (চুল থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে)। তোমার চোখ খুব সুন্দর অরু-কাকি। অরুণা : তা-ই নাকি? শিবু : তুমি জানো না? অরুণা : কী করে জানবো? নিজের চোখ কি কেউ দেখতে পায়? শিবু (ঢোক গিলে)। তুমি খুব সুন্দর। [একটু চুপচাপ। শিবু সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে রইলো অরুণার দিকে, অরুণার চোখ বুজে গেলো, তার একটি হাত শিবুর কাঁধে এসে পড়লো। শিবু দুই হাতে কাছে টেনে আনলো অরুণাকে, দু-জনের ঠোঁট চুম্বনে মিলিত হলো।] ৫. নাটকটি পাঠ করলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, প্রত্যেকটি চরিত্রের মৃত্যুর পর মুখোমুখি হওয়াটাকে সামনে রেখেই নাটকটির নামকরণ করা হয়েছে ‘পুনর্মিলন’। এই যে মৃত্যুর পর একটি পুরোনো স্টিমারঘাটের ওয়েটিংরুমে সকলেই মুখোমুখি হয়, এই ঘটনাটা আমাদের মনে করিয়ে দেয় ফরাসি লেখক ও অস্তিত্ববাদী দার্শনিক জাঁ পল সার্ত্রের ১৯৪৪ সালে লেখা দ্বিতীয় নাটক ‘উই ক্লো’(Huis Clos )-এর কথা। এই নাটকটির ইংরেজি নাম হচ্ছে ‘No Exit’। ‘কপাট’ নামে ১৯৪৮ সালে এটি অনুবাদ করেন নরেশ গুহ। নাটকটিতে মোট চারটি চরিত্র রয়েছে, যাদের মধ্যে মৃত্যুর পরের জগতে পৃথিবীর তিনটি চরিত্র—গার্স্যা, ইনিয়েজ ও এস্তেল মুখোমুখি হয় একটি কক্ষে। ওই কক্ষটাই একসময় আবিস্কৃত হয় ‘নরক’ বলে। প্রচলিত অর্থে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের মাধ্যমে আমরা যে নরকের শাস্তির বর্ণনা পাই, এ নরকের সাথে তার কোনো মিল নেই। ওখানকার শাস্তির প্রক্রিয়া যেন বারবার নিজের কর্মকাণ্ডের মুখোমুখি হয়ে আত্ম-অনুশোচনার মধ্যে বসবাস। ওখানে তিনটি চরিত্র অনন্তকালের মধ্যে আটকে গিয়ে কখনোই মুক্তি পায় না, এমনকি তাদের কক্ষের দরজা খুলে গেলেও তার বেরোতে সাহস পায় না। প্রতীকি অর্থে আমরা বুদ্ধদেব বসুর স্টিমারের প্রতীক্ষায় থাকা কক্ষটিকে কিংবা সম্পূর্ণ স্টিমারঘাটটিকেও একধরনের নরক বলে আখ্যা দিতে পারি। এখানে সময়ের কোনো শেষ নেই। চরিত্রগুলো বারবার ঘুরপাক খায় নিজস্ব জীবন-যাপনের গোপন করে রাখা বিষয়ের স্বীকারোক্তি কিংবা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা জীবনের পুনরাবৃত্তিতে। এখান থেকে মুক্তি মিললেও তা কখন মিলবে কেউ বলতে পারে না। পুনর্মিলন নাটকে স্টিমারের প্রতীক্ষায় থাকা যাত্রীদের মধ্যে অরুণা ছাড়া কেউই হঠাত্ একটি স্টিমারের হুইসেল শুনেও সেটাতে উঠতে পারে না। একসময় তারা তীব্রভাবে অনুভব করে, তারা মারা গেছে। জয়া : তুমি কষ্ট পাচ্ছো, নিলু? মরে গেলে কি আর কষ্ট থাকে? নীলকণ্ঠ : আমি কী ক’রে বলবো? এমনও তো হ’তে পারে আমরা মরে গিয়েছি কিন্তু জানি না? এমনও তো হ’তে পারে আমরা মরে ছিলাম, কিন্তু জানতাম না? জয়া (নিচু গলায়) : নীলু, একটা কথা। তুমি নিশ্চয় বুঝেছো— তবু আমি মুখ ফুটে বলছি—ঐ যে লোকটা, মদন পাল—আমি তার কাছে—তার সঙ্গে— নীলকণ্ঠ (উদাস ভাবে) : তাতে কিছু এসে যায় না। জয়া ( হঠাত্ আবেগের সঙ্গে) : আমি তোমাকে প্রাণ ভ’রে ভালোবাসতে পারিনি, নীলু—এখন চাই—চাই তোমাকে ভালোবাসতে। নীলকণ্ঠ (হতাশার সুরে) : তাতেও কিছু এসে যায় না। জয়া (বড় নিঃশ্বাস নিয়ে) : এসে যায় না? (নীলকণ্ঠ কাচের মতো চোখে তাকিয়ে রইলো, জয়া তার কাঁধে ঝাঁকুনি দিলো।) নীলু, নীলু! কী ভাবছো তুমি? তোমার হয়েছে কী? নীলকণ্ঠ (যেন আপন মনে) : আরম্ভ—আবার আরম্ভ। তেতলার ঘর—তুমি আর আমি—আর নিচের ঘর—নিচের ঘরে—(যন্ত্রণার সুরে) ঝাঁপি আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমাকে আরম্ভ করতে বোলো না। মদন পাল : না, না, আরম্ভ না! কেউ যেন আরম্ভ না করে কখনো। আরম্ভ হ’লে আর শেষ হবে না। লক্ষের পরে কোটি, কোটির পরে অর্বুদ, অর্বুদের পরে শঙ্খ, শঙ্খের পরে পদ্ম—আরো, আরো, আরো! ওঃ, কী ভীষণ! ‘পুনর্মিলন’ নাটকে বুদ্ধদেব বসু জীবনের অর্থহীনতা, উদ্ভট হাস্যকর অসঙ্গতিসমূহ ও শূন্যতা, আদর্শবাদ এবং জীবনের নিষ্কলঙ্ক শুভ্রতার অবক্ষয়কে স্বচ্ছ ভাষায় ও ভঙ্গিতে, পারম্পর্য রক্ষা করে, সুন্দর যুক্তির মালা সাজিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর নাটকটির মধ্যে সমস্ত আঞ্চলিকতা এড়িয়ে যেন এক বিশ্বভাবনার রূপ দেখতে পাওয়া যায়। যা অনেকটাই যেন জিরাদু, আন্যুই, সালক্রু, সার্ত্রে বা কাম্যুর মতো নাট্যকারদের সাথে সম্পর্কিত!