ছোট্ট ফুল

দক্ষিণ বাংলায় আমার জন্ম, ওখানেই বেড়ে ওঠা। কর্পূরকাঠী—তেঁতুলিয়ার কূল থেকে একটু ভেতরে একটি গ্রামের নাম। ছায়াঢাকা মেঠোপথ এখন খুব একটা দেখা না গেলেও সবুজে ছাওয়া ইটের রাস্তা সহজে চোখে পড়ে। চারদিকে হালকা নীল রংয়ের জলে ভরা সদ্য কাটা লেক তার মধ্যে সবুজ রংয়ের ঘর। নাম রেখেছি ‘স্বপ্নচূড়া’। কাজের অগ্রগতি দেখতে প্রায়ই আমাকে সেখানে যেতে হয়। আমার যাওয়ার পথটা এরকমের—লঞ্চে বরিশাল, ছোট্ট দুটো নদী পেরোলেই মটরবাইকে ঘণ্টাদেড়েকের পথ। যেহেতু আমি একা, মোটরবাইকই আমার প্রধান বাহন। সবুজ ধানক্ষেত, সদ্য বর্ষার জমে যাওয়া জল যার মধ্যে শীর্ণ দোকানির জীর্ণ দোকান ঘর। কাঠের বেঞ্চে আমিও বসে যাই। সকালে গরম চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে দেখি নীরব গ্রামের জেগে ওঠা। রঙ্গলাল আর আমি একই স্কুলে পড়েছি। বয়সে ও আমার ছোট। রাস্তার পাশেই রঙ্গলালের চা-মিষ্টির দোকান। একদিন সেখানে মোটরবাইকটি থামিয়ে বসে যাই। রঙ্গকে চিনতে একটু সময় লাগে, পাকা চুল, দাড়িগোঁফও প্রায় সাদা হয়ে গেছে। ঝুলে যাওয়া চামড়ার মুখ, সে এখন চার সন্তানের জনক। প্রায় ত্রিশ বছর আগে পরিচিত মানুষটিকে দেখে রঙ্গ হলদে দাঁত বের করে হাসে। দাদা! ভালো আছেন? আমার পরিচয় জেনে তার বউটি ঘোমটা টেনে প্রণাম করে। হাতে জল আর মিষ্টি। শাঁখা আর সিঁদুরে তাকে বেশি বয়েসি মনে হয় না। গ্রামে ঢোকার পথে রঙ্গর দোকানে বসে চা খাই, আশপাশের দু-একজন চলে আসে চায়ের কাপ হাতে। কিছুটা সময় তাদের সাথে কাটাই। একটু খোঁজ-খবর নিই। একদিন হঠাত্ চোখ পড়ে, রঙ্গর ঘরের পেছনের দিকে জানালায়। ফরসা একটা পাঁচ-ছয় বছরের মেয়ে এক দৃষ্টিতে আমাকে দেখছে। চায়ের কাপ হাতেই মেয়েটির কাছে গেলাম। জানলাম, ওর নাম রুপা। রুপাকে ডাকলাম, সে হাসল। রুপার এলোমেলো চুলে হাত দিয়ে আদর করলাম। ‘আমার সাথে আমার ‘স্বপ্নচূড়া’য় যাবে তুমি?’ রুপার হাসি থেমে যায়। পরে জানলাম, জন্মের পর পোলিওতে রুপার পা দুটো অকেজো হয়ে গেছে, রুপা হাঁটতে পারে না, শ্রাবণের মেঘের মতো মন নিয়ে রুপার হাতে একটা পাঁচশ টাকার নোট দিয়ে মোটরবাইকে উঠলাম। এরপর কয়েকবার এ পথে আমি মোটরবাইকে যাতায়াত করেছি, ব্যস্ততার কারণে রঙ্গলালের দোকানে আমার থামা হয়নি। মাস তিনেক পরে লোক পাঠিয়ে রুপার খবর নেয়ার চেষ্টা করি। খবর পেলাম সে অসুস্থ। সন্ধ্যার পর ‘স্বপ্নচূড়া’র কাজ শেষ করে রুপাদের বাড়িতে উপস্থিত হই। রুপার কাছে যাই, মাথায় হাত রাখি। বেশ জ্বর। রুপা আমাকে দেখছে মায়াবী চোখে। ওর হাতে লাল একটা ক্যান্ডির প্যাকেট দিলাম। সে নিল। আমি রঙ্গকে ডাকলাম। ওর অসুখের খবর জিজ্ঞেস করতেই বলল—‘দাদা, পাঁচ-ছয় দিন ধইরা জ্বর। ডাক্তার দেখাইছি, জ্বর ভালো অয়নাই।’ রঙ্গর বউ আসে। নমস্কার জানিয়ে বলে, ‘ও আপনাকে দেখার পর মোটরসাইকেলে যে কয়বার এখান দিয়ে গেছেন তা কইতে পারবে। রুপা আমাকে বলে, ‘দ্যাখ মা, সাহেবের গাড়ি’।’ আমি ওর মাথায় হাত রেখে বললাম—‘বল তো রুপা, আমি ক-বার এখান থেকে গেছি? রুপা দুহাত তুলে দেখায় তাতে দশবার মনে হলো। রুপার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলি, ‘আর কখনো তোমাকে না দেখে আমি আমার বাড়িতে যাব না।’ রঙ্গকে জেলা শহরে পাঠিয়ে রুপার চিকিত্সার ব্যবস্থা করলাম। রুপাকে নিজ হাতে ওর পছন্দের কিছু জিনিস কিনে দিলাম। সে এখন সুস্থ। এখন স্বপ্নচূড়ায় যাওয়ার আগেই মোটরবাইকটা থামিয়ে রুপার খবর নিই। ছবি আঁকার নানা রংয়ের কিছু পেনসিল কিনে দিয়েছি। রুপা আঁকার চেষ্টা করে। আরেকদিন বাইক থামিয়ে দেখি লাল ফিতেয় বিনুনি করা রুপাকে। রুপার চিক চিক করা চোখের জল। ঘোমটা টানা কুসুম রানি বলে—‘দাদা, আপনি আমার মেয়ের জন্যে অনেক করেছেন ও আপনার সময় নষ্ট করে শুধু।’ আমি তাকে থামাই। আমার স্বপ্নচূড়ায় পুকুরের মাঝে একটি ঘর আছে, আমার বসার জন্য। বাঁশ আর কাঠের রেলিংঘেরা ব্রিজ পেরিয়ে সেখানে যেতে হয়। এখন মাঝরাত, দূরের বাঁশবনের ওপর পূর্ণিমার চাঁদ। লেকের জলেও সে চাঁদের জলছবি। আর আমার ভাবনায় রুপার মায়াভরা মুখ। পৃথিবীখ্যাত নায়ক পল নিউম্যান ক্যানসার আক্রান্ত শিশুদের জন্য বানিয়েছিলেন—অউন ওয়ার্ল্ড। সপ্তাহে একদিন তিনি খাবার খেতেন তার অউন ওয়ার্ল্ডের শিশুদের সাথে। অনেক আগে ‘লিটল ফ্লাওয়ার’ নামে একটি চীনা মুভি দেখেছিলাম। রুপার মতো একটি মেয়ে পিপলস আর্মির প্যারেড দেখত প্রায় প্রতিদিন। যা চীনা বিপ্লবের সাথী এক সৈনিকের নজরে আসে। মেয়েটির কাছে গিয়ে সৈনিকটি জানতে পারে মেয়েটি বিপ্লব ভালোবাসে, সৈনিক হতে চায় কিন্তু সে তো হাঁটতে পারে না। রুপা হয়তো জানালার পাশে বসে আমার যাওয়া-আসা দেখে আর আশায় বুক বাঁধে, এই বুঝি সাহেব আসছে লাল ক্যান্ডির বক্স হাতে। স্বপ্ন দেখি রুপাদের নিয়ে আমিও স্বপ্নচূড়ায়। ওদের হাসি-কান্নায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে ওদের মাঝে নিজের বেঁচে থাকাটা সার্থক করব, চোখটা আর্দ্র হয়ে যায় এমন ভাবতে ভাবতে। এক ইহুদি কবির ইসরাইল নিয়ে লেখা একটা কবিতার কথা মনে পড়ে যায়। কেন যেন আমার জীবনের কিছু মিলও খুঁজে পাই সে কবিতাটিতে। যার কয়েকটা লাইন ছিল—‘Where ever I go there are/ always three/ You, I and next war...’