রণদা প্রসাদ সাহা স্মারক গ্রন্থ

রণদা প্রসাদ স্মারক গ্রন্থ সম্পাদনা পরিষদ আনিসুজ্জামান, প্রতিভা মুত্সুদ্দি করুণাময় গোস্বামী দ্বিজেন শর্মা, মফিদুল হক, হেনা সুলতানা প্রকাশক :সাহিত্য প্রকাশ, মূল্য :১৫০০ টাকা রণদা প্রসাদ সাহা, সংক্ষেপে আরপি সাহা—শিক্ষিত বাঙালি সমাজে একটি সুপরিচিত নাম। সংগ্রামমুখর জীবন তাঁর। মাত্র ১৬ বছর বয়সে মাতৃহীন হয়ে পৈতৃক নিবাস টাঙ্গাইল ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমাতে হয়েছিল কলকাতায়। কী করতে হয়নি সেখানে তাঁকে? মিন্তির কাজ, খবরের কাগজের হকার কোনোকিছুই বাদ যায়নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছিল তখন। ভাগ্যান্বেষী যুবক রণদা প্রসাদ চাকরি নিলেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে। বেঙ্গল অ্যাম্বুলেন্স কোরের সদস্য হয়ে গেলেন ইরাকে। সেখানে একটি সামরিক হাসপাতালে আগুন লাগলে রণদা অসীম সাহসিকতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন উদ্ধার অভিযানে। ১৯১৭ সালে তিনি মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফিরে এসে বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেন। এখানে তাঁর সঙ্গে হূদ্যতা গড়ে ওঠে কবি কাজী নজরুল ইসলামের। জীবনের এমনই সব পথ চলার এক পর্যায়ে রণদা ব্যবসা শুরু করেন। অর্জন করেন বিপুল বৈভব। কিন্তু সব ধনাঢ্য ব্যক্তি যা করেন সেই প্রচলিত পথের বাইরে গিয়ে তিনি শুরু করলেন অন্যরকম জীবন। তাঁর সমস্ত বিত্ত ব্যয় করতে শুরু করলেন জনস্বার্থে। ১৯৪৩ সালে সমগ্র ভারতবর্ষে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে তিনি দেশের বিভিন্ন অংশে ২৭৫টি লঙ্গরখানা খুলে ক্ষুধার্ত মানুষকে আহার জোগান ৮ মাস পর্যন্ত। একই বছর টাঙ্গাইলে মায়ের নামে প্রতিষ্ঠা করেন কুমুদিনী কলেজ। ১৯৪৪ সালে মায়ের নামে প্রতিষ্ঠা করেন কুমুদিনী হাসপাতাল। ১৯৪৫ সালে যাত্রা শুরু করে ভারতেশ্বরী হোমস। ১৯৪৭ সালে জীবনের সকল সম্পদ দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন কুমুদিনী ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্ট। ১৯৭১ সালে এই মানুষটিকে তাঁর একমাত্র পুত্র ভবানী প্রসাদ সাহাসহ ধরে নিয়ে যায় দখলদার পাকিস্তানি সেনারা। আরপি সাহা এবং তাঁর পুত্র আর ফিরে আসেননি। এমন একজন মানুষকে খুন করতে পারে, তারা জন্তুরও অধম। আরপি সাহা তাঁর সকল সম্পদ দিয়ে এদেশের মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন, নারীসমাজকে সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। এখন থেকে প্রায় পৌনে এক শতাব্দী আগে এমন চিন্তা করার মানুষ কজন ছিলেন এই পৃথিবীতে? আগ্রহ ছিল সংস্কৃতি চর্চায়, নিজে নাটকে অভিনয় পর্যন্ত করতেন। যাপন করতেন একেবারেই সাধারণ জীবন। আরপি সাহা আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে গেছেন ৪২ বছর আগে। বহু পরে তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত হলো স্মারক গ্রন্থ। অনেক বিলম্বে হলেও বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির লেখায় সমৃদ্ধ এটি একটি অমূল্য গ্রন্থ। প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ, ড. আনিসুজ্জামান, বদরুদ্দিন উমর, দিজেন শর্মা, আবদুল গাফফার চৌধুরীসহ বহু গুণীমানুষ এই গ্রন্থে আরপি সাহার স্মৃতিচারণ ও গুণকীর্তন করেছেন। সাহিত্য প্রকাশ প্রকাশিত গ্রন্থটির সম্পাদনা পরিষদে ছিলেন ড. আনিসুজ্জামান, প্রতিভা মুত্সুদ্দী, করুনাময় গোস্বামী, দিজেন শর্মা, মফিদুল হক ও হেনা সুলতানা। ৩৪৭ পৃষ্ঠার গ্রন্থটি কেবল সুলিখিত নয়, এটি সুমুদ্রিত। বাঁধাইও ভালো।