শহীদে কারবালা ঈমাম হোসাইন (রা.)

৬১ হিজরির ১০ মহররম মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর কলিজার টুকরা, খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতেমা (রা.) ও হযরত আলী (রা.)-এর পুত্র হযরত হুসাইন (রা.) তাঁর পরিবারবর্গ, সঙ্গী-সাথীসহ কারবালা প্রান্তরে অত্যন্ত নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন। তাঁদের লোমহর্ষক শাহাদাতের ঘটনার কারণে ১০ মহররম মুসলমানদের হূদয়ে শোকাবহ হয়ে আছে। আশুরা মূলত ফেরাউন সদলবলে নীলনদে ডুবে মরার এবং ফেরাউনের কবল থেকে মুসা (আ.)-এর নাজাতের শুকরিয়া হিসাবে ইসলামে বিশেষ ভাবে মর্যাদাকর দিবস হিসাবে পালিত হয়ে থাকে। এজন্য ১০ মহররম এবং তার আগে বা পরে ১দিন মোট দু’দিন দু’টি সিয়াম রাখাও ইসলামের আদর্শ। রাসূলুল্লাহ (স.) আশুরার সিয়াম পালন করেছেন ও উম্মতগণকে পালনের আদেশ দিয়েছেন। এটিই মূলত ১০ মহররম আশুরার ইবাদতের শরয়ী বিধান। পরবর্তী ৬১ হিজরীতে কারবালা প্রান্তরের লোমহর্ষক ঘটনা ১০ মুহাররমকে মুসলিম বিশ্বের কাছে হূদয়বিদারক ঘটনার জন্য স্মরণীয় করে তুলেছে। হযরত হুসাইন (রা.) হযরত আলী (রা.)-এর ২য় পুত্র। হিজরী ৪ কিম্বা ৫ সালে তিনি মদীনায় জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হযরত হাসান (রা.)। পিতা হযরত আলীর (রা.) মৃত্যুর পর তিনি জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সঙ্গে মদীনায় নির্জন জীবন-যাপন করেন। মুআবিয়ার রাজত্বকালে হাসানের (রা.) মৃত্যুর পর হযরত আলীর (রা.) অনুগতদের নেতৃত্বপদ গ্রহণের জন্য ইরাকী সমর্থকদের অনুরোধ গ্রাহ্য না করে তিনি উমাইয়াদের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ মনোভাব পোষণ করেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হাসানের (রা.) অপেক্ষা অধিকতর হূদ্যতাপূর্ণ ও সম্মানজনক আচরণ প্রদর্শণ করে ইসলামের মহান আদর্শ বুকে ধারণ করেন। ইয়াজীদ সিংহাসন আরোহন করলে এবং ইরাকী সমর্থকরা পুনরায় নেতৃত্বপদ গ্রহণের আবেদন জানালে তিনি আবেদনে সাড়া দিয়ে তদীয় জ্ঞাতী ভ্রাতা মুসলিম ইবনে আকীলের সাহায্যে পরিস্থিতি যাচাই করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। মুসলিম ইবনে আকীল ইরাকে গমন করলে হাজার হাজার মুসলিম তাঁর সামনে উপস্থিত হয়ে হুসাইনের (রা.) প্রতি আনুগত্য প্রকাশের শপথ গ্রহণ করে। মুসলিম ইবনে আকীল সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে হযরত হুসাইনকে একটি পত্র প্রেরণ করেন। পত্রে তাঁকে (হুসাইন) ইরাকে গমনপূর্বক আন্দোলনের ভার গ্রহণ করার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। পত্র-প্রাপ্তির পর হযরত হুসাইন (রা.) মক্কা থেকে কুফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন এবং পথিমধ্যে ইরাকের নবনিযুক্ত শাসনকর্তা উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ কর্তৃক তাঁর দূত মুসলিম ইবনে আকীলকে বন্দী করে হত্যা করা হয়েছে বলে সংবাদ পান। শাসনকর্তা উবায়দুল্লাহ হিজায থেকে ইরাক পর্যন্ত সড়কে ফাঁড়ি ও অশ্বারোহী সেনাবাহিনী প্রহরা ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। হুসাইন (রা.) তাদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হন কিন্তু মাঝপথে যাত্রা বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানালে উবায়দুল্লাহ’র বাহিনী তাঁদের সাথে অগ্রসর হতে থাকে। একপর্যায়ে তাঁরা কারবালা প্রান্তরে পৌঁছলে উবয়দুল্লাহ বাহিনী দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েন। উমাইয়া শাসনকর্তা আত্মসমর্পনে বাধ্য করতে ফুরাত নদীর পানি পাওয়ার পথ বন্ধ করে দিলেন। পানি তৃষ্ণায় হুসাইন (রা.)-এর সঙ্গী-সাথীদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠলো। সেনাপতি উমার ইবনে সাদ এর পক্ষ থেকে হুসাইনকে আত্মসমর্পণ করার আহবান জানানো হলো। হুসাইন (রা.) রাজী না হওয়ায় যুদ্ধ শুরু হলো। তাঁর পক্ষীয় লোকজন আত্মরক্ষা করতে চেষ্টা করলেন কিন্তু পারলেন না, হুসাইন (রা.) গুরুতর আহত হলেন এবং তাঁর মস্তক ছেদন করা হলো। নির্মম ও লোমহর্ষক এই হত্যাযজ্ঞ বিশ্ব ইতিহাসে একটি জঘন্যতম অধ্যায়ের স্বাক্ষী হয়ে আছে।