নির্বাচনকে সামনে রেখে দল গোছাচ্ছে দক্ষিণের সর্বহারা
প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০১৩, ২২:৪৭
আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ‘দল’ গোছাতে শুরু করেছে নিষিদ্ধঘোষিত দক্ষিণাঞ্চলের সর্বহারা পার্টির সদস্যরা। সর্বহারাদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত গৌরনদী-আগৈলঝাড়া, বাবুগঞ্জ-উজিরপুর, বানারীপাড়া ও নগরীর কাউনিয়া থানার একাংশে তাদের অবাধ বিচরণ চোখে পড়ছে। নগরী ও এর সীমান্তবর্তী এলাকায় এসব নিষিদ্ধ সংগঠনের জোর তত্পরতা চলছে।
র্যাবের ভয়ে পলাতক সর্বহারা নেতারা পুনরায় এলাকায় ফিরে সংগঠিত করছে অনুগতদের। অনেকে রাজনৈতিক পরিচয়ে পুলিশের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েই নির্বাচনকে টার্গেট করে তত্পর হয়ে উঠেছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে এলাকার সন্ত্রাসীদের দলে ভিড়িয়ে একাধিক গ্রুপ তৈরি করে পেশী শক্তি বৃদ্ধির খেলায় মরিয়া হয়ে উঠেছে। ইতিমধ্যে এসব গ্রুপ ‘উদীয়মান সন্ত্রাসী’দের নিয়ে গোপনে কয়েকটি বৈঠক করেছে বলে জানা গেছে। রাজনৈতিক লেবাসে গত রমজান মাসে কয়েকজন শীর্ষ সর্বহারা নেতা ইফতার পার্টি ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মাঠে নামে।
আগৈলঝাড়া-কোটালীপাড়ার সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় বসে পার্টিকে ঢেলে সাজানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে ‘জিয়া গ্রুপের’ একসময়ের আঞ্চলিক কমান্ডার সুভাষের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, জল্লা ইউনিয়নে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও জিয়া গ্রুপের আঞ্চলিক প্রধান অবনি বাড়ৈর দলবলও ‘সুভাষবাহিনী’তে যোগ দিয়েছে। কারাবন্দী যারা ছিলেন তারাও সিংহভাগ মুক্ত হওয়ার কারণে নতুন আতংক দেখা দিয়েছে এলাকাতে।
বাবুগঞ্জের আগরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কামরুল হাসান হিমু, সাবেক চেয়ারম্যান সরদার খালিদ হোসেন স্বপন ও মাইনুদ্দিন সিকদার দীর্ঘদিন কারাভোগ করার পর মুক্ত হয়ে এখন এলাকায়। সর্বহারা নেতা নান্না-পান্না দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর নান্না ঢাকায় সাদা পোশাকের লোকজনের হাতে আটকের পর নিজ বাড়ির সামনে লাশ পাওয়া যায়। পান্নারও হদিস মিলছে না। পেশী শক্তির কারণে সর্বহারা নেতাদের রাজনৈতিক দলে বেশ কদর। ইতিমধ্যে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ পেয়েছেন সর্দার খালিদ হোসেন স্বপন। তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী কামরুল হাসান হিমু গত ইউপি নির্বাচনের পূর্বে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বিএনপি’র সমর্থন নিয়ে নির্বাচন করে জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। সর্বহারা নেতা পরিচয়ে হিমু ও স্বপনের এখন আপত্তি রয়েছে। তারা রাজনৈতিক পরিচয় ও জনপ্রতিনিধির বাইরে ঐ পরিচয় বহন করতে চান না। গৌরনদীর আসলাম সিকদার দীর্ঘদিন জেল খেটে বের হওয়ার পর এখন সে দলীয় লোকজন নিয়ে বাবুগঞ্জ হয়ে নগরীর কাউনিয়া থানাধীন সাপানিয়া, চরবাড়িয়া, নাপিতেরহাট এলাকায় ডাকাতিসহ অপকর্ম করছেন বলে অভিযোগ। সমপ্রতি ডাকাতির মালামালের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে দলীয় লোকজনের গুলিতে আহত হন। রাজনৈতিক পরিচয়ে গৌরনদী থানায় যে মামলা করেছেন তাতে প্রতিপক্ষ সর্বহারা গ্রুপের নেতাদের আসামি করার পাশাপাশি ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ ও ‘চ্যানেল-২৪’-এর বরিশাল প্রতিনিধি রাহাত খানকে আসামি করা হয়। আসলাম সিকদারের রাজনৈতিক পরিচয় হচ্ছে গৌরনদী উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম সম্পাদক। এ অঞ্চলে পুলিশের বিরুদ্ধে সর্বহারা পার্টির সদস্যদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। পুলিশ সুপার এহসান উল্লাহ অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, জেলায় মোট ৬৩ জন সর্বহারা সদস্যের তালিকা রয়েছে। এরা যাতে পুনরায় সংগঠিত হতে না পারে সেদিকে নজর রয়েছে তাদের।
পুলিশ বা সরকারি কোন দপ্তরে সর্বহারা সদস্যদের হাতে কত লোকের প্রাণহানি ঘটেছে তার কোন হিসাব না থাকলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, ১৯৮০ সাল থেকে বাবুগঞ্জ, উজিরপুর, গৌরনদী ও বানারীপাড়ায় দুই শতাধিক লোক সর্বহারাদের হাতে প্রাণ হারিয়েছে। আরো তিন শতাধিক লোক চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছে। সর্বহারাদের হাতে প্রাণ হারানোর পর বিচার পাওয়ার নজির নেই। জল্লার ইউপি চেয়ারম্যান অবনি বাড়ৈকে হত্যার পর তার স্ত্রী উর্মিলা বাড়ৈ ঐ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। স্বামীর হত্যাকারীদের বিচার পাননি তিনি। আগৈলঝাড়ার রত্নপুর ইউনিয়নের গনি চেয়ারম্যান ও মেম্বর হারুন বেপারী, উজিরপুরের ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা বাবুলাল শীল, বামরাইলের ইউপি মেম্বর ফারুক মৃধা, শরিকলের মালেক মৃধা, বাবুগঞ্জের আলমীর সিকদার, মোখলেস হাওলাদার, খোকন মাস্টার, আনাম কিংবা ইউনুছ খানের হত্যার কোন বিচার হয়নি। এসব পরিবারের সদস্যরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মামলা করতে তারা সাহস পাননি। আবার মামলা করলেও সর্বহারা সদস্যদের ভয়ে কেউ আদালতে সাক্ষ্য দেননি। তবে তারা রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে পুলিশের পৃষ্ঠপোষকতায় এলাকায় বিচরণ করছে। এদের বিরুদ্ধে মিডিয়ায় কথা বললে তাদের বিভিন্ন মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া হয় বলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা জানান।