বাণিজ্যিক ছবির রেসের ঘোড়া বাড়ছে ক্রমশ!

(আমরা চলচ্চিত্র নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনে এর আগে নায়ক ও নায়িকার বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছি। বিনোদন প্রতিদিন ফেসবুক গ্রুপ ও ইমেইলে অগণিত চিঠির মাধ্যমে পাঠকেরা তাদের মতামতও প্রকাশ করেছেন। আজ সেই ধারাবাহিকতায় থাকছে আগামী দিনের সম্ভাবনাময় নির্মাতাদের কথা। প্রিয় পাঠক একইভাবে আপনাদের ভোট ও মতামতও এখানেও প্রত্যাশা করছি। আমরা আপনাদের যৌক্তিক মতামতগুলো প্রকাশ করব।) আশির দশকে পরিচালকদের যে দাপট ছিল। তা এখন আর নেই। এ কথা যেকোনো চলচ্চিত্র আলোচনায় সহজেই বলে দেওয়া যায়। তবে তরুণদের প্রতিনিধিত্বের এই সময়ে সেই দাপটটা আবারও ফিরে আসার সম্ভবানা আছে কি না তা নিয়েও বিতর্ক চলতে পারে। আগে একজন পরিচালক তার শিল্পী, প্রডিউসারদের ধমকাতেন। এই ‘ধমকানো’ অর্থ বলতে বুঝাতে চেয়েছি... নির্দেশ করার কথা। আর এখন হয়ে গেছে উল্টোটা। প্রডিউসার বা কোনো ক্ষেত্রে নায়কদের ধমক খেতে হয় পরিচালকদের। ছবির পোস্টারে জাকির হোসেন রাজুদের মতো নির্মাতাতেও তার স্বত্ত্বা বিক্রি করে দিতে হয় প্রডিউসারের দরবারে। এর চেয়ে লজ্জার আর কী থাকতে পারে। ছবি আর পরিচালকের থাকে না হয়ে যায় ‘প্রযোজকের ছবি’। প্রযোজকের নাম ছাপা হয় বড় করে, পরিচালকদের নামের ফন্ট এত ছোট থাকে দূর থেকে নির্মাতা নিজেও দেখতে পান না তার নিজের নাম! সেই অবস্থায় কিছু তরুণ নির্মাতাদের ভেতরে সম্ভবনা দেখা যায় বৈকী। এদের ভেতরে খুব অল্প সময়ে বেশ আলোচনায় এসেছেন ইফতেখার চৌধুরী। তরুণ এই পরিচালক অনন্ত অভিনীত ‘খোঁজ দ্য সার্চ ’ ছবিটি দিয়ে আলোচনায় আসেন। এ ছাড়া স্পেশাল এফেক্ট ও চেন্নাইতে গিয়ে ছবির পোস্ট প্রোডাকশনের প্রবণতা এবং সর্বোপরি কমার্শিয়াল ছবির আধুনিকতার ছোঁয়া ও এর চর্চায় বিশ্বাসী তিনি। তার মুক্তিপ্রাপ্ত আরেকটি চলচ্চিত্র ‘দেহরক্ষী’ কমার্শিয়াল বাজারে পুরোদস্তুর সফলতা না পেলেও নির্মাল শৈলীতে আলোচনায় আসেন। একই সাথে এই ছবি করতে গিয়েই চিত্রনায়িকা ‘ববি’ সাথে প্রেম-প্রণয়ের সম্পর্ক এখন মিডিয়াতে চাউর হয়ে আছে। বলা যায় অনেকদিন পর নির্মাতা- নায়িকার প্রেমের গুঞ্জন পায় মিডিয়া। ইফতেখারের মুক্তি প্রতিক্ষিত চলচ্চিত্র ‘গেম’ ছবিটি নিয়েও চলচ্চিত্র মহলে বেশ উচ্চাশা লক্ষ করা যাচ্ছে। অনেকেরই ধারণা এই ছবিতেই হয়তো আরেফিন শুভ ক্যারিয়ার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। এ সময়ের কমার্শিয়াল চলচ্চিত্রকারদের ভেতরে প্রথম একটি ছবি দিয়েই বেশ আলোচনায় এসেছে স্বপন আহমেদ। তার লালটিপ’ চলচ্চিত্রের ঝকঝকে প্রিন্ট এবং বিভিন্ন লোকেশনে উন্নত ক্যামেরার কারুকাজ আলাদা করে দিয়েছে স্বপন আহমেদকে। যদিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান একটি স্যাটেলাইট চ্যানেল হওয়া অতি দ্রুত টিভি প্রিমিয়ার ও ক্যাম্পেইন সংকট এবং ছবিতে নির্মাতাকে জোর করিয়ে সোহেল খানসহ বেশ কিছু কাস্টিং ঢোকানোয় ছবিটির সাফল্যের চরিত্র কিছুটা গোলমেলে হয়ে যায়। তার পরবর্তী চলচ্চিত্র ‘পরবাসিনী’ হতে যাচ্ছে এদেশের প্রথম কোনো সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্র। এ ছবিটি নিয়েও উচ্চাশা অনেকের। নিজের কাজের ধরণ এবং শুধু মেকী পুরস্কার আর দু-তিনটে হলে ছবি মুক্তি দেওয়ার নামকাওয়াস্তে চলচ্চিত্র তৈরি করে নয় পুরোদস্তুর সারাদেশের দর্শকদের চলচ্চিত্র নির্মাণ করেই নিজের স্বক্ষর রাখতে চান যেন তিনি। এ প্রসঙ্গে স্বপন আহমেদ বলেন, ‘কেউ নিজের অজ্ঞতা ঢাকতে বলে থাকেন আমার ছবিতে বলিউড মার্কা গান আর ফাইটিং থাকে না। অথচ তার ছবি চলে দু’তিনটে সিনেপ্লেক্সের বাইরে মিডিয়া কাভারেজ আর বিভিন্ন দেশের স্বনামী-বেনামী পুরস্কারেই ব্যস্ত থাকেন। দর্শকদের কথা চিন্তা না করে তাদের মতো শুধু নিজের ঘরের শোকেস ভারী করতে চাইলে খুব সহজেই অল্প খরচে ছবি করতে পারতাম। কিন্তু আমি মনে করি মূল ধারার চলচ্চিত্রে তাদের কোনো অবস্থান কোনোদিন ছিল না, আজও নেই এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না।’ স্বপন আহমেদের মতো মতামত তরুণ পরিচালক অনন্য মামুনেরও। যদিও মামুনের একটি মাত্র ছবিই মুক্তি পেয়েছে ‘মোস্ট ওয়েলকাম’। অনেকের মতামত ছবিটির সাফল্যের অন্যতম ভাগীদার অনন্তর অবাধ লগ্নি। তবে যাই হোক নির্মাতা টাইটেলে অনন্য মামুনের নাম থাকায় এটি তার ক্যারিয়ারের সেরা স্বীকৃতি বলাই যায়। তবে এরপর প্রযোজক অনন্ত তাকে মুনসুন থেকে বের করে দেওয়ার পর নিজের অস্ত্বিত্ত এবং কমার্শিয়াল ধারায় নিজেকে টিকিয়ে রাখার প্রাণান্ত চেষ্টা করে চলেছেন। এরই ভেতরে রোমান্স’সহ বেশ কিছু ছবির ঘোষণা ও কিছু কাজ এগুনোর খবর শোনা যাচ্ছে। আদতে ছবি রিলিজের কোনো আশু সম্ভাবনা নেই। তারপরও নিজের মেধা আর জেদের জের সাফল্যে হয়তো কমার্শিয়াল ছবির রেসে তিনি হতে পারেন অন্যতম চালক। একটি বিতর্কিত ঘরানার নাটক এবং ভাষা বিকৃতি ও স্ক্রিপ্ট বিহীন কাজ দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করলেও চলচ্চিত্র নির্মাণে এসে যেন নিজের সেই গুরুকেই চপেটাঘাত করেছেন রেদওয়ান রনি তার ‘চোরাবালি’ চলচ্চিত্র’ দিয়ে। সকলের ধারণাকে ভ্রান্ত করে তার বাণিজ্যিক ধারার ছবি নির্মানের চেষ্টা তাই অনেকেই সাধুবাদ জানিয়েছেন। যদিও এখানে প্রযোজক ও পরিচালকের ভেতরে একটা লেনদেন জনিত বৈষম্যের খবর শোনা যায়। তারপরও নতুনভাবে চলচ্চিত্রে সিরিয়াস হয়ে হয়তো আগামীতে ভালো কিছু করে দেখাতে পারেন, সেই প্রত্যাশা তার প্রতি এখন অনেকের। এদিকে এ সময়ের নির্মাতাদের ভেতরে বেশ সিনিয়র নির্মাতাই বলা যায় দেবাশীষ বিশ্বাসকে। দীর্ঘদিন পর তিনিও ছোট পর্দার উপস্থাপনা আর নানান প্রেম মশলার বিতর্ক পেরিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে সিরিয়াস হয়েছেন। চলতি সপ্তহে বেরিয়েছে তার নতুন চলচ্চিত্র ‘ভালোবাসা জিন্দাবাদ’ ছবিটি। এ ছবিতে আইরিন নামের নবাগতাকে উপস্থাপন করেছেন। এ ছবির সাফল্য-ব্যর্থতার হিসেবের সময় এখনও আসেনি। এর আগে দেবাশীষের ক্যারিয়ারে ডিজিটাল ছবির নামে কনভার্ট ফিল্ম দেখিয়ে বেশ আলোচনায় এসেছিলেন। তবে পৈতৃকভাবেই এই তরুণ নির্মাতা বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রে আরও অনেক কিছু উপহার দেবেন সেই প্রত্যাশা অনেকের। দেবাশীষের মেধা ও ভাবনার খাতগুলো আধুনিকতায় ছোঁয়া তা অনেকেই বিশ্বাস করেন মনে পোষেণ। তবে তরুণ এই নির্মাতারা কেউই কিন্তু পুরোদস্তুর চলচ্চিত্র নির্মাণে বছরের ৩৬৫ দিন নিবিষ্ট থাকেন না। জীবিকার প্রয়োজেনেই অনেকে ছোটপর্দায় আছেন। কাজ করছেন। মাঝে মাঝে বড় লগ্নিকারী বা সুযোগ মিললেই ঝাঁপিয়ে পড়ছেন যেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তবে চলচ্চিত্র নির্মাণের যেকোনো ভালো সুযোগ পেলে তারা প্রত্যেকে সব ভুলে নিবিষ্ট থাকবেন চলচ্চিত্রে এ কথা বলা অপেক্ষা রাখে না। বাস্তবতাকে তো কেউ আর অস্বীকার করতে পারে না। এর বাইরে ঈষত্ সাফল্যে মোস্তফা কামাল রাজ তার ‘প্রজাপতি’র পর ‘ছায়া-ছবি’ নির্মাণ শেষ করেছেন। অন্যান্য অনেক কাজের পাশাপাশি পূর্ণদৈর্ঘ্যেই তার স্বপ্নজ্ঞান। নিজেই বলেন এখনও পরীক্ষিত নই আমি। ইষত্ সাফল্য নিয়ে একই ভাবনায় এগুচ্ছেন তরুণ মেধাবী নির্মাতা শাহীন কবির টুটুলও। এর বাইরে হয়তো হাজার তরুণের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে যারা বিভিন্ন বাজেটের বিভিন্ন সাইজের চলচ্চিত্র নির্মাণ করে চলেছেন। তবে আগামী দিনের ভালোমানের কমার্শিয়াল চলচ্চিত্র পাওয়ার প্রত্যাশায় হাজারটা মন্দ বা কম ভালো চলচ্চিত্র হোক, তবুও চলুক এ প্রতিযোগিতা। এই কামনা আজ সকলের। চলচ্চিত্রের সেই রেসের মাঠে আজ যেন ক্রমশ ঘোড়া নামছে। কেউ থেমে যাচ্ছে মাঝপথে, কেউ শুরুতে গর্জেই আবার চুপ করে ব্যাকবেঞ্চে বসে রয়েছে। তবুও আশার কথা হলো বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রে আশার প্রদীপ জ্বলছে, যে আলো বাড়ছে ক্রমশ!