একদিন মানুষ জেগে উঠবেই

বাঙালির জাতীয় জীবনে এখন একটিমাত্র শব্দ, বাক্য বা বাণী—তা হলো সংলাপ। ইতোমধ্যেই হয়েছে মুখালাপ, মাইকালাপ আর টেলিআলাপ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রবক্তা সরকারি দল সময়ের ব্যবধানে আজ এর বিরোধী পক্ষ। তাদের যুক্তি কোনো অনির্বাচিত সরকার যেন ক্ষমতায় এসে আবার তাদের শ্রীঘরে ঢোকাতে না পারে। তাই তারা সর্বদলীয় সরকার গঠনে বদ্ধপরিকর। যে জনগণের ভোটাধিকারে সংবিধান পরিবর্তন হয়, আজ সেই জনগণই উপেক্ষিত। জনগণই সংবিধানের রক্ষক; অথচ সংবিধানই যেন এখন জনগণের রক্ষক হয়ে দাঁড়িয়েছে! ফলে জনগণ কী চায় তা জানার আর প্রয়োজন পড়ে না। দল কী চায়—সেটিই মুখ্য হয়ে যায়। বাংলাদেশের ওয়ান ইলেভেন ও ২০০৭ সালের নির্বাচনে নিঃসন্দেহে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিরোধী দল। অথচ সেই বিরোধী পক্ষই কেন আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায়? বিগত পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সরকারি দলের ভরাডুবি হয়েছে। এমন সুযোগ বিরোধীদলও হাতছাড়া করতে চায় না। উপরন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকারের প্রধান যদি প্রধানমন্ত্রী হন; এমনকি মন্ত্রী, সাংসদেরা যদি স্ব স্ব পদে বহাল থাকেন তাহলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিনা ? যেখানে দেশের পুলিশ সরকারের পেটোয়া বাহিনী হিসেবে কাজ করে। এমনকি নির্বাচন কমিশনও দন্তহীন সাপের মতো বিষধর ও বিতর্কিত হয়। ফলে বিরোধীনেত্রীও তাঁর অবস্থান থেকে এক চুলও নড়তে চান না। তাঁরাও নির্দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন চান। এমনকি অন্য কোনো উপায়ে নির্বাচন হলে তা প্রতিহত করার ঘোষণা দেন। এসব কারণেই একপক্ষ ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চায়, আর অন্য পক্ষ ক্ষমতায় আরোহণ করতে চায়। এই বাঙালি জাতির মানুষিকতায় রাতারাতি এমন কোনো পরিবর্তন হয়নি যে, তারা পরস্পরকে বিশ্বাস করতে পারে; শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে পারে। তারই বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় আমাদের রাজনৈতিক দুটি দলের মধ্যে। তারা কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না, এমনকি ছায়া পর্যন্ত মাড়াতে চায় না। একদিকে আল্টিমেটাম দেওয়া হয়, হরতাল আহ্বান করা হয়; অন্যদিকে টেলিসংলাপ দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। তারপরেও জনগণ আজ আশায় বুক বেঁধে আছে দুই নেত্রীর সংলাপের জন্য। তারা বিশ্বাস করে দুই নেত্রী এক টেবিলে বসে নৈশভোজ বা চা-নাস্তা যাই করুন তাতে দেশের সংকট কেটে যাবে। তারা জানে, বাংলাদেশের রাজনীতি এই দুই নেত্রীর হাতে থাকলে তা নিরাপদ থাকবে, অন্য কারো হাতে নয়। অন্য কোনো শক্তি দেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করুক এটি যেমন দু’দল চায় না, তেমনি দেশের জনগণও প্রত্যাশা করে না। তাই তারা জানতে চায়— সংলাপ আর কত দূরে? কখন হবে? কীভাবে হবে? এ দেশের মানুষ শান্তিপ্রিয়। তারা চায় না সরকার হরতালের মতো কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি করুক; আর বিরোধীদল অবিরত হরতাল ডাকুক। সন্তানদের পরীক্ষা বন্ধ হোক। ককটেল বিস্ফোরণে অবুঝ শিশু দু’হাত হারিয়ে হাসপাতালে কাতর রব তুলুক। কেননা তারা জানে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের দায়িত্ব তারা কেউ কাঁধে তুলে নেয় না। অথচ এরাই বার বার দেশকে সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য তাদেরকে ক্ষমতায় বসায়। আবার নামায়। আবার বসায়। বার বার আশায় বুক বাঁধে। কিন্তু আজ এদের কথা ভুলে গিয়ে তারা নিজেদের দলীয় স্বার্থে মগ্ন হয়ে আছে। তাদের জানা দরকার, জনগণ জেগে উঠতে শুরু করেছে। কোনো একদিন হঠাত্ ঘুম ভাঙলে তারা দেখতে পারে জনগণ আর তাদের পাশে নেই। পরিবর্তনের স্লোগানে এগিয়ে চলেছে। তখন অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। ঢাকা