গাজীপুর অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য
প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০১৩, ২১:৩০
সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যমণ্ডিত ভাওয়াল অঞ্চলের বৃহদাংশ নিয়েই আজকের গাজীপুর জেলা। বৃহত্তর ঢাকা জেলার পাহাড়িয়া ও টিলাময় এলাকা যা বুড়িগঙ্গা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, তাকে ‘আইন ই আকবরী’ ‘কোহিস্তান-ই ঢাকা’ অর্থাত্ ঢাকার পাহাড়িয়া অঞ্চল হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেসব টিলাময় এলাকার অতিস্বল্পই বর্তমানে গাজীপুর জেলায় বিদ্যমান। বাকিগুলোর কোনো চিহ্ন নেই। বিগত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে তা বিলুপ্ত হয়েছে। একটি জাতীয় দৈনিকে একজন প্রবীণ ব্যক্তির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে স্মৃতিচারণে পঞ্চাশের দশকে তেজগাঁওয়ের টিলাময় এলাকায় বনভোজন করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে—যা এখন অকল্পনীয় ব্যাপার। প্রাপ্ত তথ্যমতে, গাজীপুরের ভাওয়াল এলাকা থেকে ঢাকার কাঁটাবন পর্যন্ত বিশাল বনভূমি বিদ্যমান ছিল। এখানে ছিল নানা ধরনের জীব বা প্রাণীবৈচিত্র্য। স্বাধীনতাপূর্বকালেও এ অঞ্চলে বাঘ, ভালুক, গণ্ডর, বুনোমহিষ, বুনোশুয়োর, বানর, হনুমান, ময়ূর ইত্যাদি বিচরণ করতো বলে বয়োজেষ্ঠ্যদের কাছ থেকে জানা যায়। বর্তমানে এসব প্রাণীর অধিকাংশের অস্তিত্ব নেই। গাজীপুরের পল্লি অঞ্চলে অত্যন্ত বৃহদাকায় গোখরা প্রজাতির সাপের বিচরণ লক্ষ করা যায়, যা সাধারণ মানুষের কাছে ভীতিকর হলেও কদাচিত্ দংশন করে থাকে। এতদাঞ্চলে সর্পকুলেও রয়েছে বড় ধরনের বৈচিত্র্য।
গাজীপুর অঞ্চলের সে বিষয়টি আমাকে বিস্মিত করেছে তাহলো আমরা সেসব প্রজাতির পাখি বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র লক্ষ করি তারই সমগোত্রীয় কিন্তু ভিন্নতর প্রজাতির পাখি আমি আমার বাসগৃহের আশেপাশে দেখতে পাই। তাছাড়া রয়েছে সম্পূর্ণ অচেনা পাখিরও বিচরণ। কিন্তু শিল্পায়ন তথা নগরায়নের ফলে এইসব প্রাণী হারিয়ে যাচ্ছে। প্রায় বিশ বছর আগে সাভারে জেলেদের জালে নেকড়ে ধরনের প্রাণী আটকে পড়ার খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। অন্যদিকে সম্প্রতি গাজীপুরের জঙ্গলে হায়েনা ধরনের প্রাণীর বিচরণের কথা অনেকেই বলেছেন। ঢাকাতে নান্দাইলের এক বৃদ্ধা আমাকে ঐ অঞ্চলের মাথায় পুষ্প বা মুকুট বিশিষ্ট সাপের কথা বলেছিলেন। অন্যদিকে গত বছর ঢাকার এক জাতীয় দৈনিকে বৃহত্তর সিলেট জেলায় তিনমাথা বিশিষ্ট সাপের সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।
আগে গাজীপুর পল্লিতে আমার বাসগৃহে যেতে পথের দুধারে ফসলের সবুজ খেত আমাকে মুগ্ধ করেছে। কিন্তু এখন সেসব খেতের অধিকাংশই ভরাট করে গার্মেন্টস, ডায়িং অথবা অন্য কোনো শিল্পস্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। সরকার ঘোষিত কৃষিজমি সংরক্ষণের নীতিমালা হচ্ছে না। গৃহীত পদক্ষেপ অনুযায়ী ঢাকার চামড়াশিল্প সাভারে স্থানান্তরিত হচ্ছে। একইভাবে মেঘনা নদীর কাছে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় শিল্পনগরী স্থাপন করে এইসব শিল্পস্থাপনা স্থানান্তরের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। এজন্য আর্থিক সহায়তার কথাও বলা হচ্ছে। এ অবস্থায়, গাজীপুর অঞ্চলে নতুন করে শিল্প স্থাপনের অনুমতি প্রদান যথাযথ নয়। শিল্প বর্জ্যের কারণে এসব এলাকার নদ-নদীতে বর্তমানে মাছের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে, যার প্রচুর প্রাপ্যতা আমি একসময় লক্ষ করেছিলাম। বৃহত্তর ঢাকা ও ময়মনসিংহ জেলার প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও বিশিষ্টতার কথা এক শ বছরের বেশি সময় আগে যতীন্দ্রমোহন রায়ের ‘ঢাকার ইতিহাস’ গ্রন্থে বিশদভাবে বিধৃত হয়েছে।
গাজীপুর