বিদায় ইডেন...

আর তাই দিওয়ালী উত্সবকে ছাড়িয়ে কলকাতা যখন মাতোয়ারা শচীন উত্সবে, শচীন নিজেই তখন আরেকবার মনে করিয়ে দিলেন, ‘কোন ব্যক্তি নয়, ক্রিকেটই সবার আগে গুরুত্ব পাওয়া উচিত।’ মোহাম্মদ সামির বোলিং তোপে কলকাতা টেস্টের তৃতীয় দিনেই ইনিংস ব্যবধানে হারলো ওয়েস্ট ইন্ডিজ। অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি পঞ্চমুখ এই তরুণ পেসারের প্রশংসায়। তবে দারুণ এই পারফরম্যান্সের পরও যদি ইডেন গার্ডেনের দর্শকরা সামিকে দুয়ো দিয়ে থাকেন তাতে মোটেই অবাক হবার কিছু নেই! কারণ, সামির কারণেই তো ম্যাচে দ্বিতীয়বারের মতো ব্যাটিংয়ে নামতে পারলেন না শচীন টেন্ডুলকার। দর্শকদেরই বা কি দোষ! ভারতের জয় হয়তো ভবিষ্যতে আরো বহুবার দেখা যাবে, কিন্তু ঘরের মাঠে শচীনের ব্যাটিং দেখার এটাই ছিল শেষ সুযোগ। আর তাই ক্যারিয়ারের ১৯৯তম ম্যাচে দলের জয়ে বিশেষ অবদান রাখতে না পারলেও, রাশি রাশি রান আর অজস্র রেকর্ডকে পেছনে ফেলে আগামী ম্যাচেই ক্রিকেটকে বিদায় জানাতে যাওয়া এই ব্যাটিং জিনিয়াসকে এক অভূতপূর্ব বিদায় সংবর্ধনাই জানিয়েছে কলকাতা। ক্রিকেটের প্রতি অবিশ্বাস্য ভালবাসা, নিরন্তর অধ্যবসায় চালিয়ে যাওয়ার বিরল গুণ আর হারকে তীব্রভাবে ঘৃণা করতে শেখা—এই গুণগুলোই সাধারণ এক কিশোর ব্যাটসম্যানকে চব্বিশ বছরের ব্যবধানে আজ শচীনকে পরিণত করেছে তার যুগের তো বটেই, সর্বকালের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যানে। করাচিতে ১৯৮৯ সালে টেন্ডুলকারের অভিষেকের পর এতদিনে পাল্টে গেছে বহু কিছুই। পাল্টে গেছে পৃথিবীর মানচিত্র, রাশিয়ার হাত ঘুরে পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ এখন আমেরিকার হাতে। তবে ক্রিকেটের প্রতি টেন্ডুলকারের সীমাহীন আবেগ আর ভালবাসার পরিবর্তন হয়নি এক বিন্দুও। শুরুর দিনগুলোর মতোই এখনো খেলাকে উপভোগ করেন দারুণভাবে, আর মাঠের বাইরে বরাবরের মতোই দারুণ বিনয়ী আর অনাড়ম্বর। আর তাই দিওয়ালী উত্সবকে ছাড়িয়ে কলকাতা যখন মাতোয়ারা শচীন উত্সবে, শচীন নিজেই তখন আরেকবার মনে করিয়ে দিলেন, ‘কোন ব্যক্তি নয়, ক্রিকেটই সবার আগে গুরুত্ব পাওয়া উচিত।’ বছরের পর বছর ধরে মাঠে প্রতিপক্ষের উপর ছড়ি ঘোরানো, আর বোলারদের দু:স্বপ্নের কারণ হওয়া এই কিংবদন্তীর ক্রিকেট প্রেমের এরকম হাজারটা নজির খুঁজলে পাওয়া যাবে। যেমনটা পাওয়া যাবে তাকে ঘিরে ভক্তদের উচ্ছ্বাস আর আবেগের হাজারো চিত্রও। আর সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি, দু’শ টেস্ট আর ব্যাটিংয়ের প্রায় সব রেকর্ডকে সঙ্গী করে ক্রিকেট ছাড়ার আগে সমর্থকদের ভালবাসার সেই পুন:চিত্রায়ণ গতকাল আরেকবার দেখলেন এই গতকালই ত্রয়োদশ এবং শেষ টেস্টের জন্য ইডেনে খেলতে নামা শচীন। আর তাই রেকর্ডের এই বরপুত্র না চাইলেও কলকাতা দারুণ এক বিদায় সংবর্ধনারই ব্যবস্থা করে রেখেছিল তার জন্য। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ম্যাচ শেষে নিজের আঁকা একটি চিত্রকর্ম উপহার দিয়েছেন শচীনকে। ক্রিকেটের এই যুগের সবচেয়ে বড় তারকাটিকে একটি গাছের চিত্রকর্ম উপহার দেন মুখ্যমন্ত্রী। এ সময় ইডেনে উপস্থিত দর্শকরা শচীনের সম্মানে উঠে দাঁড়িয়ে তাদের উচ্ছ্বসিত সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন। মুখ্যমন্ত্রীর দেয়া আরেকটি উপহারের মধ্যে ছিল মাথার পাগড়ি। ভারতের সাবেক অধিনায়ক এবং শচীনের এক সময়ের উদ্বোধনী সঙ্গী সৌরভ গাঙ্গুলি পাগড়িটি শচীনের মাথায় পরিয়ে দেন। কলকাতা পুলিশের কমিশনার সুরজিত পুরকায়স্ত টেন্ডুলকারকে একটি দুর্গার মূর্তি উপহার দেন। এছাড়া ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গলের (সিএবি) সভাপতি জগমোহন ডালমিয়া লিটল মাস্টারকে একটি বটবৃক্ষের প্রতিকৃতি উপহার দেন। বটবৃক্ষটির কাণ্ড রূপা দিয়ে তৈরি এবং এতে স্বর্ণ দিয়ে বানানো মোট ১৯৯টি পাতা আছে। তবে ১৯৯ কেজি গোলাপের পাপড়ি ছেটানোর যে ঘোষণা সিএবি ম্যাচের আগে দিয়েছিল পরে সেখান থেকে সরে আসে তারা।