শিক্ষা পরামর্শ

প্রফেসর ড. আবদুল খালেক উপাচার্য নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশন্যাল ইউনিভার্সিটি রাজশাহী প্রশ্ন: বাংলাদেশে বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭০-এর উপরে। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে স্বল্পসংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়কে গুরুত্ব দেওয়া হলেও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়কে মানের দিক দিয়ে অবমূল্যায়ন করা হয়। কারণ কী? উত্তর: একটু গোড়া থেকে বলি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাটিকে ১৯৯২ সালের আগে খুব ভালোভাবে দেখা হতো না। অন্যদিকে দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও কম। সুতরাং যাদের টাকা আছে তারা পড়ালেখার জন্য দেশের বাইরে যাচ্ছে, যাদের নেই তারা উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ভালো ফলাফল করেও অনেক মেধাবী উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে সমস্যাটি জাতীয় সমস্যায় রূপ নিচ্ছে। সমস্যাটির সমাধান খুঁজতে তত্কালীন সরকার এবং কিছু শিক্ষাবিদ মানসম্পন্ন কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। পাস হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৯২। আইনের আলোকে প্রতিষ্ঠা পায় কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার প্রকৃত মান ধরে রেখে শুরু হয় কার্যক্রম। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সঠিকভাবে পরিচালনায় ব্যর্থ হয়। ব্যর্থতার বড় কারণ মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব। তার চেয়েও বড় কারণ হিসেবে দাঁড়ায় আইনের দুর্বলতা। আইনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে শুরু হয় শাখা বিক্রির বাণিজ্য। আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা, অবকাঠামো, পরিবেশ বিবেচনায় না রেখে যেখানে-সেখানে গড়ে তোলা হয় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা। প্রচার করা হয় সার্টিফিকেট সরবরাহ করা হবে মূল ক্যাম্পাস অর্থাত্ ঢাকা থেকে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সবার কাছে পরিচিতি পায় সার্টিফিকেট তৈরির কারখানা হিসেবে। প্রশ্ন: এই সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় কী বলে আপনি মনে করেন? উত্তর: আইনের যথাযথ প্রয়োগ। অর্থাত্ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এর সঠিক প্রয়োগ। যেমন, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যায়ের কোন শাখা ক্যাম্পাস থাকবে না। সব বন্ধ করতে হবে। আইন দিয়ে যদি অবৈধ ঔষধ কারখানা বন্ধ করা যায়, তাহলে সার্টিফিকেট বিক্রির কারখানা কেন নয়? প্রশ্ন: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ফোকলোর বিষয়টি আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম চালু হলো। আবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে বাংলা বিষয়টি খুব একটা দেখা যায় না। কোন ভাবনা থেকে এ বিষয় দুটি অন্তর্ভূক্ত করলেন? উত্তর: সত্যিকার অর্থেই দেশ দাঁড়িয়ে থাকে সংস্কৃতির উপর। একটি জাতির নিজস্বতাই হলো তাঁর ভাষা ও সংস্কৃতি। বাঙালি জাতি স্বাধীন হয়েছে তার সংস্কৃতির উপর ভর করে। একটি জাতির সংস্কৃতি তার পায়ের তলার মাটি। এ মাটি শক্ত না থাকলে তার কোন অস্তিত্ব নেই। আর এ সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগের কারণেই আমরা স্বাধীন হয়েছি। এর পিছনে রয়েছে অসাম্প্রদায়িক চেতনা। যে সংস্কৃতি আমাদের এত কিছু দিতে পারে আর তাকে আমরা লালন করবো না, চর্চা করবো না, এটা হয় না। দ্বিতীয়ত, আমরা ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি। জীবন দিয়েছি। আমরা ২১ ফেব্রুয়ারি পেয়েছি, ২৬ মার্চ পেয়েছি, ১৬ ডিসেম্বর পেয়েছি। বাঙালি হিসেবে সব দিবসের স্বাদ পেলেও ২১ ফেব্রুয়ারির স্বাদ কিছুটা ভিন্ন, গভীর। কেননা যে প্রাপ্তির পিছনে বড় আত্মত্যাগের ইতিহাস থাকে তার স্বাদ ভিন্নরকম। আর এ প্রত্যাশিত স্বাদ পেতে পুরো জাতি ২১ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরের জন্য প্রতীক্ষা করে। ২১-ই গোটা জাতিকে জাগিয়ে দেয়। প্রশ্ন: গ্লোবাল র্যাঙ্কিং-এ উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, চীন, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়াকে অনেক গুরুত্ব দিলেও আমরা এক্ষেত্রে পিছিয়ে আছি। সঙ্কটটা কিসের—মেধার না অর্থের? উত্তর: যে রাষ্ট্রের নামগুলো তুমি উচ্চারণ করলে তারা এখন অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশ। শিক্ষাকে আলাদা করে দেখার কোন সুযোগ নেই। তাছাড়া আমাদের ছেলেরা অনেক দেশের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছে। নতুন অনেক কিছু আবিষ্কার করছে। সুতরাং, আমাদের ছেলেদের মেধাহীন বলার কোন সুযোগ নেই। এছাড়া দারিদ্র্য বড় একটি সমস্যা, সাথে দুর্নীতিও। দুর্নীতি আর দারিদ্র্য একসূত্রে গাঁথা। প্রত্যন্ত গ্রামে অনেক মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী আছে যারা অর্থের অভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আসতে পারছে না। এখানে মেধা অর্থের কাছে হেরে যাচ্ছে। দুর্নীতিতে আচ্ছন্ন আজ দেশ। কবি ভারতচন্দ্র বলেছেন, ‘নগর পুড়ে গেলে-দেবালয় কি এড়ায়?’ নগর পুড়ে গেলে দেবালয়ও রক্ষা পায় না। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন এস.এম. শরীফুল ইসলাম