পাট মানেই চট নয়
প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০১৩, ১৯:৪৫
পাটের দেশ বাংলাদেশ— নামে একটা কথা আমরা বহু বছর ধরে শুনে আসছি। এই পাট রপ্তানি করে আমাদের প্রতি বছর অনেক আয় হওয়া সত্ত্বেও পাটজাত দ্রব্য দিয়ে আমরা তেমন আন্তর্জাতিক মানের কিছু করতে পারিনি সেটা আমাদের ব্যর্থতা। এটা শুধু আয়-উপার্জন দিয়ে মাপা যায় না, অনেক গ্রাম কিংবা শহরেও অনেক সৌখিন মানুষ আছেন যারা নিজেদের ব্যবহার্য জিনিসগুলো পাটের করে নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে থাকেন। কিন্তু সেটা বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে খুব বেশি উপকারে আসে না। তবে এখন হয়তো আর খুব বেশি হতাশ হওয়ার দিন নেই, কেননা এখন এমন কিছু মেধাবী বাংলাদেশি উদ্যোক্তা পাট নিয়ে কাজ করছেন যারা শুধু বাংলাদেশের বাজারেই না, বিদেশের মাটিতেও সুনাম অর্জনে সক্ষম হচ্ছেন। তেমনি একজন উদ্যোক্তা হচ্ছেন আফসানা আসিফ। রাজধানীর শ্যামলী এলাকায় প্রায় ১০০ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে তিনি নিজের অর্থায়নে ‘ডালসানিয়া’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন।
মেধাবি নারী উদ্যোক্তা মিসেস আফসানা আসিফের প্রতিষ্ঠান ‘ডালসানিয়া’ এর যাত্রা শুরু হয় ১৮ বছর পূর্বে ১৯৯৪ সালে। প্রতিষ্ঠানটি মূলত পরিবেশ বান্ধব পাট পণ্যের বহুমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে গৃহ সজ্জা এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ ফ্যাশন ব্যাগস তৈরিতে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে পর্দা এবং বিছানার চাদর, টেবিল রানার, কুশন কভার, মোবাইল কভার, ল্যাপটপ ব্যাগ, পার্স এবং অন্যান্য পণ্যের সমাহার। প্রতিটি পণ্যই অত্যন্ত মানসম্মত ও রুচিশীল। ‘ডালসানিয়া’ ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সে এর পাট পণ্য বিপণন শুরু করেছে। এছাড়াও ফ্রান্সে তাদের একটি প্রদর্শনীও হয়েছে। নানা বিদেশি রুচিশীলেরা তার এ পাটের উপযোগিতার প্রয়োগ দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। তার এসব ডিজাইন শুধু পাটের বলেই সমাদৃত না, প্রতিটি ডিজাইন বেশ আধুনিক ও রুচিশীল। যে কারো প্রথম দেখাতেই পছন্দ হয়ে যাবে এমন সব পণ্যের সমাহার নিয়ে এগিয়ে চলেছে এই ডালসানিয়া।
পণ্যের মধ্যে রয়েছে ব্যাগ, হ্যান্ডব্যাগ, পার্স, মোবাইল কভার, ল্যাপটপ কভার, পেনসিল বক্স, মানিব্যাগ, ওয়ালেট, বিছানার চাদর, বালিশের কভার ও জানালার পর্দা ইত্যাদি। এই পাটজাত দ্রব্য সবুজ ও সুন্দর পরিবেশের সহায়ক হবে। যা একই সাথে রুচিশীল ও স্বাস্থ্যের জন্য বেশ উপকারী। সিনথেটিক আঁশের দ্রব্যের মতো এটি কোনো প্রকারের দূষণ তৈরি করবে না। আর এই ডালসানিয়ার বাইরে কোনো আউটলেট নেই।
আফসানা আসিফের ডালসানিয়ার পাটের তৈরি পণ্যের এক চমকপ্রদ প্রদর্শনী শুরু হয়েছে গত ১ নভেম্বর থেকে আঁলিয়স ফ্রঁসেজ দো ঢাকার লা গ্যালারিতে “এন্টিক জুট ২” শিরোনামে। ব্যতিক্রমী এই প্রদর্শনীটি মূলত নারী উদ্যোক্তা মিসেস আফসানা আসিফের ফ্যাশন বুটিক প্রতিষ্ঠান ‘ডালসানিয়া’ এর তৈরি পাটের বহুমুখী পণ্যের এক চমত্কার সমাহার। প্রদর্শনী উপলক্ষে আঁলিয়স ফ্রঁসেজ দো ঢাকার লা গ্যালারির প্রবেশদ্বারে পাটের তৈরি সুসজ্জিত তোরণ নির্মাণ করা হয়। সোনালী আঁশের তৈরি দড়ি কেটে এই প্রদর্শনীর শুভ উদ্বোধন করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং এডকম লিমিটেডের চেয়ারম্যান মিসেস গিতিআরা সাফিয়া চৌধুরী। এ সময় তার সাথে ছিলেন প্রতিভাময়ী নারী উদ্যোক্তা আফসানা আসিফ এবং আঁলিয়স ফ্রঁসেজ দো ঢাকার পরিচালক অলিভিয়ে লিতভিন। প্রদর্শনীটি চলবে এ মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত। সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা এবং শুক্রবার ও শনিবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা এবং বিকাল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রদর্শনীটি খোলা থাকবে। রবিবার সাপ্তাহিক বন্ধ। প্রদর্শনীটি সবার জন্য উন্মুক্ত। তরুণ-তরুণীরা প্রায় প্রতিদিনই ভিড় জমাচ্ছে তার পছন্দের পাটের পণ্যটি কেনার জন্য। আর সেই সাথে আসছেন বয়োবৃদ্ধরাও, সবারই কৌতূহল ও আকর্ষণ কীভাবে আফসানা এই অপূর্ব সমাহার তৈরি করার চিন্তা করলেন। সবাই এক কথায় মুগ্ধ দর্শক। আগে ২০১২ সালেও ডালসানিয়া এক অসাধারণ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল আঁলিয়স ফ্রঁসেজ দো-তেই। সেবারও বেশ চমত্কারভাবে প্রশংসিত হয় আফসানার এই উদ্যোগ। তাকে এই প্রশংসা আর সাফল্যই আরো একবার নিজেদের পণ্য সবার কাছে উপস্থাপন করার সাহস জোগায়।
ডালসানিয়ার পরিবেশ বান্ধব সোনালি আঁশ পাট পণ্যের উত্পাদন ও বিপণন প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে একদিকে এদেশের সুবিধা বঞ্চিত মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অপরদিকে এর বহুমুখী ব্যবহার বৃদ্ধির নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিশ্ব বাজারে পাটের চাহিদা বৃদ্ধিতে বিশেষভাবে অবদান রাখছে। আফসানা আসিফ শুধু ডালসানিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালকই নন, তিনি সমগ্র বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের একজন মুখপাত্র হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন।