মেহসুদ অধ্যায়ের ইতি!

তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) নেতা হাকিমুল্লাহ মেহসুদ নিজেকে রক্ষার জন্য ব্যাপক সতর্কতামূলক ব্যবস্থাই নিয়েছিলেন। তিনি অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে চলাফেরা করতেন। এমন কোনো নজির নেই যে তিনি কোনো স্থানে একটানা ছয় দিনের বেশি অবস্থান করেছেন। পাকিস্তানের বিশৃঙ্খলাপূর্ণ উপজাতি অধ্যুষিত এলাকাজুড়ে অসংখ্য নিরাপদ আস্তানা আছে তালেবানের। ঘন ঘন সেগুলো বদল করতেন মেহসুদ। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। অবশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চালকবিহীন বিমান (ড্রোন) হামলায় তাকে না ফেরার দেশেই চলে যেতে হলো। তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র এবং পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক নানা আলোচনা চলছে। তার মৃত্যু কি টিটিপিকে শক্তিশালী করবে নাকি দুর্বল করবে? এ নিয়ে আছে নানাজনের নানা মত। হাকিমুল্লাহ মেহসুদের উত্তরাধিকারী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন কট্টরপন্থী মোল্লা ফজলুল্লাহ। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ সম্প্রতি ওয়াশিংটনে এক বৈঠকে তার দেশে ড্রোন হামলা বন্ধ করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রতি আহবান জানানোর এক সপ্তাহ পর এ ঘটনা ঘটলো। যুক্তরাষ্ট্রের টার্গেটে ছিল মেহসুদ: ২০০৯ সালে পাকিস্তানি তালেবানের প্রধানের দায়িত্ব নেন হাকিমুল্লাহ মেহসুদ। তার সন্ধান পেতে ৫০ লাখ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে লড়াইরত এই গোষ্ঠীর আগের দুই প্রধানও ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছিলেন। ২০০৯ সালেই মেহসুদ যুক্তরাষ্ট্রের টার্গেটে পরিণত হয়। ওই বছর জর্ডানের ডাক্তার হাম্মাম খালিল আবু-মুলাল আল-বালাওয়ির সঙ্গে মেহসুদের কথোপকথনের এক ভিডিও দেখতে পায় যুক্তরাষ্ট্র। ওই ডাক্তার আফগানিস্তানে সিআইএ’র ঘাঁটিতে আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে সাতজন গোয়েন্দাকে হত্যা করে। ডাক্তারের সঙ্গে আল-কায়েদার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল। নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে এক ব্যর্থ হামলা চালায় পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক ফয়সাল শেহজাদ। মেহসুদই তাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন বলে স্বীকার করেছিলেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্র গত তিন বছরে বহুবার মেহসুদকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। কিন্তু তিনি অল্প সময়ের ব্যবধানে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন। একবার তিনি আহত হয়েছিলেন। এরপর তিনি বহুদিন কাজ করতে পারেননি। নিহত হলেন যেভাবে: গত শুক্রবার হামলার কয়েক সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে মেহসুদের ঘনিষ্ঠ সহচর লতিফ মেহসুদকে আফগানিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে ছিনতাই করে। তার কাছ থেকেই তথ্য নিয়েই মূলত হাকিমুল্লাহর অবস্থান জানা যায়। পাকিস্তান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিসার আলী খানও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। গত দুই বছরে ড্রোন হামলায় টিটিপির ডেপুটি প্রধান ওয়ালিউর রেহমান, ইলিয়াস কাশ্মিরী, কারী জাফর এবং বদর মানসুর যারা পাকিস্তানের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ভাংতে মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন। পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনা সন্নিকটে হওয়ায় নিজেকে নিরাপদ মনে করে তিনি তার নতুন আস্তানায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় অবস্থান করেন। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় মিরানশায় প্রতিনিয়ত চক্কর দেয়া মার্কিন ড্রোনগুলোর দৃষ্টিতে ধরা পড়ার জন্য ওই সময়ই ছিল যথেষ্ট। গত শুক্রবার মার্কিন ড্রোন থেকে ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হয় তালেবান নেতা মেহসুদের অবস্থানে। এতে কয়েকজন সঙ্গীসহ নিহত হন তিনি। উপজাতি অধ্যুষিত উত্তর ওয়াজিরস্তানের প্রধান শহর মিরামশাহের পাঁচ কিলোমিটার উত্তরের দান্দে দারপাখেল এলাকা পাকিস্তানি তালেবানের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। পাকিস্তানের একটি নিরাপত্তা সূত্র ওই হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেছে, মেহসুদ সরকারের সঙ্গে সম্ভাব্য সংলাপের বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পাশের একটি মসজিদে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে ফোর হুইল ড্রাইভ জিপে করে নিজের নতুন বাড়িতে ফিরেই হামলার শিকার হন। সম্ভবত বাড়ির আঙ্গিনায় ঠিক গাড়ি থেকে নামার সময়ই ড্রোন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করে তাকে। উত্তর- পশ্চিম পাকিস্তানের এক গোপন স্থানে গত শনিবার তাকে সমাহিত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করবে পাকিস্তান: মেহসুদ নিহত হবার পর পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে ব্যাপক উত্তেজনা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নের বিষয়টি বিবেচনা করছে পাকিস্তান। যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃত অন্তর্ঘাত সৃষ্টি করছে বলে উল্লেখ করেছে পাকিস্তান। মেহসুদকে হত্যার মধ্য দিয়ে মূলত তালেবানদের সাথে শান্তি আলোচনার মৃত্যু ঘটেছে বলে উল্লেখ করেছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী নিসার আলী খান বলেছেন, এই হত্যাকাণ্ড শুধু কোন একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়, বরং পুরো শান্তি প্রক্রিয়ার মৃত্যু। তিনি বলেন, কিভাবে পাকিস্তানে শান্তি আসবে তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বোঝাপড়ার ঘাটতি আছে। তারা কিভাবে আশা করে যে একদিকে তারা পাকিস্তানের শান্তি আলোচনায় সহযোগিতা করবে আবার অন্যদিকে আলোচনার জন্য যাকে উত্সাহিত করা হচ্ছে তাকে তারা হত্যা করবে? আমেরিকানদের বুঝতে হবে পৃথিবীর এই অঞ্চলে আসলে কি ঘটেছে। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা মার্কিন রাষ্ট্রদূত রিচার্ড ওলসনকে তলব করে এই ঘটনার ব্যাখ্যাও চেয়েছে। এই ড্রোন হামলার নিন্দা জানিয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র বলেন, এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার উদ্যোগে এই হামলা যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের উভয় দেশের সদিচ্ছা এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ সহযোগিতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পাকিস্তানে মার্কিন ড্রোন হামলা বন্ধ না হলে ২০ নভেম্বর থেকে খাইবার পাখতুনখাওয়া অঞ্চল দিয়ে আফগানিস্তানে ন্যাটোর রসদ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছেন দেশটির আলোচিত রাজনীতিবিদ ইমরান খান। প্রদেশটির একটি পথ দিয়ে আফগানিস্তানে দায়িত্ব পালনরত ন্যাটোর রসদ সরবরাহ করা হয়। এই পথ বন্ধ করে দেয়া হলে তা ন্যাটোর জন্য বিপদ ডেকে আনবে। এদিকে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, তালেবানদের সাথে পাকিস্তান সরকারের আলোচনার বিষয়টি দেশটির আভ্যন্তরীণ বিষয়। মেহসুদের হত্যাকাণ্ডের পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরে মার্কিন কংগ্রেসম্যান মাইক রজার্স বলেন, মেহসুদ ছিলেন হিংস্র মানুষ। সম্প্রতি মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলার আশঙ্কায় আমরা উদ্বিগ্ন ছিলাম। মেহসুদ নিহত হওয়ার খবরে কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছি। আর মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ক্যাটলিন হেইডেন গত শনিবার বলেন, ওই ড্রোন হামলায় মার্কিন সরকার জড়িত কি না এবং মেহসুদ নিহত হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে তিনি কথা বলবেন না। তবে হেইডেন তখন বলেন, মেহসুদের নিহত হওয়ার বিষয়টি সত্যি হলে তা টিটিপির জন্য বড় এক আঘাত হবে। কঠোর হুঁশিয়ারি টিটিপির: জঙ্গি গোষ্ঠীর মুখপাত্র আজম তারিক বলেছেন, মেহসুদের প্রতিটি রক্তের ফোটা এক একজন আত্মঘাতী হামলাকারী তৈরি করবে। টিটিপি ঘোষণা দিয়েছে, এই হামলার সঙ্গে সরকারের যোগসাজশ রয়েছে এবং শিগগিরই সরকারি দলের নেতাদের ওপর হামলা করা হবে। তারা নওয়াজের সঙ্গে কোনো শান্তি আলোচনায় যাবে না বলেও ঘোষণা দিয়েছে। সরকার তাদের নিয়ে ‘ডাবল গেম’ খেলেছে উল্লেখ করে টিটিপির আরেক মুখপাত্র শহীদুল্লাহ শহীদ জানিয়েছেন, এর জন্য সরকারকে কঠিন ফল ভোগ করতে হবে। শহীদ বলেন, মেহসুদের নিহত হওয়া তালেবানের জন্য এক বিরাট ক্ষতি যার অভাব কোনোদিনও পূরণ হবে না। তার মৃত্যুর প্রতিশোধ হিসেবে তালেবানরা আরো আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে। মেহসুদবিহীন টিটিপি কেমন হবে: ২০০৭ সালে কট্টরপন্থী সংগঠন হিসেবে সক্রিয় হয় টিটিপি। ২০০৯ সালে মার্কিন ড্রোন হামলায় টিটিপির প্রতিষ্ঠাতা বায়তুল্লাহ মেহসুদ নিহত হন। অনেক পাকিস্তানিই মনে করেন, তালেবানকে সরকারের সঙ্গে আলোচনা থেকে বিরত রাখতেই মেহসুদকে হত্যা করা হলো। কয়েক সপ্তাহ আগে বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাত্কারে মেহসুদ বলেছিলেন, সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগে তার কোনো শর্ত থাকবে না। আলোচনায় বসে দাবি উত্থাপন করা হবে। অথচ এক সময় আলোচনার পক্ষে থাকার কারণে টিটিপির প্রভাবশালী অংশকে কোণঠাসা করে রেখেছিলেন মেহসুদ। ২০০৯ সালে ড্রোন হামলায় টিপিপির প্রতিষ্ঠাতা বায়তুল্লাহ মেহসুদ নিহত হওয়ার পর ওয়ালিউর রেহমান সংগঠনের প্রধান হওয়ার দৌড়ে ছিলেন। তবে মেহসুদ তাকে হারিয়ে নেতৃত্ব নিয়েছিলেন। এর আগে বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, খান সাইদ সরকারের সঙ্গে আলোচনার পক্ষে। মেহসুদ নিহত হওয়ার পর তেহরিক-ই-তালিবানের শুরা বা পরামর্শক পরিষদ বৃহস্পতিবার কট্টরপন্থী মোল্লা ফজলুল্লাহকে নেতা নির্বাচিত করে। হাকিমুল্লাহ মেহসুদের উত্তরাধিকারী হলেন তিনি। তিনি উপজাতি অধ্যুষিত সোয়াত উপত্যকার নেতা। এই ফজলুল্লাহর বাহিনীর সদস্যরাই গত বছর নারী শিক্ষা আন্দোলনের কর্মী মালালাকে গুলি করেছিল। তিনি পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনার ঘোর বিরোধী। বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে টিটিপির মুখপাত্র বিষয়টি স্বীকারও করেছেন। তালেবানের কাছে তিনি নিষ্ঠুর নেতা হিসেবে পরিচিত এবং ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি কঠোরতার সঙ্গে সোয়াত উপত্যকা শাসন করেন। পরে সেনাবাহিনীর অভিযানে তিনি পালিয়ে যান।