সৃষ্টির হাতে স্রষ্টার মৃত্যু!

সৃষ্টির আদিকাল থেকেই নব নব আবিষ্কারে মানবসভ্যতার অগ্রগতিকে বেগবান করেছে মানুষ। সভ্যতার উচ্চশিখরে পৌঁছাতে নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে সে। পৃথিবী নামক এই গ্রহের বাসিন্দাদের জীবনকে সুন্দর, স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে তার চেষ্টার অন্ত নেই। যুগে যুগে নানা দেশে আবির্ভূত হয়েছেন এমনই কিছু মেধাবী ও গুণী মানুষ যাদের উদ্ভাবিত বিভিন্ন যন্ত্র, প্রযুক্তি সভ্যতার অগ্রযাত্রার পথকে সুগম করেছে। তবে তাদের সেই সব চমকপ্রদ উদ্ভাবন মানবসভ্যতায় কতটুকু অবদান রাখতে পারলো তা দেখে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি উদ্ভাবকদের অনেকেরই। আজ এমনই ১১ জনের কথা তুলে ধরবো যারা তাদের উদ্ভাবিত যন্ত্রের কার্যকারিতা প্রমাণ করতে গিয়ে নিজ সৃষ্টির হাতেই মারা পড়েছেন। প্রিন্টিং প্রেস চালু করতে লাথি মেরে আহত পরে গ্যাংগ্রিনে মৃত্যু ১৮৬৩ সালে প্রিন্টিং ইন্ডাস্ট্রিতে বিপ্লব সৃষ্টিকারী রোটারি প্রিন্টিং প্রেসের উদ্ভাবক উইলিয়াম বুলক খুব বেশিদিন তার যন্ত্রের সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। ১৮৬৭ সালের ৩ এপ্রিল মার্কিন এই উদ্ভাবক তার সদ্য তৈরি একটি প্রিন্টিং যন্ত্র চালু করতে এর বেল্টে লাথি মেরে বসেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার। যন্ত্রে আটকে গিয়ে পা থেঁতলে যায় তার এবং পরে গ্যাংগ্রিনে মৃত্যু হয় এই গুণী মানুষটির। কাঠের পাখায় ওড়া হলো না তার এই পৃথিবীর বুকে মানুষের আবির্ভাবের পর থেকেই একটা স্বপ্ন তাকে তাড়া করে ফিরছিল। আর তা হলো মুক্ত আকাশে পাখির মতো ডানা মেলে উড়ে বেড়ানোর স্বপ্ন। সেই স্বপ্নসাধ পূরণ করতেই আজ থেকে হাজার বছর আগে কাঠের পাখা বানিয়ে তা কাঁধে চাপিয়ে ইরানের নিশাপুরে এক মসজিদের উঁচু ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়েছিলেন একজন। কিন্তু ওড়ার সাধ পূরণ হয়নি তার। মাটিতে আছড়ে পড়ে মারা যান আবু নাসের ইসমাইল ইবনে হাম্মাদ আল-জাওয়াহেরি নামে সেই স্বপ্নচারী দুঃসাহসী পুরুষ। সে সময় আরবি ভাষার অভিধান লিখে যথেষ্ট খ্যাতি লাভ করেন এই কাজাখ শিক্ষাবিদ। বেলুনে উড়তে গিয়ে মৃত্যু নাসেরের শূন্যে ওড়ার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর কেটে যায় অনেক বছর। ফ্রান্সের পদার্থ ও রসায়নশাস্ত্রের শিক্ষক জাঁ ফ্রান্সিস পিলাত্রে দ্য রোজে ১৭৮৫ সালের ১৫ জুন তার গ্যাস বেলুনে চড়ে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দুর্ঘটনাবশত বেলুনে আগুন ধরে গেলে সেটি মাটিতে আছড়ে পড়ে। মারা যান বেলুনের যাত্রী ফ্রান্সিস পিলাত্রে ও তার সঙ্গী পিয়েরে রোমেইন। অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে পানিতে ডুব পরে বিষক্রিয়ায় মৃত্যু ১৮৭৬ সাল। এবার আর বাতাস নয়, ডুবন্ত জাহাজের লোহা দিয়ে তৈরি সিলিন্ডারে ঘনীভূত অক্সিজেন ভরে পানিতে ডুব দেন হেনরি ফ্লস নামে এক ইংরেজ। চলে যান পানির ৩০ ফুট গভীরে। কিন্তু তিনি জানতেন না উচ্চ চাপে খাঁটি অক্সিজেন মানুষের জন্য বিষের কাজ করে। যথারীতি বিষক্রিয়ায় মারা যান হতভাগ্য ফ্লস। তবে নিজের জীবনের বিনিময়ে জীবনদায়ী অক্সিজেনের প্রাণঘাতী রূপটি মানবজাতিকে জানিয়ে দিয়ে যান। কয়েকবার উড়েও পরে ব্যর্থ অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিকে এসে জার্মানির অটো লিলেনথাল উদ্ভাবন করেন হালকা পাখাযুক্ত ওড়ার যন্ত্র- গ্লাইডার। কয়েকবার তিনি তার গ্লাইডারের সাহায্যে ২৫০ মিটার পর্যন্ত দূরত্ব অতিক্রমও করতে সক্ষম হন। বিপত্তি বাধলো চতুর্থ উড্ডয়ন প্রচেষ্টায়। উঁচু জায়গা থেকে ঝাঁপ দেয়ার পরমুহূর্তেই গ্লাইডারের কলকব্জায় গোলযোগ দেখা দিল। গতি রুদ্ধ হয়ে সেটি ১৫ মিটার উঁচু থেকে নিচে আছড়ে পড়লো। মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটলো লিলেনথালের। তবে তার আগে তিনি দেখিয়ে যেতে সক্ষম হলেন শূন্যে ওড়ার যন্ত্র নির্মাণের প্রাথমিক কলাকৌশল। যার পথ ধরে রাইট ভাতৃদ্বয় পরবর্তীতে নির্মাণ করলেন যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিপ্লব সৃষ্টিকারী আশ্চর্য বাহন- উড়োজাহাজ। ফ্লাইং ট্যাক্সির প্রথম টেস্ট ফ্লাইটেই বিপত্তি মাত্র কয়েক বছর আগের কথা। আধুনিক উড়োজাহাজ নির্মাণের পথিকৃতদের একজন, ব্রিটেনের অ্যাভকন লি:-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাইকেল ডাকার ২০০৯ সালের ১৬ আগস্ট তার আবিষ্কৃত উড়োজাহাজ ফ্লাইং ট্যাক্সির প্রথম পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন করেন। প্লেনটি চালাচ্ছিলেন তিনি নিজেই। মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের ১৫০ মাইল উত্তরে আসতেই প্লেনের কলকব্জায় গন্ডগোল দেখা দিল এবং মাটিতে পড়ে ধ্বংস হলো ফ্লাইং ট্যাক্সি, মৃত্যু ঘটলো এর স্রষ্টা মাইকেল ডাকারের (৫৩)। বাতাস ভর্তি সিলিন্ডার নিয়ে পানিতে ডুব পরে দম আটকে মৃত্যু ১৭৭২ সালে সিমুর ফ্রেমিনেট নামে এক ফরাসী সর্বপ্রথম তৈরি করেন পানির নিচে শ্বাস নেয়ার জন্য বাতাসভর্তি সিলিন্ডার, যেটা নিয়ে তিনি নিজেই ডুব দেন পানিতে। প্রথমে সবই ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু মিনিট বিশেক পর অক্সিজেনের অভাবে মারা পড়েন এই ফরাসী। তবে তার এই আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। সিমুরের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই পরবর্তীকালে তৈরি হয় ডুবুরিদের জন্য অক্সিজেন সিলিন্ডার। তরল জ্বালানিভরা রকেট ইঞ্জিনযুক্ত গাড়ি চালাতে গিয়ে উদ্ভাবকের মৃত্যু রকেট ইঞ্জিনযুক্ত গাড়ির উদ্ভাবক ম্যাক্স ভ্যালিয়ের নামে এক অস্ট্রিয়ান ১৯৩০ সালের ৩০ মে তার নির্মিত গাড়িতে অ্যালকোহল জ্বালানি ভরে পরীক্ষামূলকভাবে সেটি চালাতে গেলে ঘটে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। সাথে সাথে মারা যান ভ্যালিয়ের। প্যারাস্যুট নিয়ে আইফেল টাওয়ার থেকে লাফ এবং মৃত্যু ফ্রাঞ্জ রিসেল্ট নামে অস্ট্রিয়া বংশোদ্ভূত ফরাসী এই দর্জি লোকজনের জন্য কাপড় সেলাই করতে করতে হঠাত্ প্যারাস্যুট বানানোর মতলব ফেঁদে বসেন। বানিয়েও ফেলেন অদ্ভুত ডিজাইনের এক প্যারাস্যুট। ১৯১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ফ্রান্সের আইফেল টাওয়ারের উপর থেকে সেই প্যারাস্যুট নিয়ে ঝাঁপ দেন তিনি। এই দুঃসাহসিক কাণ্ডে তার মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটলেও প্যারাস্যুট নামের সেই প্রয়োজনীয় বস্তুটি তৈরির প্রাথমিক কলাকৌশল তিনিই শিখিয়ে দিয়ে যান। ব্যারেলে ঢুকে জলপ্রপাতে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যু কানাডার পেশাদার স্টান্টম্যান ক্যারেল শসেক আঘাত সহনীয় ব্যারেল ‘দ্য ক্যাপসুল’ উদ্ভাবনের জন্য যতটা না বিখ্যাত ছিলেন, সেই ক্যাপসুলে ঢুকে নায়াগ্রা জলপ্রপাতের চূড়া থেকে পানিতে পড়ার খেলা দেখানোর জন্য বেশি নাম কুড়িয়েছিলেন। কিন্তু এই নামই তার কাল হয়ে দেখা দিল। ১৯৮৫ সালে আমেরিকার টেক্সাসে তার খেলা দেখাতে বিশেষভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল ১৮০ ফুট উঁচু একটি কৃত্রিম জলপ্রপাত। শসেক তার ‘ক্যাপসুলে’ ঢুকলে ব্যারেলটি ফেলে দেয়া হয় জলপ্রপাতের চূড়া থেকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত পানির মাঝখানে না পড়ে ব্যারেলটি পড়ে পাশের শক্ত রীমে। আর এতে গুরুতর আহত হয়ে মারা যান শসেক। পানির নিচে আটকে গেল হস্তচালিত সাবমেরিন, মারা গেলেন উদ্ভাবক মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হোরেস লসন হানলি (৪০) ১৮৬৩ সালের ১৫ অক্টোবর তার উদ্ভাবিত হস্তচালিত সাবমেরিন নিয়ে নেমেছিলেন চার্লসটন বন্দরের নিকটবর্তী সাগরতলে। কিন্তু এক দুর্ঘটনায় পানির নিচে আটকে যান তিনি, মারা যান দম আটকে।