ইংলাকের হিসাবে ভুল

ফের থাই বিক্ষোভের ঢেউ

টানা কয়েক সপ্তাহের ‘শীতলতার’ পর হঠাত্ করে গরম হয়ে উঠেছে থাইল্যান্ডের রাজনৈতিক পরিবেশ। কারণ, গত এক দশকে থাইল্যান্ডে যে রাজনৈতিক অপরাধ হয়েছে তা থেকে রাজনীতিবিদদের ক্ষমা করে দেয়া একটি বিল পাসের জন্য উত্থাপন করেছে সরকার। বিরোধীরা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার ভাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রাকে দেশে ফেরানোর জন্য সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে। কারণ বিলটি আইনে পরিণত হলে ক্ষমতায় থাকাকালীন সব অভিযোগ থেকে রেহাই পাবেন থাকসিন। ফলে জেলের ঘানি টানার ভয় না করেই তিনি দেশে ফিরতে পারবেন। পারবেন রাজনীতিতে আবারো সক্রিয় হতে। ভাইয়ের জন্য বোন রাজনৈতিক চালাকি শুরু করেছেন বলে তাদের ধারণা। এই ‘চালাকির’ ফলও প্রধানমন্ত্রী ইংলাক পেয়েছেন সাথে সাথে। দেশব্যাপী সমালোচনার পাশাপাশি তুমুল বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। বিলটির প্রতিবাদে লাখো জনতা নেমে এসেছে রাজপথে। প্রথমে শয়ে শয়ে, পরে হাজারে হাজারে। কয়েকদিনের মধ্যেই বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা লাখ ছুঁয়ে যায়। ফলে ব্যাংককে গভর্নমেন্ট হাউসে প্রবেশের পথে মোতায়েন করতে হয় দাঙ্গা পুলিশ। হাউস ঘিরতে হয়েছে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে। তীব্র আন্দোলন শুরু হয়েছে এই বিলের প্রতিবাদে। বিক্ষোভকারীরা বলছে, প্রধানমন্ত্রীর দল পিউ থাই পার্টি এ বিলের মাধ্যমে ২০০৪ সাল থেকে যেসব রাজনৈতিক অপরাধ হয়েছে তা থেকে সব অভিযুক্ত নেতাকে মুক্তি দেয়া হবে। এই সুযোগের মধ্যে পড়বেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা। তবে প্রধানমন্ত্রী কিছুটা কৌশলী ছিলেন যাতে সাধারণ মানুষ টের না পায় বিলটি কি উদ্দেশ্যে পাস করা হচ্ছে। বিলটিতে এমনভাবে ভাষার ব্যবহার করা হয়েছে যাতে মনে হতে পারে রাজনৈতিক ঘটনায় অভিযুক্ত বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের ফের রাজনীতিতে সক্রিয় হবার সুযোগ দিতে বিলটি প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করলে বোঝা যাবে এর একমাত্র উদ্দেশ্য সিনাওয়াত্রার বিরুদ্ধে থাকা দুর্নীতির ও রাজনৈতিক অপরাধের সব অভিযোগ প্রত্যাহার করে তাকে রাজনীতিতে পুনবার্সিত করা। বিরোধীদের দাবি, স্বেচ্ছায় নির্বাসিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রাকে দেশে ফেরার সুযোগ দিতেই এই বিল পাস করা হয়েছে। এই বিল পাসের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে নেমেছে হাজার হাজার মানুষ। তবে নিম্নকক্ষে পাস হওয়া বিলটি চূড়ান্ত করতে পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের অনুমোদন লাগবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার ভাই থাকসিন ২০০৬ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন। দুর্নীতির অভিযোগ থেকে রেহাই পেতে ২০০৮ সাল থেকেই তিনি বিদেশে অবস্থান করছেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী হন তার বোন ইংলাক সিনাওয়াত্রা। ইংলাক প্রধানমন্ত্রী হবার পর তেমন বড় কোনো বিক্ষোভ দেখার দুর্ভাগ্য তার হয়নি। সেই কারণে হয়তো বিরোধী দলকে একটু বেশি তাচ্ছিল্য করে ফেলেছিলেন তিনি। তার হিসাবে বড় ধরনের ভুল হয়ে গেছে। তিনি ভাবতেই পারেননি যে এই বিল পার্লামেন্টে তুললে এত বড় বিক্ষোভ শুরু হবে। বিলটি আইনে পরিণত হলে ২০০৮ সালে ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে সিনাওয়াত্রা যে দোষী সাব্যস্ত ও সাজাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন তা থেকে অব্যাহতি পাবেন। এছাড়া ২০১০ সালে বিক্ষোভকারীদের উপর সেনাবাহিনীকে গুলিবর্ষণের নির্দেশ দেয়ার অভিযোগ থেকেও নিষ্কৃতি পাবেন তিনি। এর বাইরে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা ২৫ হাজার ৩৩১টি মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মাত্র একজন ব্যক্তিকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ২৫ হাজারের বেশি দুর্নীতিবাজকে মুক্তির সুযোগ করে দেয়া বুদ্ধিমান সরকারের কাজ হতে পারে না। একারণেই প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়তো ইংলাকের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিলটি পার্লামেন্টে উত্থাপনের সাথে সাথে রাজপথে নেমে আসে বিরোধী দলীয় সমর্থকরা ছাড়াও শিক্ষাবিদ, বিচারপতি, চিকিত্সক, নার্স, ছাত্র, অফিস কর্মী থেকে শুরু করে পরিবহন শ্রমিকরা পর্যন্ত। বিষয়টি নিয়ে থাইল্যান্ড জুড়ে চায়ের কাপে ঝড় বইছে। এমনকি থাকসিনের পক্ষে এক সময়ে বিক্ষোভে অংশ নেয়া অগণিত লোক এই গণহারে দুর্নীতিবাজদের দায়মুক্তির বিরোধিতা করছেন। তবে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা। তিনি বলেছেন, দেশে দুর্নীতির চাষাবাদ করার কোনো ইচ্ছা তার নেই। গণহারে দুর্নীতির মামলা প্রত্যাহারের জন্য নয়, এই বিল আনা হয়েছে বিভিন্ন দল-মতের রাজনীতিকরা যাতে পুরাতন বিভেদ ভুলে গিয়ে একত্রে দেশের জন্য কাজ করতে পারে। তবে তার এই হাল্কা যুক্তি কেউ গিলতে রাজি হয়নি। বিক্ষোভ আরো জোরালো হয়েছে। নির্বাচনে পরাজিত হওয়া ডেমোক্র্যাটরা এই সুযোগে একটু হালে পানি পেয়েছেন। রোদ থাকতে থাকতে খড় শুকিয়ে নিতে তারাও জোরোসোরে সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছেন।