রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব কাঁচা বাজারে
প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০১৩, ২২:২৫
দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার বিরূপ প্রভাব পড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাজারে। লাগামহীনভাবে বাড়ছে খাদ্যপণ্যের দাম। ফলে কষ্ট বাড়ছে স্বল্প আয়ের মানুষের।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, হরতালের কারণে পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হয়। বন্দর থেকে ঠিকমত পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে পণ্য সরবরাহে বিপর্যয় নেমে আসবে। গতকাল রবিবার রাজধানীর বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা বাজারে সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সবজি ও মাছসহ বিভিন্ন কাঁচাপণ্যের দাম বেড়েছে অত্যধিক। চালের দাম কেজিতে বেড়েছে ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য মতে, হরতালের কারণে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। অক্টোবর মাসে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ, যা সেপ্টেম্বরে ছিল ৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ। পরিসংসখ্যান ব্যুরোর মহাপরিচালক গোলাম মোস্তফা কামাল গতকাল এক সাংবাদিক সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়ে বলেন, মূলত হরতালের প্রভাবেই সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরে খাদ্যমূল্য বেড়েছে। যদি রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি না হয় তাহলে চাল, ডালসহ অন্যান্য খাদ্য পণ্যের দাম বেড়ে যাবে।
গতকাল খুচরা বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ৩০ টাকা কেজির নিচে কোন সবজি নেই। বাজারভেদে ঢেঁড়স ও বরবটি বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজি। এছাড়া অন্যান্য সবজির মধ্যে পটল ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, করলা ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, মূলা ৩০ থেকে ৩২ টাকা, টমেটো ১০০ থেকে ১২০ টাকা, শিম ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, ফুলকপি ও বাঁধাকপি প্রতিটি আকারভেদে ৩০ থেকে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আলু বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২২ টাকা কেজি দরে। অথচ এক সপ্তাহ আগেও প্রতিকেজি আলুর দাম ছিল ১৫ থেকে ১৬ টাকা।
হরতালের কারণে পিঁয়াজের ঝাঁজ আরো বেড়েছে। পাশাপাশি ঝাল বেড়েছে কাঁচা মরিচের। গতকাল বাজারে প্রতিকেজি কাঁচা মরিচ বিক্রি হয়েছে ১১০ থেকে ১২০ টাকায়। এছাড়া প্রতিকেজি দেশি পিঁয়াজ ১১০ টাকা ও আমদানিকৃত পিঁয়াজ ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে নিউমার্কেটের সবজি ব্যবসায়ী লোকমান হাকিম বলেন, হরতালের কারণে চাহিদা মতো সরবরাহ নেই। এছাড়া যানবাহনের ভাড়াও বেশি।
তিনি বলেন, অন্যান্য সময় কাওরানবাজার থেকে নিউমার্কেটে সবজি আনতে ভ্যানভাড়া লাগে সাড়ে ৩’শ থেকে ৪’শ টাকা। হরতালের কারণে এই ভাড়া দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এই বাড়তি ভাড়া তো সবজির দামের সাথে তুলতে হবে! প্রতিকেজি সবজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে বলে তিনি জানান।
এ প্রসঙ্গে কাওরানবাজার ক্ষুদ্র আড়তদার সমবায় সমিতির সভাপতি এটিএম ফারুক গতকাল বলেন, চাহিদা মতো সরবরাহ না থাকলে দাম বাড়বে—এটাই স্বাভাবিক। প্রতিদিন কাওরানবাজারে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৮’শ থেকে ১ হাজার পণ্যবাহী ট্রাক আসে। কিন্তু হরতালের কারণে কয়টি ট্রাক আসছে? ১শ’-এর বেশি হবে না। শুধু রাজধানীর আশপাশে থেকে যে পণ্য আসছে তাই দিয়ে চলছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে দাম আরো বাড়বে। একইকথা জানিয়েছেন, ঢাকা মহানগর মাছ ও কাঁচাবাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আনোয়ার হোসেন শিকদার। তিনি বলেন, হরতালের কারণে সবজির পাশাপাশি মাছের দামও বেড়েছে।
গতকাল বাজারে কাতল ও রুই আকারভেদে ২২০ থেকে ৩০০ টাকা, কৈ ১৪০ থেকে ১৯০ টাকা, শিং ৬০০ থেকে ৭৫০ টাকা, পাঙ্গাস আকারভেদে ১২০ থেকে ১৬০ টাকা, তেলাপিয়া ১২০ থেকে ১৫০ টাকা, বড় আকারের মাগুর ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। এসব মাছ হারতালের আগে প্রতিকেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা কমে বিক্রি হয়েছে। এদিকে গত কিছুদিন ধরে ইলিশের দাম কম থাকলেও এখন বাড়ছে বাঙ্গালির প্রিয় এই মাছটির দামও। গতকাল ৭শ’ থেকে ৮শ’ গ্রাম ওজনের একটি ইলিশ বিক্রি হয়েছে ৭শ’ থেকে ৭শ’ ৫০ টাকা দরে। যা ১৫ থেকে ২০ দিন আগেও ৫শ’ টাকায় পাওয়া গেছে। এছাড়া বাজারে ফার্মের ডিমের হালি ২৮ টাকা ও ব্রয়লার মুরগি ১২০ থেকে ১৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। যা গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে ৫ টাকা বেশি।
দাম বেড়েছে চালেরও। গতকাল খুচরা বাজারে নাজিরশাইল/মিনিকেট ৩৮ থেকে ৫৬ টাকা, পাইজাম/লতা ৩৮ থেকে ৪২ টাকা ও মোটা চাল স্বর্ণা ৩৪ থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। যা সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেশি।
চালের দাম বাড়া প্রসঙ্গে রাজধানীর চালের পাইকারি বাজার বাবুবাজারের চাল ব্যবসায়ী হাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, হরতালে পরিবহন সংকটে চালের দাম কিছুটা বাড়তি। তবে গত বছরের এই সময়ের তুলনায় এবার সব ধরনের চালের দামই অনেক বেশি। দাম কেন বেশি? জানতে চাইলে এই চাল ব্যবসায়ী বলেন, মোকামের ব্যবসায়ীরা বলেছেন, ধানের দাম বেশি তাই চালের দামও বাড়তি। এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, একশ্রেণির চাল ব্যবসায়ী দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতাকে পুঁজি করে চালের দাম বাড়াচ্ছে। তারা মনে করছে, সরকার এখন রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচনসহ বিভিন্ন কারণে বাজারে মনোযোগ দিতে পারবে না। ফলে তারা ইচ্ছেমতো দাম বাড়াচ্ছে বলে এই সূত্র জানিয়েছে।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, হরতালের কারণে ভরা মৌসুমেও নগরীর কাঁচা বাজারগুলোতে শাক-সবজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ৬০ টাকার নিচে কোন সবজি পাওয়া যাচ্ছে না। মাছের দামও কেজিতে ৫০ থেকে ৬০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। কাঁচা বাজারগুলোতে দেখা গেছে, ফুলকপি কেজি ৭০/৮০ টাকা, বাঁধাকপি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, বরবটি ৮০ টাকা, শিম ১০০ থেকে ১২০ টাকা, মূলা ৬০ টাকা, আলু ২০ থেকে ২৫ টাকা, ঢেঁড়স ৭০ টাকা, করলা ৭০ টাকা, বেগুন ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা জানান, হরতালে পাইকারি বাজার থেকে পণ্য আনা যাচ্ছে না। অথচ পাইকারি বাজারগুলোতে প্রচুর সবজির স্তূপ পড়ে রয়েছে।
সবজি চাষিদের মাথায় হাত
আমাদের রংপুর প্রতিনিধি জানান, হরতালের কারণে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে সবজি পাঠাতে না পেরে চাষিদের মাথায় হাত। রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও রংপুর সদর উপজেলার সদ্যপুস্করীনি ইউনিয়ন থেকে যেখানে প্রতিদিন ট্রাকে ট্রাকে সবজি রাজধানী ঢাকা, সিলেট ও বিভিন্ন জেলা শহরে যেত, হরতালের কারণে সেই সবজি পাঠাতে না পারায় পচে যাচ্ছে। নতুন উত্পাদিত পিঁয়াজও পচতে শুরু করেছে। শীতের সবজির ওপর ভিত্তি করে এ অঞ্চলের কয়েক লাখ চাষি তাদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। কিন্তু এবার হরতালের কারণে তারা সবজি চাষ করে চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন।
বগুড়া প্রতিনিধি জানান, লাগাতার হরতালের কারণে সবজি এখন বগুড়ার চাষিদের গলার ফাঁস হিসেবে দেখা দিয়েছে। পাইকাররা হাটে আসেন না। হরতালের কারণে কাঁচামাল নিয়ে ট্রাক রাজধানীতে যাচ্ছে না। ফলে লোকসানের মুখে পড়ছেন এ অঞ্চলের সবজি চাষিরা। নামমাত্র মূল্যেও কৃষক তার উত্পাদিত সবজি বিক্রি করতে পারছেন না। টানা ৮৪ ঘন্টার হরতালের কারণে নিজের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে মহাস্থান হাটের শ্রমিক মজনু বলেন ‘হ্যামাগেরে (আমাদের) কথা কেই ভাবে না । এত হরতাল দিলে জীবন চলবি ক্যাংকা করে ( কেমন করে)। বউ ছোল নিয়ে দিন কাটানোই কঠিন হয়ে দাঁড়াছে।’
গতকাল রবিবার উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহত্ ব্যস্ততম মহাস্থান হাট ছিলো ফাঁকা। অসহায় কৃষক ভ্যানে করে কিংবা নিজের ঘাড়ে করে অল্প কিছু সবজি নিয়ে হাটে এসে সারাদিন বসে থেকেও কোন ক্রেতা পাননি।
নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, হরতালের কারণে ট্রাক চালকরা ঝুঁকি নিয়ে শাক-সবজি পরিবহন করতে রাজি হচ্ছে না। ফলে স্থানীয় বাজারগুলোতে সবজি এনে বিপাকে পড়ছেন চাষিরা। ক্রেতা পাচ্ছেন না তারা।
রাজশাহী অফিস জানায়, স্থানীয় পাইকারি হাট ও বাজারে সবজির ক্রেতা নেই। ফলে পানির দামে সবজি কৃষকরা তাদের সবজি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।