ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হল

যেভাবে সময় পার

উচ্চশিক্ষার জন্য নিজের স্বপ্নের গ্রাম ও আপন মানুষদের ছেড়ে আসা হূদয় ছেঁড়ার মতই কষ্টের। কিন্তু হলের বন্ধুদের সাথে কষ্টের ভাগাভগি ও ভালোবাসার মাখামাখি করে এক পারিবারিক হূদ্যতা তৈরি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাষ্টার দা সূর্য সেন হলের শিক্ষার্থীরা। হল জীবন নিয়ে কথা হচ্ছিল তাদের সাথে। দর্শন বিভাগের ৩য় বর্ষের ছাত্র গোলাম সরোয়ার বলেন, ছোটবেলা থেকেই মা-বাবার নজরে বেড়ে ওঠা। তাই নিজের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়নি। সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে ছিল অনেক সীমাবদ্ধতা। এখন বসবাস পরিবার থেকে বহু দূরে। এখন খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে ভাবতে হয় নিজেকে। ভবিষ্যত্ ক্যারিয়ারের ভাবনাটাও বেশ গুরুত্ব পায় এ সময়। সব কিছু নিয়ে বন্ধুর সঙ্গে হলের প্রত্যাহিক জীবন উচ্ছলতার সাথেই পার করছি। সমাজকল্যাণ বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আহমেদ ইমতিয়াজ অমিত জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর অনেক শিক্ষার্থীর হল জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো রকমারি টাইপের। কারো রয়েছে তিক্ত অভিজ্ঞতা কারো আবার বেশ মজার। হলের বাইরে কিংবা ঢাকায় যাদের বাসা তারা এসব বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত। হল জীবন অনেক কষ্টের ভেবে বাইরে থাকেন অনেকে। বাসায় থাকলে পরিবারের সুবিধাগুলো পাওয়া যায় খুব অনায়াসে। নিজের ওপর দায়িত্বের বোঝাও অনেকটা হাল্কা লাগে। মো. সজীব হোসাইন। ব্যাংকিং ২য় বর্ষ। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বারন্দায় সবাই চায় একাকিত্ব দূর করতে। এজন্য বিভিন্ন জেলার ছাত্র কল্যাণ সমিতির ব্যানারে নিজেকে যুক্ত করেন। কেউ আবার পড়াশোনার ফাঁকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে কাজ করে অবসর সময় কাটান। বিকালের টিএসসি, ক্যাফেটেরিয়া, অপরাজেয় বাংলা এসব স্থানেই বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় ব্যস্ত সময় কাটান শিক্ষার্থীরা। হলের সঙ্গে টিএসসি, অডিটোরিয়াম ও মুক্তমঞ্চ যেন একই সুতোয় গাঁথা। এ জন্য স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারি। সমাজকল্যাণ বিভাগের ছাত্র মশিউর রহমান জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কিছুদিন পরেই হলে উঠি। শুরুতে মন কেমন যেন ছটফট করত। হলে একদম ভালো লাগত না। সারাক্ষণ ইচ্ছে হতো বাড়ি চলে যাই। আশায় থাকতাম কখন ছুটি হয়। যে কোনো ছুটি পেলেই বাসায় চলে যেতাম। এখন অবশ্য তেমনটা মনে হয় না। সবার সাথে ভালো সম্পর্ক হয়েছে। তাই আর কষ্ট মনে হয় না। এস. এম. তামিম ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র। তিনি তার অনুভূতি ব্যক্ত করেন এভাবে, একই রুমে বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীরা থাকে। কখনো কোনো সমস্যা হয় না। একসঙ্গে থাকতে-থাকতে একটা আন্তরিকতা চলে আসে। বড় ভাই ছোট ভাই সবাই এক বন্ধু হয়ে যায়। কখনো কখনো সম্পর্কটা গভীরে পৌঁছে যায়। তখন মনে হয় সবাই এক পরিবারের সদস্য। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র বেনজির আহমেদ বলেন, যেদিন আমি প্রথম হলে আসলাম, আমার সাথে ছিল বাবা। যে রুমে প্রাথমিক ভাবে আমাদের থাকতে দেয়া হল, তার দুরবস্থা দেখে বাবা হলের কেরানিকে স্বভাবসুলভ ঝাড়ি দিয়ে বসল। আমি রুমে বসে বসে দেখছি একটা একটা করে ছেলে ঢুকছে আর একটা একটা করে রুম ভর্তি হয়ে যাচ্ছে। কেউ কাউকে চিনি না। কিন্তু এখন সবাই সবার অতি আপন, পরম প্রিয়জন। বাধাহীন জীবন। মা-বাবার কড়া শাসন নেই। পাড়া-পড়শীর বাঁকা চাউনি নেই। তাই হলের ছেলেরা নিজেদের মতো করে দিনযাপন করতে পারেন। এক কথায় স্বাধীন। একটা স্বাধীন জীবন। স্বপ্নময় একটা জীবন।