হুমায়ূন আহমেদ
জনপ্রিয় ঔপন্যাসিকের প্রতিকৃতি
প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০১৩, ১৯:৩১
পাঠকপ্রিয়তাই জনপ্রিয়তা। কিন্তু জনপ্রিয়তা কি নান্দনিকতার শত্রু? শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে এর মীমাংসা খুব সহজ নয়। এ কারণেই মার্কসীয় ভাবুক আন্তোনিও গ্রামসিকেও বলতে শুনি, জনপ্রিয় সংস্কৃতি হচ্ছে জাতীয় সংস্কৃতি। কেননা, জনপ্রিয়তার সঙ্গে জনসংস্কৃতির একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ফলে জনসংস্কৃতিকে উপলব্ধি করতে না পারলে বিপ্লবের স্বপ্নও সুদূর পরাহত থেকে যায় (‘সিলেকসন্স ফ্রম কালচারাল রাইটিংস’)। শুধু গ্রামসি নন, জনপ্রিয় সংস্কৃতির প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছিলেন ফ্রাঙ্কফুর্ট বুধমণ্ডলীর শীর্ষভাবুক ভাল্টার বেনিয়ামিন। এমনকি হালের প্রভাবশালী চিন্তক স্লাভো জিজেক পর্যন্ত এই জনপ্রিয় সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে পুনর্বিবেচনা করে দেখিয়েছেন লাকাঁনীয় মনোবিশ্লেষণের মহিমা (‘লুকিং অরি অ্যান ইনট্রোডাকশন টু জাক লাকাঁ থ্রু পপুলার কালচার’)। হুমায়ূন আহমেদের কথা মনে পড়লে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে এরকমই এক ‘জনপ্রিয়’ ঔপন্যাসিকের মুখ, জনসংস্কৃতিকে যিনি তাঁর লেখালেখি, নাট্যচর্চা আর চলচ্চিত্রচর্চার কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
‘জনপ্রিয়’ এই কথাটির সাধারণ অর্থ হচ্ছে জননন্দিত হওয়া। অসংখ্য মানুষের হূদয়কে যা ছুঁয়ে যায়, সমাদর পায়, তাকেই আমরা জনপ্রিয় আখ্যা দিয়ে থাকি। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসও বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তিনি কিংবদন্তিতুল্য জননন্দিত ঔপন্যাসিকের মর্যাদা লাভ করেছেন। এই জনপ্রিয়তা যাঁরা অর্জন করেন, অনেকের ধারণা, শিল্পের নান্দনিক দিকটা ক্ষুণ্ন হলেই কেবল তা অর্জন করা সম্ভব। একারণেই জনপ্রিয়তাকে মহত্ উপন্যাসের মানদণ্ড বলে অনেকেই স্বীকার করতে চান না। এরই প্রেক্ষাপটে উপন্যাসের শ্রেণীকরণও করা হয়েছে দুদিক থেকে : শিল্পগুণসম্পন্ন উপন্যাসকে বলা হয় ‘সাহিত্যিক (লিটের্যারি) উপন্যাস’ আর জননন্দিত উপন্যাসকে ‘জনপ্রিয় (পপুলার) উপন্যাস’। প্রথম শ্রেণীর উপন্যাস মানুষের মনোরঞ্জনের জন্যে লেখা হয় আর দ্বিতীয় শ্রেণীর উপন্যাসে থাকে গভীর জটিল জীবনের কথা। কিন্তু এরকম প্রশ্নওতো কেউ কেউ তুলেছেন, পাঠক যদি কোনো লেখাকে গ্রহণ না করেন, তাহলে তো প্রথমেই লেখক পঙিক্ততে তার স্থান হলো না। পাঠকের কাছে লেখক পদবাচ্য হবার যোগ্যতাই যিনি অর্জন করলেন না, লেখকই যিনি হয়ে উঠলেন না, তার লেখা কতটা মহত্ হলো কী হলো না, তাতে কী আসে যায়! পাঠকের জন্যেই তো লেখালেখি, এই দিকটিও কি লেখকের পক্ষে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব? ফলে লেখকের পাঠক চাই-ই চাই, সে স্বল্প হোক কিংবা অসংখ্য। হুমায়ূন আহমেদের কৃতিত্ব হচ্ছে—তিনি শুধু অসংখ্য নয়, লক্ষ পাঠকের হূদয় জয় করেছিলেন। তাঁর লেখাকে তাই কেউ কেউ হয়তো অগ্রাহ্য করতে পারেন, কিন্তু উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
গ্রামসি জনপ্রিয় সাহিত্যের কথা বলতে গিয়ে দুটি পরিভাষা ব্যবহার করেছিলেন—‘জাতীয়-জনপ্রিয়’ (ন্যাশনাল-পপুলার)। তিনি ভেবেছিলেন, সেই লেখাই জাতীয় হয়ে ওঠে যা জনপ্রিয়তা পায়। বিস্ময়কর হলেও সত্যি, হুমায়ূন আহমেদ একরকম জনপ্রিয় সাহিত্য রচনার দিকেই ঝুঁকেছিলেন। জাতির দৃষ্টিও বার বার আকৃষ্ট হয়েছে তাঁর উপন্যাস কিংবা নাটকের প্রতি। প্রবাদতুল্য তাঁর সেই ‘তুই রাজাকার’ কথাটিতো একসময় জাতীয় বুলি হয়ে উঠেছিল। জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন না ঘটলে তা জাতীয় বুলি হয়ে উঠবার অবকাশ ছিল না। সম্প্রতি ‘দেয়াল’ উপন্যাস রচনার সূচনাংশ প্রকাশ করে তিনি আবার জাতির যৌথ ট্র্যাজিক স্মৃতিকে যেভাবে উস্কে দিয়েছেন, তাতে ঔপন্যাসিক হিসেবে তাঁর অভিঘাত যে আমাদের গভীরভাবে আন্দোলিত করেছে, প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তা আমরা অনুভব করেছি।
সম্প্রতি জনপ্রিয় সাহিত্য নিয়ে দুজন সমালোচক নানা ধরনের ঐতিহাসিক-তাত্ত্বিক আলোচনা করছেন। এদের একজন জন সাদারল্যান্ড, অন্যজন ক্লাইভ ব্লুম (দ্রষ্টব্য ‘পপুলার ফিকশন দ্য লজিক্স্ অ্যান্ড প্র্যাকটিসেস অফ আ লিটের্যারি ফিল্ড’)। সাদারল্যান্ডের মতে পশ্চিমে সেই লেখকই জনপ্রিয় অভিধা পেয়ে থাকেন যাঁর লেখা বেস্টসেলারের তালিকায় স্থান পায়। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে সালমান রুশদি, জোসেফ হেলার, নরমান মেইলার, এমনকি টলস্টয়, ডি এইচ লরেন্সকে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। তিনি আরও পিছিয়ে উল্লেখ করেছেন, শেক্সপীয়রও তো তাঁর কালের জনপ্রিয় লেখক-নাট্যকার ছিলেন। জনপ্রিয় বলে তাঁদের লেখায় শিল্পগুণের অনুপস্থিতি ঘটেছে, এরকমভাবে কোনো লেখকের মহিমাকে কি খাটো করে দেখা সম্ভব? এসব দিক থেকে বিবেচনা করলে জনপ্রিয়তা আসলে একধরনের প্রক্রিয়া মাত্র। পাঠকের কাছে নিজের লেখাকে জনপ্রিয় করে তুলবার জন্যেই লেখক শৈলীগত বা ভাষাগত কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকেন যার সূত্র ধরে তিনি পাঠকের কাছে পৌঁছুতে চান। হুমায়ূনও, আমার মনে হয়, এই প্রক্রিয়াটিই অবলম্বন করেছিলেন। তিনি একই সঙ্গে রচনা করেছিলেন ‘জনপ্রিয়’ এবং ‘সাহিত্যিক’ উপন্যাস। হিমু ও মিসির আলি সিরিজকে যদি জনপ্রিয় বলে আখ্যায়িত করি, তাহলে ‘নন্দিত নরকে’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘জ্যোত্স্না ও জননীর গল্প’, ‘মধ্যাহ্ন’ এইসব উপন্যাসকে নিঃসন্দেহে সাহিত্যিক বা জীবনধর্মী গভীর উপন্যাস বলে চিহ্নিত করতে পারি।
নিজের রচনাকে জনপ্রিয় করে তুলবার কলাকৌশল হুমায়ূন আহমেদ বেশ ভালোভাবেই রপ্ত করেছিলেন। তুঙ্গস্পর্শী সাফল্যও পেয়েছিলেন তিনি। জনপ্রিয় উপন্যাসের অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণের সূত্রে কী হতে পারে সেই কৌশল, তারও হদিশ মিলবে সহজেই। জনপ্রিয় উপন্যাস লিখছেন এরকম একজন লেখক বলেছেন, জনপ্রিয় লেখায় যা প্রাধান্য পায় তা হলো—খুবই স্পষ্ট পরিচ্ছন্ন একটা গল্প, যে-কোনো একটি বা দুটি প্রধান চরিত্রের উপস্থিতি; নায়ক বা প্রধান চরিত্রের স্পষ্ট একমুখী লক্ষ্য—এই চরিত্রের প্রধান চালিকাশক্তি হবে প্রেম, মমত্ববোধ, কৌতূহল, আত্মবিশ্বাস, আত্মঅহমিকা, কর্তব্য পরায়ণতা, দায়িত্ববোধ; নানা ধরনের কর্মতত্পরতা; গল্পটি গড়ে উঠবে বর্ণিল জমকালো পটভূমির ওপর, বর্তমান ও ভবিষ্যেক ছুঁয়ে সম্পূর্ণতা পাবে এর কাহিনি। লক্ষ করলে দেখা যাবে, হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাসগুলো এই সব বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। খুব সহজেই তিনি জননন্দিত হতে পেরেছেন।
দুই
বাংলা সাহিত্যের কথা ভাবলে বাংলা উপন্যাসের বিকাশ ঘটেছে মূলত পশ্চিমবঙ্গে। গত শতকের চল্লিশের দশক থেকে বিকশিত সাহিত্যের এই ধারাটি ওই শতকের শেষের দিকে এসে উত্কর্ষের শিখর স্পর্শ করে। বাংলাদেশেও এর বিকাশ ঘটেছে, তবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা সাহিত্যের এই শাখাটি বাংলাদেশে তেমন পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের আবির্ভাবের পর এই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকে। পশ্চিমবঙ্গের উপন্যাস যে বাংলাদেশের উপন্যাস নয়, হুমায়ূনের সূত্রেই বাংলাদেশের পাঠকেরা সেকথা উপলব্ধি করতে শুরু করেন। উপন্যাস দেশকাল আর জনজীবন সম্পৃক্ত হলে যে পাঠক তা সহজেই পড়তে উদ্বুদ্ধ হন, নিজের কথা নিজের কাহিনি গল্পে-উপন্যাসে উপস্থাপিত হলে যে পাঠক তা সানন্দে গ্রহণ করেন, হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের সূত্র ধরে তারই পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটেছে। এসব দিক থেকে ভাবলে বাংলা সাহিত্যে, বিশেষ করে বাংলাদেশের সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদের অবদান আজ অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের পাঠকের যে বাংলাদেশের পটভূমিতে নির্মিত কাহিনিপাঠের ক্ষুধা আছে, হুমায়ূন আহমেদই সেটা প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছেন। তিনি প্রায় এককভাবে বাংলাদেশে পাঠক সৃষ্টি করেছেন।
কথাটা বোধ হয় এভাবে নয়, বলা দরকার, পাঠক এদেশে ছিলই, তিনি শুধু তাঁর লেখালেখি দিয়ে সেই পাঠককে উপন্যাসের দিকে টেনে এনেছেন। কাহিনিপাঠে উদ্বুদ্ধ করেছেন। হুমায়ূনের অবদান এক্ষেত্রে প্রায় একক, অর্থাত্ তিনি প্রায় একাই বাংলাদেশের পাঠক তৈরি করে দিয়েছেন। এই পাঠক, বলা নিস্প্রয়োজন, নতুন কালের নতুন পাঠক। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিশ্বমানচিত্রে যে বাংলাদেশের আবির্ভাব ঘটে, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে যে বাংলাদেশ নানা উত্থানপতনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে থাকে, সেই পটভূমিতে যে নতুন প্রজন্মের আবির্ভাব ঘটতে শুরু করে—যারা তীব্র রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও মধ্যবিত্তের সীমাবদ্ধ গণ্ডির মধ্যে আবর্তিত হয়েও বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করছিল, লক্ষ করছিল চারদিকের ক্ষয়ে যাওয়া নষ্টভ্রষ্ট সময়কে, দেখছিল উঠতি ব্যবসায়িক শ্রেণীর উত্থান, পাচ্ছিল প্রযুক্তির স্পর্শ আর একধরনের সর্বজনীন মানবিকতার শিক্ষা—হুমায়ুন তাঁদের নাড়িনক্ষত্র ধরতে পেরেছিলেন। কী তাদের ভাবনা, কী তারা চাইছে, কী তাদের আকাঙ্ক্ষা, কী রুচি নিয়ে তারা বড় হচ্ছে, কোন সংকট আর স্বপ্নকল্পনার মধ্য দিয়ে তাদের জীবন অতিবাহিত হচ্ছে—এর সবই ধরা পড়েছিল তাঁর সংবেদনশীল অনুভবে। শুধু কি এই নতুন কালের নতুন প্রজন্মের কথা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বলেই তিনি এতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন? কোনো সন্দেহ নেই, এসবই ছিল তাঁর জননন্দিত হয়ে উঠবার প্রধান কারণ, কিন্তু একমাত্র কারণ নয়। আমার মতে, হুমায়ুনের জনপ্রিয় হয়ে উঠবার মূলসূত্রটি লুকিয়ে ছিল অন্যত্র, সেটি হলো গল্প বলবার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। এই গল্প বলবার মানে—গল্প নির্মাণের, গল্প বিন্যাসের কৌশল আয়ত্তে ছিল এই জননন্দিত ঔপন্যাসিকের। প্রতিটি উপন্যাসে তিনি তাঁর গল্পের কাহিনিকে এমনভাবে গেঁথে তুলেছেন যে একবার শুরু করলে শেষ না করা অব্দি পাঠক কখনো স্বস্তি পায়নি। তাঁর ভাষাও ছিল অত্যন্ত ঝরঝরে, সরল, একমাত্রিক। জটিল অথবা বহুমাত্রিক অর্থের ইশারা দেয়—এরকম বাক্য বা অনুচ্ছেদ তিনি কখনোই লেখেননি। ভাষাকে এই সরলতার ওপর সমর্পণ করে তিনি কাহিনিকে করে তুলেছেন কিছুটা জটিল, রহস্যময়। তবে অতি রহস্যের ভারে এই কাহিনিকে তিনি আবার রহস্যোপন্যাসের স্তরে উন্নীত করেননি। আমাদের চিরচেনা দৈনন্দিন জীবনকে তিনি সাধারণ মানুষের স্তর থেকে ঘটনা বিন্যাসের অসাধারণ এবং কিছুটা জটিল রীতি অনুসরণ করে উপস্থাপন করেছেন। ফলে, লক্ষ করলে দেখা যাবে, সাধারণ পাঠকের কাছে হুমায়নের গল্পের মূল আকর্ষণ ছিল তাঁর চরিত্রগুলো এবং চরিত্রকেন্দ্রিক ঘটনাগুলো। তাঁর মূল চরিত্রগুলোকে আবার আপাত দৃষ্টিতে সাধারণ বলে মনে হলেও বিশেষত্ব আছে। সাধারণ পাঠক এই বিশেষ চরিত্রগুলোর প্রতি যে সহজেই আকৃষ্ট হবেন, হুমায়ূন তা জানতেন। তিনি তাঁর চরিত্রগুলোকে সেভাবেই নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর উপন্যাসগুলো তাই প্রধানত হয়ে উঠেছে চরিত্রকেন্দ্রিক উপন্যাস। সাধারণ চিরচেনা মানুষের যে মানসিকতা, মনস্তত্ত্ব, আনন্দ-বেদনা এসবই তাঁর উপন্যাসের বিষয় হয়ে উঠেছে। তিনি জানতেন রহস্যোপন্যাসের কাল শেষ, কিন্তু মানুষ ক্রমশ ঝুঁকে পড়ছে বিজ্ঞানকেন্দ্রিক অব্যাখ্যাত নানা রহস্য উন্মোচনের প্রতি। হুমায়ূন তাই বিজ্ঞাননির্ভর ছোট ছোট টুকরো ঘটনার রহস্য আর সেই রহস্য উন্মোচনের কার্যকারণ ব্যাখ্যার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তাঁর এক-একটি উপন্যাসে এরকম অনেক রহস্যময় ঘটনার সন্ধান মেলে। এজন্যে যে প্রয়োজনীয় পঠনপাঠনের প্রয়োজন, সেই পাঠের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। সাধারণ পাঠকের কাছে এসব তথ্য অভিনব লাগবারই কথা। এ প্রসঙ্গে তাঁর সবচেয়ে বহুল আলোচিত দুটি চরিত্রের কথা আমরা উল্লেখ করতে পারি—হিমু এবং মিসির আলি। একটি চরিত্র আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনের ভেতর থেকে প্রতিনিধিত্ব করছে তারুণ্যকে; অন্যটি মানুষের যে একটা অন্তর্জগত আছে—যে-জগত কিছুটা অন্ধকারাচ্ছন্ন, অপরাধবোধ, গ্লানি, আত্মকরুণায় দীর্ণ হতে হতে যেখানে মানুষ আবার মানবিক হয়ে উঠতে চায়—এই ভাবনার ওপর ভর করেই তিনি এই চরিত্রটিকে নির্মাণ করেছেন। মানবিকতার এই অনুষঙ্গটি হুমায়ুনের উপন্যাসের মূল বৈশিষ্ট্য। শুধু হুমায়ূন নন, পৃথিবীর সফল ঔপন্যাসিক লেখকদের এটাই মূল প্রবণতা—মানবিক জীবনের উন্মোচন। হুমায়ূনের ঔপন্যাসিক হিসেবে জনপ্রিয় উঠবার এও আরেকটি কারণ।
মানবিকতার বোধেই তিনি শুধু চরিত্রকেন্দ্রিক উপন্যাস নয়, লিখেছেন ‘অপেক্ষা’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘জ্যোত্স্না ও জননীর গল্প’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘মাতাল হাওয়া’ এবং সর্বশেষ ‘দেয়াল’-এর মতো বেশকিছু অসাধারণ উপন্যাস। এখানে দুটি উপন্যাসের কথা উল্লেখ করছি। যুদ্ধ, সংঘাত ও রক্তপাতের মধ্যেও যে মানবিকতা নিঃশেষিত হয়ে যায় না, জীবনকে ভালোবাসতে শেখায়, ‘জ্যোত্স্না ও জননীর গল্প’ উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে সেরকম কাহিনি। অন্যদিকে ‘মধ্যাহ্ন’ উপন্যাসের পটভূমি রাজনৈতিক। গত শতকের প্রথম দিক থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশের গ্রাম্যজনপদেও যে কীভাবে হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্ক সাম্প্রদায়িকতার দ্বারা প্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিল, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অভিঘাতে বাড়ছিল পারস্পরিক অবিশ্বাস, সন্দেহ—সেসব কথা যেমন এই উপন্যাসে পাওয়া যায়, তেমনি এই দুই সম্প্রদায়ের দীর্ঘকালের সহাবস্থান আর প্রীতিপূর্ণ সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করতে ভোলেননি হুমায়ূন আহমেদ। মানুষের নিয়তি হয়তো এটাই—অপ্রাপনীয় মানবিকতার জন্যে অপেক্ষা। এই উপন্যাসের শেষাংশেই আছে এই মানবিকবোধের স্পষ্ট উল্লেখ :‘সময় সেপ্টেম্বরের দুই তারিখ, ১৯৯৩, ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ড যুদ্ধ ঘোষণা করেছে জার্মানির বিরুদ্ধে। পৃথিবী অপেক্ষা করছে আর এক মহাযুদ্ধের জন্যে। মানবজাতি অপেক্ষা পছন্দ করে না। তারপরেও তাকে সবসময় অপেক্ষা করতে হয়। ভালোবাসার জন্যে অপেক্ষা, ঘৃণার জন্যে অপেক্ষা, মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা, আবার মুক্তির জন্যে অপেক্ষা। শশাংক পাল যেমন গাছ জড়িয়ে ধরে অপেক্ষা করেন, ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে ফাঁসির দড়ির দিকে তাকিয়ে বিপ্লবীরাও অপেক্ষা করেন। অপেক্ষাই মানবজাতির নিয়তি।’
‘শঙ্খনীল কারাগার’ ও ‘নন্দিত নরকে’ আটকে থাকা যেসব মানুষের কথা জীবনের একেবারে প্রথম দিকে উল্লেখ করেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ, সেইসব মানুষের কথা এভাবেই ওই জনপ্রিয় উপন্যাসগুলোকে ছাপিয়ে বার বার তাঁর অন্যান্য ‘সাহিত্যিক’ উপন্যাসে স্থান করে নিয়েছে। জনপ্রিয়তার আড়ালে এই গভীর গহনস্পর্শী উপন্যাসগুলো সমালোচকদের দৃষ্টিতে সেভাবে আসেনি।
তিন
একবার একটা টেলিভিশন সাক্ষাত্কারে হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন, ‘আমি হিমু নই, মিসির আলিও নই। তবে আমার লেখায় তাদের মধ্যে কিছুটা হলেও আমাকে খুঁজে পাওয়া যাবে।’ আসলে হিমু আর মিসির আলি হলো পরিপূরক দুটি চরিত্র। এ দুটি চরিত্রের মধ্য দিয়েই মূলত লেখক হিসেবে হুমায়ূন আহমেদের ভাবনা সম্পূর্ণতা পেয়েছে। মানুষের ক্ষুদ্রতা, মহানুভবতা, ক্ষয়ে যাওয়া সময়ের কথা এ দুটি চরিত্রের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করতে চেয়েছেন হুমায়ূন। এ প্রসঙ্গে তিনি নিজেই জানিয়েছেন, ‘মিসির আলি দেখতে কেমন আমি জানি না, হিমু দেখতে কেমন তাও জানি না। কোনো বই-এ হিমুর চেহারার বর্ণনা নেই। যা আছে তাও খুব সামান্য। সে বর্ণনা থেকে চরিত্রের ছবি আঁকা যায় না। আমার নিজের মনে যে ছবিটি আসে তা হলো—হাসি-খুশি ধরনের একজন যুবকের ছবি। যে যুবকের মুখে আছে কিশোরের সারল্য। শুধু চোখ দুটি মিসির আলির চোখের মতোই তীক্ষ। তবে এই দুটি তীক্ষ চোখে কৌতুক ঝিকমিক করে। যেন সে সবকিছুতেই মজা পায়। হিমুকে আনতে হয়েছে একটি বিশেষ কারণে। মিসির আলির জগত্ যে একমাত্র জগত্ নয় তা দেখানোর জন্যেই হিমুর প্রয়োজন হলো। লজিক খুব ভালো কথা, সেই সঙ্গে এন্টি-লজিকও যে লজিক এই তথ্যটিও মনে রাখা দরকার। ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রনে এসে পৃথিবী থেমে যায়নি। বস্তুজগতের মূল অনুসন্ধান করতে করতে এখন বিজ্ঞানীরা পাচ্ছেন—আপ কোয়ার্ক, ডাউন কোয়ার্ক, চার্ম, স্ট্রেঞ্জ ... হচ্ছে কী এসব। —কোথায় যাচ্ছি আমরা? আমরা কি খুব ধীরে ধীরে লজিকের জগতের বাইরে পা রাখছি না? এই জগতের কথা তো মিসির আলিকে দিয়ে বলানো যাবে না। আমাদের দরকার একজন হিমু (আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই)।’ এই যে লজিক আর অ্যান্টি-লজিক, ছক বাঁধা জীবন আর জীবনের ছককে ভেঙে আত্মঅনুভবের কাছে সমর্পিত হওয়া, যুক্তি আর আবেগ, বিজ্ঞান আর পরাবিজ্ঞানের বিমিশ্রণ—এই তো মানবজীবন। হুমায়ূন আহমেদ এই সম্পূর্ণ জীবনেরই সন্ধান করেছিলেন।
মধ্যশ্রেণীর অন্তর্গত মানুষই হচ্ছে বাংলাদেশের উপন্যাসের পাঠক। এই মানুষ অনির্দেশ্য স্বপ্নকল্পনার জগতে যেমন বিচরণ করে, তেমনি স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় কুঁকড়ে যায়। হুমায়ূন আহমেদ এই মধ্যশ্রেণীর যুবক-যুবতীদের জীবনযাপন, স্বপ্ন, কল্পনা আর মনোজগতকেই তাঁর উপন্যাসে উপজীব্য করেছিলেন। সহজ-সরল কিন্তু মর্মস্পর্শী ভাষা ও বর্ণনারীতির সাহায্যে উপন্যাসের কাহিনি গড়ে তুলেছেন তিনি। অভাবনীয় সাফল্যও পেয়েছিলেন। জনপ্রিয় আর শিল্পসফল দুই ধরনের উপন্যাস রচনাতেই অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন।
চার
প্রতিভাবান এই ঔপন্যাসিকের অকালমৃত্যু হয়েছে। বাংলা সাহিত্যও হারিয়েছে একজন জননন্দিত কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতাকে, যাঁর সৃষ্টির মধ্যে জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষা আর তারুণ্যের স্বপ্নকল্পনা মূর্ত হয়ে উঠেছিল বার বার। জাতির আত্মপরিচয়, জনপ্রিয় সংস্কৃতি আর দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে যে একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে, সম্প্রতি এই নিয়ে নানা গবেষণা হচ্ছে (দ্রষ্টব্য : টিম এডেনসরের লেখা ‘ন্যাশনাল আইডেনটিটি, পপুলার কালচার অ্যান্ড এভরিডে লাইফ’, বার্গ, অক্সফোর্ড ও নিউইয়র্ক, ২০০২)। মধ্যবিত্তের জীবন এবং জাতীয় আত্মপরিচয়কে উপজীব্য করেও যে জনপ্রিয় উপন্যাস লেখা সম্ভব, তিনি তাঁর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন নিঃসন্দেহে। হুমায়ূন আহমেদ এভাবেই হয়ে উঠেছিলেন, গ্রামসির ভাষায়, আমাদের ‘জাতীয়-জনপ্রিয়’ লেখক।