‘ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না’
প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০১৩, ২২:০৮
‘কত মহররম এল গেল চলে গেল বহুকাল/ভুলিনি গো আজো সেই শহীদের লহু-লাল/মুসলিম তোরা আজ জয়নাল আবেদীন/ওয়া হোসেনা কেঁদে তাই যাবে দিন? ফিরে এল আজ সেই মহররম মাহিনা, ত্যাগ চাই মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না।’ কাজী নজরুল ইসলামের এই হূদয় স্পর্শী মর্মবাণী আজ আশুরা দিবসে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সমগ্র মুসলিম জাহানে। বিশ্বের শিয়া মুসলিম সম্প্রদায় আজকের দিবসে সবচে’ বেশি আবেগাপ্লুত হয়ে তাজিয়া মিছিল, জিঞ্জির মাতম, শোক মিছিল, শোক মজলিস ও মর্সিয়া মাতমের মাধ্যমে পালন করছেন।
আশুরা দিবসে পৃথিবীর অসংখ্য বিস্ময়কর ঘটনার অবতারণা হয়েছিল। যা হযরত আদম (আ.) থেকে শেষ নবী মুহাম্মদ (স.) পর্যন্ত সুবিস্তৃত। সকল ঘটনাই হূদয়ের তন্ত্রিতে তন্ত্রিতে আবেগ অনুরাগ কৌতূহল কষ্ট যাতনায় ভাবাবেগে আপ্লুত করার স্ফূরণ সৃষ্টিকারী। তবে সব শেষে ৬১ হিজরি ১০ মহররম যে বেদনাবিধূর হূদয়বিদারক মর্মন্তুদ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল তা অনায়াশে প্রত্যেক মমিন হূদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে ও চোখ অশ্রুসিক্ত না করে পারে না। রসূল (স.) যাদের তাঁর আহলে বায়াত বলেছেন, যে হাসান হোসাইন (রা.) কে বেহেশতের সব যুবকদের সরদার বলে ভবিষ্যত্ বাণী করেছেন, তাদের একজন অর্থাত্ হোসাইন (রা.) কে ইসলামী খেলাফতের কালিমালেপোনকারী ইয়াজিদ তার সেনাপতি ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ ও সিমারের মাধ্যমে ইরাকের কারবালা প্রান্তরে ফোরাতের কিনারায় এক বিন্দু পানি হতে বঞ্চিত করে। নিষ্ঠুর নির্মমভাবে শহীদ করে। সেদিন ইমাম হোসাইন (রা.) সহ তাঁর পরিবার পরিজনের মোট ৭২ জন মর্দে মুজাহিদ এখানে সত্য-ন্যায়ের জন্য শাহাদাতের পেয়ালা পান করেন।
হোসাইনের শাহাদাতের পর সমগ্র মুসলিম জাহান ইয়াজিদের ওপর ক্ষেপে গিয়েছিল। শত চেষ্টা করেও সে মানুষের ক্ষোভ, ক্রোধ ও বিদ্রোহ দমন করতে পারেনি। অবজ্ঞা, ঘৃণা, ধিক্কার ও অভিষাপের বিষবাষ্পে দগ্ধীভূত হয়ে দু’বছর আট মাস রাজত্ব করে একদিন সেও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল। তার দম্ভ ও অহংকারের চূড়া ধূলিসাত্ হয়ে গিয়েছিল। এর পাঁচ বছর আট মাস পর কুফার গভর্নর হয়েছিলেন মোখতার বিন আবু ওবায়েদ। তিনি সিমারকে ধরে এনে তীর মেরে তার বুক ঝাঁজরা করে দেহের হাড় মাংস, রগ তন্ত্রী সব কেটে কুচি-কুচি করে কুকুরকে খাইয়েছিলেন। এমনিভাবে কারবালার প্রত্যেক হত্যাকারীকে তিনি উপযুক্ত শাস্তির আওতায় নিয়ে আসেন।
আজকের এই দিনে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের শিয়া সম্প্রদায়ও নানাবিধ অনুষ্ঠানাদি পালন করবেন। ঢাকার হোসেনী দালান থেকে আজ সকাল দশটায় দুলদুল তাজিয়া মিছিল, আলম নিশানাসহ বিভিন্ন সরঞ্জামে সজ্জিত হয়ে বের হবে। এটা হোসেনী দালান থেকে বের হয়ে বকশিবাজার, লালবাগ, আজিমপুর, নিউমার্কেট সায়েন্সল্যাব মোড় হয়ে ধানমন্ডি-২ এর রাইফেল স্কোয়ারের সামনের লেকের পাশে গিয়ে কারবালার স্মরণে অবস্থান করবে। সেখানে একসঙ্গে জোহরের নামাজ আমল, দোয়া ও অন্যান্য ইবাদত করে আশুরা পালনের মিছিলের সমাপ্তি হবে। তাজিয়া মিছিলে যারা জিঞ্জির, কামা, ব্লেড দিয়ে মাতম করেন তাদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলা হয়েছে— তারা যেন মহররমের মিছিলের ভাবগাম্ভীর্য ও পবিত্রতা রক্ষার প্রতি খেয়াল রাখেন। এ ব্যাপারে প্রশাসনেরও সহযোগিতা ও কামনা করা হয়েছে। তাছাড়া পুরান ঢাকার সকল ইমাম বড়া হতে একইভাবে আশুরার মিছিল বের হবে।
তাছাড়া ঢাকা মহানগর সুন্নী আন্দোলন সকাল ৯টা হতে বেলা ২টা পর্যন্ত ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স (আইইবি) মিলনায়তনে আশুরা উপলক্ষে আলোচনা সভা ও মিলাদ মাহফিল এবং ধর্মীয় শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠান সমাপ্ত ঘোষণা করা হবে হাইকোর্ট মাজারে সালাতু সালাম পেশ করে।