মূলধারার রাজনীতি শক্তিশালী হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামে

পার্বত্য চট্টগ্রামে শক্তিশালী হচ্ছে মূলধারার রাজনীতি। এর বিপরীতে গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে আঞ্চলিক সংগঠনগুলো। নির্বাচনে সরাসরি অংশ নেওয়ার সুযোগ না থাকলেও এসব সংগঠন দীর্ঘদিন নেপথ্যে থেকেই স্থানীয় রাজনীতির কলকাঠি নেড়েছে। তাদের দাপটের কাছে অসহায় ছিলেন আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা। তবে ইদানিং সেখানকার রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। আঞ্চলিক দলগুলোর দুর্গে হানা দিয়েছে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচন এবং গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন-এর বড় প্রমাণ। দুটি নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে মূলধারার দলগুলো এর আগে কখনো এ ধরনের সাফল্য পায়নি।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় সাড়ে চার দশক ধরে অব্যাহত সন্ত্রাসী কার্যক্রমের কারণে আঞ্চলিক সংগঠনগুলো গণমানুষ থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সাধারণ ভোটারদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে।  সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিন পার্বত্য জেলায় বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা। খাগড়াছড়ি ২৯৮নং আসনে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা। তিনি ২ লাখ ৩৬ হাজার ১৫৬ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইউপিডিএফ সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী পেয়েছেন ৫৯ হাজার ২৫৭ ভোট। বান্দরবানে মহাজোট মনোনীত প্রার্থী বীর বাহাদুর উ শৈ সিং ১ লাখ ৪২ হাজার ২২৩ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন। রাঙ্গামাটিতে জয়লাভ করেন আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী দীপঙ্কর তালুকদার।  

জাতীয় নির্বাচনের পর উপজেলা নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা ব্যাপক বিজয় লাভ করেন। পার্বত্য অঞ্চলের ২৫টি উপজেলার মধ্যে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের ১৭ জন জয়লাভ করেন। বিপরীতে জেএসএস (মূল) পায় ৩টি, জেএসএস (সংস্কার) পায় ৩টি, ইউপিডিএফ (মূল) পায় ১টি ও স্বতন্ত্র পদে একজন জয়লাভ করেন। অন্যদিকে ভাইস চেয়ারম্যান (পুরুষ) পদে আওয়ামী লীগের ১২ জন, জেএসএস (মূল) এর ৪ জন, ইউপিডিএফ (মূল) এর ২ জন, পার্বত্য নাগরিক পরিষদের ১ জন ও স্বতন্ত্র পদে ৬ জন জয়লাভ করেন। ভাইস চেয়ারম্যান (মহিলা) পদে আওয়ামী লীগের ১৪ জন, জেএসএস (মূল) এর ৩ জন, জেএসএস (সংস্কার) এর ১ জন, ইউপিডিএফ (মূল) এর ১ জন ও স্বতন্ত্র পদে ৬ জন জয়লাভ করেন। সবমিলিয়ে উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ৪৩ জন, জেএসএস (মূল) এর ১০ জন, জেএসএস (সংস্কার) এর ৪ জন, ইউপিডিএফ (মূল) এর ৪ জন,পার্বত্য নাগরিক পরিষদের ১ জন ও স্বতন্ত্র পদে ১৩ জন জয়লাভ করেন।

জানা গেছে, ১৯৬০ সালে কাপ্তাই জলবিদ্যুত্ প্রকল্প স্থাপনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ি জনগণের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ ঘটে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির। ১৯৭৩ সালের ৭ জানুয়ারি শান্তিবাহিনী প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়। তারা তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে জুম্ম জাতির আত্ম নিয়ন্ত্রণ অধিকার লাভের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামকে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ঘোষণাসহ চার দফা দাবি পেশ করে। ১৯৭৬ সাল থেকে শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র তত্পরতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। যার পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছর পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা মোতায়েন করা হয়। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর জনসংহতি সমিতির সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৯৯ সালে জনসংহতি সমিতির ষষ্ঠ মহাসম্মেলনে শান্তিবাহিনীর আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘোষণা করা হয়।  তবে শান্তিচুক্তির পর ২২ বছর পেরিয়ে গেলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফিরে আসেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। শান্তিবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হলেও আদি সংগঠন জনসংহতি সমিতি ভেঙে চারটি সংগঠন হয়েছে। এরা হলো—জেএসএস (মূল), জেএসএস (সংস্কার), ইউপিডিএফ (প্রসীত খীসা) ও ইউপিডিএফ (সংস্কার)। এদের সশস্ত্র সংগঠনগুলো বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্ত্রবাজি, খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি ছাড়াও কথিত ‘জুম্মল্যান্ড’ আন্দোলনের নামে রাষ্ট্রদ্রোহমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত রয়েছে। এদেরই এক গ্রুপ গত ১৮ মার্চ রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়িতে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ওপর ব্রাশফায়ার করে ৮ জনকে হত্যাসহ ১৬ জনকে মারাত্মকভাবে আহত করে। এর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বিলাইছড়ি আওয়ামী লীগের সভাপতি সুরেশ তংচঙ্গ্যাকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।

স্থানীয়দের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছে আঞ্চলিক সংগঠনগুলো। এখানে খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। ভুক্তভোগী কেউ মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নেয় না। কোনো সন্ত্রাসীকে নিরাপত্তা বাহিনী হাতেনাতে অস্ত্রসহ আটক করে পুলিশকে দিলে পুলিশ মামলার সাক্ষী হতে চায় না। মামলার সঠিক তদন্ত পূর্বক চার্জশিট প্রদান করে না পুলিশ। অস্ত্রধারী আসামির সঠিক ভেরিফাই হয় না। এসব কারণে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা তাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা থেকে রেহাই পায়। নেতৃত্বে উপজাতীয় জনপ্রতিনিধি থাকার কারণে স্থানীয় প্রশাসন একপ্রকার জিম্মি সন্ত্রাসীদের কাছে। প্রশাসন উপজাতীয়দের কথার বাইরে যেতে পারে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাশে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত। অরক্ষিত সীমান্তের কারণে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা অবাধে অস্ত্র নিয়ে আসে। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি পাহাড়ি-বাঙালি ব্যবসায়ীকে চারটি পার্বত্য সংগঠনকে চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করতে হয়। সরকারি প্রতিটি অবকাঠামো নির্মাণ কাজের জন্য ৫% হারে চাঁদা দিতে হয় সন্ত্রাসীদের। মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় এমন কোনো জিনিসপত্র নেই যে ক্রয় বিক্রির ক্ষেত্রে সন্ত্রাসীদের চাঁদা দিতে হয় না।

আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর দাপটের কাছে এতদিন অসহায় ছিলেন মূলধারার রাজনীতিবিদরা। এতদিন পাহাড়ি সংগঠনগুলোর বাইরে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বা অন্য কোনো দল করার সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। তবে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর বিভক্তি যতই বাড়ছে ততই শক্তিশালী হচ্ছে মূলধারার রাজনীতি। অন্তর্দলীয় কোন্দল, চাঁদার টাকার ভাগাভাগি, অস্ত্র ব্যবসাসহ নানা কারণে আঞ্চলিক সংগঠনগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে সাধারণ পাহাড়িরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক উপজাতীয় নেতা ইত্তেফাককে বলেন, শুধু বাঙালিরা নয়, সাধারণ উপজাতীয়রাও আঞ্চলিক সংগঠগুলোর চাঁদাবাজির টার্গেট। সারা বছর তারা নানা উছিলায় চাঁদাবাজি করে। চাঁদা না পেলে অপহরণ ও খুন করে। এ কারণে পার্বত্যবাসীরা আর জেএসএস বা ইউপিডিএফ সমর্থন করে না।