সিডরের দুঃসহ স্মৃতি আজো তাড়া করে উপকূলবাসীকে
প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০১৩, ২২:৩৭
আজ ১৫ নভেম্বর, সিডর দিবস। ছয় বছর আগে ২০০৭ সালের এই দিনে সুপার সাইক্লোন সিডর প্রচণ্ড গতিতে দেশের উপকূলে এক মহাদানবীয় শক্তি নিয়ে আঘাত হানে। কেড়ে নেয় পিরোজপুর, বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের কয়েক হাজার মানুষের জীবন। হাজার হাজার বাসিন্দা হন গৃহহারা। প্রাণহারায় লাখ লাখ পশুপাখি। বিধ্বস্ত হয় বিপুল পরিমাণ গাছপালা। সিডরের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয় সুন্দরবন। বিভিন্ন দ্বীপে যে কত শত জেলে মারা গেছে, আহত বা নিখোঁজ হয়েছে, তার হিসেব আজো মেলেনি। সিডরের সেই ভয়াবহ স্মৃতি তাই আজো ভুলতে পারেননি উপকূলবাসী। বেঁচে যাওয়া সর্বস্ব হারানো মানুষগুলোর অনেকেই এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। সেই দুঃসহ স্মৃতি এখনও তাড়া করে ফেরে তাদের।
সিডরের আঘাতে শুধু পিরোজপুর জেলায় ৪০৯ জনের মৃত্যু হয়। সরকারি হিসেবে জেলার ৭ উপজেলার ১১ লাখ ৪৩ হাজার ৮৭১ জন লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৫৪ হাজার ৪১৬টি ঘর-বাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। ১১ হাজার ৭৪৬.৪৩ হেক্টর জমির ফসল বিনষ্ট হয়। জেলার ৭৩.৭০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সম্পূর্ণ এবং ১৪৭.০৯ কিলোমিটার আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া কাঁচা-পাকা সড়ক, ব্রিজ-কালভার্ট, অসংখ্য মসজিদ মন্দির, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিধ্বস্ত হয়।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের নারিকেলবাড়িয়া, শ্যালারচর, কচিখালী ও দুবলার চরে প্রায় আড়াই হাজার জেলে সিডরে প্রাণ হারান। কয়েকশ’ মত্স্য ব্যবসায়ী তাদের নৌকা-ট্রলার, অস্থায়ী ঘর, শুঁটকি মাছ ইত্যাদি হারিয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। অথচ সুন্দরবনের এই মত্সজীবীরা সরকারের কোন পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় আসেননি।
জিয়ানগর সংবাদদাতা জানান, সিডরের ক্ষত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন উপজেলাবাসী। সরকারি হিসাবে শুধুমাত্র জিয়ানগরেই ৬৫ জন লোক মারা যায়, নিখোঁজ হয় ২৫ জন। সমগ্র উপজেলায় ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দুইশ’ কোটি টাকা। উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের মধ্যে সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৩নং বালিপাড়া ইউনিয়নের মানুষ। শুধু ঐ এলাকায়ই নিহত হয় ৫৭ জন ।
সে দিনের দুঃসহ স্মৃতি মনে করে গুমরে কেঁদে ওঠেন উপজেলার বলেশ্বর নদের তীরবর্তী পূর্ব চন্ডিপুর গ্রামের জেলে ইব্রাহীম সেখ। তিনি জানান, সেদিন ভাগ্যক্রমে তিনি এবং তার স্ত্রী বেঁচে গেলেও দুদিন পর ধানক্ষেতে তার ৩ সন্তানের লাশ পাওয়া যায়। চার বছরের শিশু কন্যা চাঁদনিকে হারিয়ে এখনো মূর্ছা যান মা খাদিজা বেগম। এ ছাড়া সিডরে বালিপাড়া ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা চেহারা বানুর (৭০) ঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। তারপর থেকে খোলা আকাশের নিচে একমাত্র প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। বৃদ্ধা চেহারা বানু জানান, ‘সিডরের পরে মুই হেরহমের কোন সাহায্য পাই নাই। মোর কোন ঘর নাই। সুবারি পাতার ছাউনি দিয়া কোন মতে মাইয়াডা লইয়া থাহি।’
জিয়ানগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইকরামুল কবির মজনু জানান, সিডরের আঘাতে বিধ্বস্ত বেড়িবাঁধ জরুরি ভিত্তিতে মেরামত ও বেশ কিছু সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। এখানে মাত্র ১১ টি সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
বেতাগী (বরগুনা) সংবাদদাতা জানান, সেদিন উপজেলায় মারা যায় ৩১ জন, আহত হয় শত-শত লোক। তবে ৬ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি এখানকার ক্ষতিগ্রস্তদের। অনেকেই আজ মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। স্বজন হারানোর ব্যথা নিয়ে কাটছে অনেকের জীবন।
উপজেলার গ্রামার্দ্দন গ্রামের আহম্মেদ মিয়া (৫০) সিডরে স্ত্রী, সন্তান হারিয়েছেন। এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন,‘আপন বলতে পরিবারে আর তেমন কেউ বেঁচে নেই, দুঃসহ যন্ত্রণা ও চরম কষ্টের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছি।’ তার মতোই ছেলে বউ, নাতি-নাতনীর স্মৃতি কিছুতেই ভুলতে পারছেন না গ্রামের সোনাবরু বেগম(৫০)।
এদিকে সিডর স্মরণে বেতাগী প্রেসক্লাব আজ কালোব্যাজ ধারণ, শোভাযাত্রা, সাপ্তাহিক বিষখালী কার্যালয়ে আলোচনা সভা ও ভিডিও প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। এখানকার জনগোষ্ঠীকে ঘুরে দাঁড়াতে দীর্ঘ মেয়াদী সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।