‘আই অ্যাম মালালা’
প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০১৩, ২৩:০৮
আমার আম্মুর বয়স যখন ছয়, তখন স্কুলে পাঠানো হয় তাকে। তবে সেই বছরই শেষ হয় তার পড়াশোনা। গ্রামে অন্য মেয়েদের চেয়ে আম্মু ছিলেন ভিন্ন ধরনের। কারণ, আমার নানা ও মামারা তাকে স্কুলে যেতে উত্সাহিত করতেন। ফলে তার ক্লাসে আম্মুই ছিলেন একমাত্র মেয়ে, বাকি সবাই ছেলে। আম্মু স্কুল ব্যাগ নিয়ে ক্লাসে যেতেন এবং বলতেন, তিনি ক্লাসে ছেলেদের চেয়ে লেখাপড়ায় ভালো। কিন্তু যখন তার সমবয়সী জ্ঞাতি বোনেরা খেলাধুলায় মেতে থাকত, তখন আম্মুকে যেতে হত স্কুলে। তাই একদিন তিনি তার সব বই ৯ আনায় বিক্রি করে দিলেন এবং সেই পয়সা দিয়ে মিষ্টি কিনে খেলেন। এরপর আর কখনো তিনি স্কুলে ফিরে যাননি। এতে তার আব্বাও কিছু বললেন না। আম্মু বলেন, তার আব্বা এটা টেরও পাননি অবশ্য। কারণ, তিনি খুব সকালে নাশতা সেরে তার জার্মান পিস্তলটা বগলদাবা করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতেন এবং সারাদিন গ্রামের ঝগড়া-বিবাদ মীমাংসা, গ্রাম্য রাজনীতি—ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। এছাড়া তার আরো সাতটি ছেলে-মেয়ে ছিল। তাদের কথাও ভাবতে হত তাকে।
অবশ্য আমার আব্বুর সঙ্গে তার যখন পরিচয় হল, তখন আম্মুর মনে দুঃখ হল, লেখাপড়া না শেখার জন্য। এমন একজন মানুষের দেখা তিনি পেয়েছেন, যিনি প্রচুর বই পড়েন এবং কবিতা লেখেন। কিন্তু আম্মু সেসব কবিতা পড়তে পারেন না। আম্মু জানতেন, একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করা আমার আব্বুর বড় স্বপ্ন। এ কারণে আম্মু তাকে সাধ্যমত সাহায্য করতেন স্কুল প্রতিষ্ঠার কাজে। স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে আব্বু টের পেলেন যেমনটি ভেবেছিলেন, কাজটা তেমন সহজ নয়। কোন পরিবারই তার দিকে সাহায্যের হাত বাড়াতে রাজি নয়। কেউই টাকা-পয়সা দিয়ে বা অন্য কোনভাবে সাহায্য করতে চাইল না। আব্বু বুঝতে পেরেছিলেন, জীবনে জ্ঞানার্জন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। শৈশবে গ্রামের নদীর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে তিনি দেখতেন অনবরত পানি বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তার কোন কারণ তার জানা ছিল না। তিনি পড়াশুনা করেই জানতে পারেন, সাগর থেকে মেঘ, মেঘ থেকে বৃষ্টি, পাহাড়ে জমে থাকা সেই বৃষ্টির পানিই এভাবে নদী দিয়ে বয়ে যায় সাগরে।
তার গ্রামের স্কুলটি ছিল খুব ছোট একটিমাত্র ভবনে। তাদের বেশিরভাগ ক্লাস হত গাছের তলায়, মাটির ওপর। তাদের কোন টয়লেট ছিল না। দরকার হলে তারা মাঠে চলে যেতেন। আব্বু বলেন, তার কপাল ভালো যে, তার বোনেরা কেউ স্কুলে না গেলেও তিনি লেখাপড়া শেখার সুযোগ পেয়েছেন। দেশের হাজার হাজার মেয়ের মত তার বোনেরা বাড়িতেই থাকতেন। শিক্ষাকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ বলে মনে করেন তিনি। আব্বুর ধারণা, পাকিস্তানে যত সমস্যা তার মূলে হল এই অশিক্ষা। সাধারণ মানুষ অশিক্ষিত বলেই রাজনীতিবিদরা তাদের বোকা বানাতে পারেন এবং একজন খারাপ লোক বার বার নির্বাচিত হয়। আব্বু বলেন, ধনী-দরিদ্র, ছেলে-মেয়ে—সবারই স্কুলে যাওয়ার সুযোগ থাকা দরকার।
দাদা চাইতেন, তার ছোট ছেলে ডাক্তার হোক। যেহেতু তার দুই ছেলে, দাদার ইচ্ছা ছিল এক ছেলে ডাক্তারি পড়বে, অন্যজন সংসার সামলাবে। আব্বুর বড় ভাই সাঈদ রমজান স্থানীয় এক স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। তিনি তার পরিবার নিয়ে আমার দাদীর সঙ্গে থাকতেন। বেতন থেকে কিছু কিছু টাকা বাঁচিয়ে তিনি আমাদের বৈঠকখানার পাশে ছোট একটি ঘর তুললেন। তিনি পাহাড় থেকে নিজের পিঠে করে জ্বালানি কাঠ বয়ে আনতেন রান্নাবান্নার জন্য। স্কুল শেষে তিনি মাঠে গিয়ে আমাদের জমিতে কাজ করতেন। বাড়ির ছাদে যখন বরফ জমত, দাদা তা সরাতে গেলে আমার সেই চাচাও তাতে হাত লাগাতেন।