এত ঔদ্ধত্য কোথায় পেল ওরা

ব্যাডমিন্টন খেলাকে কেন্দ্র করে বিরোধ। অতপর দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ। এই সংঘর্ষে একজনের মৃত্যু হয়; কিন্তু এই মৃত্যু আর খেলার মাঠের বিরোধ হিসেবে থাকেনি। এর জের ধরে নারকীয় তাণ্ডব চালানো হয় হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি ঘর আর মন্দিরে। ভাঙচুর, লুটপাটের পর আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। ঘটনাস্থলেই দাঁড়িয়ে ছিলেন ৪ পুলিশ সদস্য। তাণ্ডবের ভয়াবহতা দেখে কাছে যাওয়ার সাহস পাননি পুলিশ সদস্যরা। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে- এত ঔদ্ধত্য দেখানোর সাহস ওরা কোথায় পেল? দেশে কি আইনের শাসন বলতে কিছু নেই? আর এই ঘটনার পেছনেই বা কারা। এবার কি পেছনের লোকগুলো ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে, নাকি আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে এসে ন্যায় বিচার পাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো? নৃসংশ এই ঘটনা ঘটেছে শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে বরিশাল শহরের উপকণ্ঠে চরকাউয়া ইউনিয়নের চর আইচা গ্রামে। দুর্বৃত্তদের দেয়া আগুনে হিন্দু সম্প্রদায়ের ১৬টি বসত ঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। দুইটি মন্দির ভাঙচুর করে অগ্নিসংযোগ করা হয়। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তাণ্ডব চলে। পুড়ে গেছে গবাদি পশুও। তাণ্ডব শেষে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ পাঠানো হয়। গতকাল শনিবার বিকাল ৫টায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নৌবন্দর থানায় হত্যা কিংবা অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কোন মামলা হয়নি বলে জানিয়েছেন থানার অফিসার ইনচার্জ রেজাউল ইসলাম। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘চর আইচা গ্রামে অভিযান চালিয়ে গতকাল পর্যন্ত মোট ২৫ জনকে আটক করা হয়েছে। এদের মধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৫ জনকে হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত সন্দেহে এবং ২০ জনকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়ি ঘরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে আটক করা হয়েছে।’ যে কারণে এই নৃসংশ তাণ্ডব গ্রামবাসী জানায়, বৃহস্পতিবার বিকালে ব্যাডমিন্টন খেলাকে কেন্দ্র করে পীযূষ, ধীমান, শান্ত চন্দ্র হালদারসহ কয়েক জনের সাথে পারভেজ গাজী, তার ভাই পাভেল গাজী, জহিরুল ও শামীমের মধ্যে সংর্ঘষ হয়। পারভেজকে রাস্তার পাশে নিয়ে জবাই করার সময় তার ভাই পাভেল গাজী, জহিরুল, শামীম বাধা দিলে তাদের কুপিয়ে ও পিটিয়ে জখম করা হয়। পরে তাদের শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে রাতে পারভেজের মৃত্যু হয়। আহতদের মধ্যে শামীম ও পাভেল গাজী শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রয়েছে। অপর গুরুতর আহত জহিরুলকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। সেখানে চিকিত্সাধীন অবস্থায় জহিরুল মারা গেছে বলে শুক্রবার সকালে গুজব রটে চর আইচা গ্রামে। এতে পারভেজ ও জহিরুলের পরিবারসহ গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দার মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তারা সেখানকার হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি-ঘরে হামলার প্রস্তুতি নিলে সেখানে হাজির হন চরকাউয়া ইউপি চেয়ারম্যান ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মনিরুল ইসলাম ছবি। তিনি বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসীকে শান্ত করে সেখান থেকে চলে আসার পর পুনরায় সংঘবদ্ধ হয়ে বেলা ১১টার দিকে সশস্ত্র হামলা করা হয় ধোপা বাড়িতে। ঐ বাড়ির তিনটি ঘর ভাঙচুর ও লুটপাট শেষে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এরপর পণ্ডিতবাড়ির ১১টি ও ধিরাজ বাড়ির ২টি বসত ঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এসময় পার্শ্ববর্তী আরো ৪/৫টি হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি ভাঙচুর করা হয়। দুইটি মন্দিরও ভাঙচুর শেষে অগ্নিসংযোগ করা হয়। ঘটনাস্থলে নিষ্ক্রিয় ছিল পুলিশ শুক্র ও শনিবার সরেজমিনে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তেমন কোনো সদস্যকে পাওয়া যায়নি। হাতে গোনা যে ২/১ জন ধ্বংসস্তূপের উপর নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, তাদের মধ্যে সুধীর রঞ্জন ও সুধাংশু হালদার জানান, তারা বা তাদের পরিবারের কোনো সদস্য পারভেজ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত নয়। তারা অহেতুক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। তাদের সাথে ক্ষতিগ্রস্ত শ্যামল, ধীরাজসহ কয়েকজন জানান, পুলিশের সামনেই হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাট শেষে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। পুলিশ এসময় নিরব দর্শকের ভূমিকায় দাঁড়িয়ে ছিলো। ঘটনার সময় সেখানে ৩ জন কনস্টেবল নিয়ে দায়িত্বে থাকা এসআই মনিরুল ইসলাম জানান, বৃহস্পতিবার রাতে তাদের সাথে আরো পুলিশ সদস্য ঐ গ্রামে মোতায়েন ছিলো। শুক্রবার ভোরে তাদেরকে প্রত্যাহার করে মাত্র ৪ জনকে ঘটনাস্থলে রাখা হয়েছিলো। সহস্রাধিক গ্রামবাসীর এই হামলার সময় ৪ জন পুলিশের পক্ষে প্রতিহত করা সম্ভব ছিলো না। চর কাউয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা সুলতান আহমেদ খান অভিযোগ করেন, হামলা শুরু হওয়ার আগেই তিনি ফোন করে পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করেছিলেন। এরপর হামলার সময় বার বার ফোন করা হলেও ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ পাঠানো হয়নি। ঘণ্টাব্যাপী ধ্বংসযজ্ঞের পর নৌবন্দর থানার ওসিসহ কিছু সংখ্যক পুলিশ ঘটনাস্থলে হাজির হন। বেলা ১টার দিকে জেলা প্রশাসক শহীদুল আলম ও পুলিশ কমিশনার মো. শামসুদ্দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। তখন সেখানে বিপুল সংখ্যক পুলিশের পাশাপাশি র্যাব মোতায়েন করা হয়। র্যাব-পুলিশের উপস্থিতির সময় হামলার শিকার হিন্দু সম্প্রদায় ও হামলাকারী গ্রামবাসীর কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তদন্ত কমিটি গঠন জেলা প্রশাসক শহীদুল আলম ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি পরিবারকে তাত্ক্ষণিক নগদ ৫ হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদান প্রদান করেছেন। গতকাল পরিবার প্রতি ৩০ কেজি করে চাল দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক জানান, ঘর নির্মাণের জন্য ক্ষতিগ্রস্তদের অনুদান প্রদান করা হবে। ঘটনা খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (শিক্ষা) প্রধান করে গঠিত এ তদন্ত কমিটি গতকাল কাজ শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন কমিটির সদস্য সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেগম শামীমা ফেরদৌস। পুলিশ কমিশনার যা বলছেন পুলিশ কমিশনার মো. সামসুদ্দিন পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ অস্বীকার করে সাংবাদিকদের জানান, ‘ব্যাডমিন্টন খেলা নিয়ে যে কলেজ ছাত্র খুন হয়েছে তাকে জবাই করেছে হিন্দু সমপ্রদায়ের কয়েক যুবক। এই কারণে প্রায় দু’ হাজার নারী-পুরুষ ও শিশু একত্রিত হয়ে এ হামলা করেছে।’ ঘটনার সময় সেখানে পুলিশ উপস্থিত ছিলো দাবি করে পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘হামলা ঠেকানোর জন্য পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটত। নারী ও শিশুরা হামলার সাথে যুক্ত থাকার কারণে পুলিশকে গুলির নির্দেশ দেয়া হয়নি’। তিনি বলেন, হত্যা ও হামলা-ভাংচুরের ঘটনায় মামলা হবে। ঘটনার সাথে জড়িত ও ইন্ধনদাতাদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার করা হবে। যতদিন ঐ গ্রামের অবস্থা স্বাভাবিক না হবে ততদিন সেখানে একটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করার কথা জানান পুলিশ কমিশনার। মামলা হয়নি, আটক -২৫ বাড়িঘরে হামলা-ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ শেষে তত্পর হয় পুলিশ। শুক্রবার দুপুরে অভিযান চালিয়ে মোট ৫ জনকে আটক করা হয়। এরমধ্যে হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত পিযূষ চন্দ্র হালদার, শম্ভু, সমির হালদার ও ধীমানের পিতা ধীরেন চন্দ্র হালদারকে ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পাভেল গাজীকে আটক করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। নৌবন্দর থানার এসআই সমির কুমার মণ্ডল জানান, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের পর গরু লুট করে পালিয়ে যাওয়ার সময় পাভেলকে হাতেনাতে আটক করা হয়েছে। অগ্নিসংযোগে দুটি গবাদিপশু অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার দৃশ্য বর্ণনা করে পুলিশের ঐ সাব-ইন্সপেক্টর জানান, বাড়িঘর ভস্মীভূত হওয়ার পূর্বেই গবাদি পশুসহ বাড়ির সকল মালামাল লুট করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। শুক্রবার রাত থেকে চরআইচা গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে পুলিশ গতকাল বিকাল পর্যন্ত মোট ২৫ জনকে আটক করতে সক্ষম হয়। পুরুষ শূন্য গ্রাম অগ্নিসংযোগের আগেই চর কাউয়ার হিন্দু সমপ্রদায়ের লোকজন ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়। ফলে হামলার সময় কেউ হতাহত হয়নি। ঘটনার পর র্যাব-পুলিশের উপস্থিতিতে শুক্রবার বিকালে ধ্বংসস্তূপের উপরে এসে নারী সদস্যরা বিলাপ করতে থাকেন। গগনবিদারী কান্না ও আর্তনাদে পরিবেশ ভারি হয়ে উঠে। শুধাংশু হালদারের স্ত্রী কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বলেন, তার স্বামী নদীতে মাছ শিকার করে, বহু কষ্টে সংসার চলছে। এনজিও’র কাছ থেকে ঋণ সহায়তা নিয়ে জমানো টাকায় তৈরি করেছিলেন নতুন ঘর। ঘরের চিহ্ন পর্যন্ত এখন নেই তার বাড়িতে। নারী সদস্যরা জানান, হত্যা মামলায় পুলিশ যে ৪ জনকে গ্রেফতার করেছে তাদের মধ্যে শুধুমাত্র পিযূষ একা হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত। এদের মধ্যে পঙ্গু ও বৃদ্ধকেও ধরে নেয়া হয়েছে। এই গ্রেফতার আতংকের কারণে পুরুষরা গ্রামে ফিরতে পারছে না। একই অবস্থা মুসলমানদের পরিবারগুলোতে। হিন্দু সমপ্রদায়ের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের অভিযোগে গ্রেফতার আতংকে মুসলমান পরিবারের পুরুষ সদস্যরা আগেই ঘরবাড়ি ছাড়ে। এরপরও শুক্রবার রাতে ২১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তারা অধিকাংশ নিরীহ এবং বয়স্ক। গ্রামের নারী সদস্যরা জানান, সম্ভবত রাতে গ্রামে ঐ ২১ জন পুরুষ সদস্যই উপস্থিত ছিল। এখন আর কেউ গ্রামে নেই। বিরান ভূমিতে অনিশ্চিত জীবন ঘরবাড়ি সব পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ায় খেটে খাওয়া অধিকাংশ পরিবারের খাবার ও পরনের কোনো বস্ত্র নেই। স্বপ্নের ঘরবাড়ি শুধু লুট হয়নি, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সেখানে বসে আগামীর স্বপ্ন দেখা দূরের কথা, এ মুহূর্তের খাবারের নিশ্চয়তা মিলছে না ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর। যে ১৬টি বাড়ি ঘরে আগুন দেয়া হয়েছে তার মধ্যে পণ্ডিত বাড়ির কয়েকটি পরিবার সচ্ছল হলেও বাকিরা সকলেই নদীতে মাছ শিকার ও কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করত। তাদের আয়-রোজগার বন্ধ। গতকাল জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের ঘর নির্মাণের জন্য ৩ বান করে টিন, ২০ হাজার টাকা, কম্বল, শাড়ি ও চাদর বিতরণ করা হয়েছে। হিন্দু সমপ্রদায়ের সংগঠন অনুভব বহুমুখী সমিতি লিমিটেডের সভাপতি স্বপন কুমার বেপারী গতকাল অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ২০ হাজার টাকা আর্থিক অনুদান দিয়েছেন। তিনি জানান, ঢাকায় কেন্দ্রীয় কমিটির সাথে আলোচনা করে আরো সাহায্য প্রদান করা হবে। এদিকে হত্যাকাণ্ডের শিকার পারভেজ গাজীর পরিবারকে নগদ ২৫ হাজার ও ক্ষতিগ্রস্ত সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের প্রতি পরিবারকে প্রয়োজনীয় আর্থিক অনুদান প্রদানের কথা জানিয়েছেন অমৃত ফুড প্রোডাক্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিজয় কৃষ্ণ দে ও অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালক বলরাম পোদ্দার।