গর্ভবতী নারীর স্বাস্থ্যসেবা
প্রকাশ : ১৭ নভেম্বর ২০১৩, ১৯:২৩
সাত মাসের গর্ভবতী লাভলী। লিকলিকে স্বাস্থ্য, ফ্যাকাশে মুখমণ্ডল। চোখে হলদেটে ভাব। খুকখুক করে কাশছিলেন। ১৬ বছর বয়সেই মা হতে চলছেন লাভলী। চাঁদপুর সদর হাসপাতালে এসেছেন ডাক্তার দেখাতে। চাঁদপুর সদর উপজেলার ব্রাহ্মণসাকুয়া গ্রামের লাভলীর স্বামী জি. এম এরশাদ তাকে নিয়ে এসেছেন। এর আগে শ্বশুরবাড়ির লোকজন কবিরাজি ওষুধ, তাবিজ, পানিপড়া এইসব টুকটাক চিকিত্সা করায়। স্বামী বাজারে রেডিও শুনে ও টেলিভিশন দেখে জানতে পেরেছেন একটি সুস্থ শিশুর জন্য সুস্থ মায়ের দরকার।
যে সব নারী গর্ভাবস্থায় ও শৈশবকালে যথাযথ পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করে তাদের সন্তানও পাবে সমপরিমাণ পুষ্টি, আর প্রসবকাল থাকবে জটিলতামুক্ত। শিশু জন্মাবে স্বাভাবিক ওজন নিয়ে। বেড়ে ওঠবে সুস্থভাবে।
রাজধানীর হাজিপাড়াস্থ প্যানাসিয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. জহিরুল হক সাগর বলেন, আমাদের দেশের একজন নারীর স্বাভাবিক অবস্থায় গড়ে প্রতিদিন ২০০০-২২০০ ক্যালরি প্রয়োজন। একজন গর্ভবতী মায়ের প্রতিদিন ৩০০ ক্যালরি ও একজন স্তন্যদায়ী মায়ের প্রতিদিন ৭০০ ক্যালরি বাড়তি শক্তির প্রয়োজন। স্তন্যদায়ী মায়ের এই বাড়তি শক্তির ৫০০ ক্যালরি তার প্রতিদিনের খাদ্য থেকে সংগৃহীত হয়। বাকি ২০০ ক্যালরি গর্ভাবস্থায় দেহে জমানো চর্বি থেকে তিনি পান। স্তন্যপায়ী মাকে তাই গর্ভাবস্থা থেকেই তার শিশুর জন্য খাদ্য সংগ্রহ করতে হয়।
রক্তস্বল্পতা, আয়োডিনের অভাব, কিশোরী বয়সে মা হওয়া ইত্যাদি কারণে কম ওজনের শিশু, মৃত শিশু, বিকলাঙ্গ শিশু জন্মানোর ঝুঁকি থাকে। পুষ্টির অভাবে যেসব নারীর প্রসবের রাস্তা ছোট বা অপ্রশস্ত হয় তাদের ক্ষেত্রে শিশু মৃত্যু ও মাতৃমৃত্যুর আশঙ্কাও বেশি থাকে। গর্ভবতী হওয়ার আগে যে মেয়ের ওজন ৪০ কেজির নিচে থাকে সেই মেয়ে কম ওজনের শিশুর জন্ম দিয়ে থাকে।
গর্ভাবস্থার শেষ দিকে গর্ভের সন্তানের বৃদ্ধি বেশি হয়। এ সময় গর্ভবতী বেশি বেশি পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করলে গর্ভের সন্তানের পুষ্টি বৃদ্ধি ঘটে। অনুন্নত দেশগুলোতে ৬০ ভাগ গর্ভবতী মা রক্তস্বল্পতায় ভোগেন। ফলে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই অনেক সময় সন্তান জন্ম নেয়। একজন মায়ের সাধারণ ও মাঝারি মাত্রার অপুষ্টিতে বুকের দুধের পরিমাণ ও গুণেরও তারতম্য ঘটে। শিশুর যখন ৫-৬ মাস বয়স তখন একজন স্বাভাবিক মা প্রতিদিন ৯০০-১০০০ সিসি দুধ তৈরি করেন। ঠিক এই সময় একজন অপুষ্টিতে ভোগা মা দিনে ৫০০ সিসির বেশি দুধ তৈরি করতে পারেন না। দুধের গুণগত মান অর্থাত্ দুধের আমিষ, শর্করা, চর্বি ও অন্যান্য ভিটামিনও কমে যায়।
একজন গর্ভবতী নারীর পুষ্টি তার শৈশব ও কৈশোরকালীন পুষ্টির ওপরও বহুলাংশে নির্ভর করে। একজন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী গর্ভবতী পারেন একটি সুস্থ-স্বাভাবিক শিশুর জন্ম দিতে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সমাজের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়ে সন্তান পর্যাপ্ত পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়, বঞ্চিত হয় সংসার জীবনে এসেও। আর এরই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে নিজের ওপর, গর্ভস্থ সন্তানের ওপর। এদেশে জন্ম নেয়া অস্বাভাবিক, বিকলাঙ্গ শিশুদের কেসস্টাডিতে এর সত্যতা মেলে।
ডা. জহিরুল হক সাগর আরো বলেন— যে মা শিশুকে দুধ দেন, সে মাকে স্বাভাবিক খাবারের চেয়ে একটু বেশি খাবার খেতে হবে। যেমন- ভাত, মাছ, ঘন ডাল, সবুজ শাক-সবজি, গোশত, দুধ, ডিম, হলুদ তাজা ফল ইত্যাদি। স্বাভাবিক খাবারের সাথে একমুঠো চালের ভাত ২৪০ ক্যালরি, এক-দুই মুঠো ডাল ১২০ ক্যালরি, এক চামচ তেল ৫০ ক্যালরি, একটি পাকা পেঁপে ৯০ ক্যালরি- এই খাবার তাকে খেতে হবে। তিনি বলেন, দারিদ্র্য, পুষ্টি সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব, গর্ভকালে অত্যধিক পরিশ্রম, অল্প বয়সে মা হওয়া, পরিবারের লোকজনদের অসচেতনতাই মূলত একজন গর্ভবতীর অপুষ্টির প্রধান কারণ।
যে কারণে গর্ভবতী লাভলী মারাত্মক অপুষ্টির শিকার। এতে লাভলীর অপুষ্টির কারণে তার সন্তানও অপুষ্টির শিকার হতে পারে। লাভলীর পুষ্টি সম্পর্কে ধারণা অস্পষ্ট। কিছু জানলেও অভাবী সংসারে সে জানাও থেকে যায় অজানা। স্বামী এরশাদ বলেন, ‘লাভলীর চৌদ্দ বছর বয়সে আমি তাকে বিয়ে করি। আমার উপার্জন কম তাই আলাদা ভালা কিছু খাওয়ানের উপায় নাই। প্রায় মাথাব্যথা ও জ্বর হয়। শরীর দুর্বল, সর্দি-কাশি সারে না। তাইতো লইয়া আইছি ডাকতরের কাছে।’
শুধুমাত্র গর্ভকালীন অপুষ্টির কারণে, এ সময়ের সেবা ও সুচিকিত্সার অভাবে প্রতিবছর বহু নারী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। ৫১ শতাংশ গর্ভবতী নারী রক্তশূন্যতাজনিত সমস্যায় ভুগছে, জন্ম দিচ্ছে মৃত-বিকলাঙ্গ-কম ওজনের শিশু। পুষ্টিহীন, স্বাস্থ্যহীন ভবিষ্যতের পথে পা রাখছে লাভলীর মতো নারীরা।