হা য়ে না র ম তো হা না দি ল হা ই য়া ন
মৃত্যুপূরি ফিলিপাইন
প্রকাশ : ১৭ নভেম্বর ২০১৩, ২০:৩৭
লণ্ডভণ্ড গ্রাম। চারদিকে লাশের স্তূপ। ধ্বংসস্তূপের চিহ্ন। পানিতেও লাশ। দুর্গন্ধযুক্ত পানি। যে পানি কোনো দিন কেউ খাবে বলে ভাবতেও পারেনি সেই পানিই যেন বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল। দুমুঠো খাবার জোগাড় করতেই প্রাণপণ চেষ্টা। নিজের প্রাণটা বাঁচাতে আরেকজনকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়াতেও দ্বিধা নেই কারো। ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় হাইয়ানের তাণ্ডবের হূদয়ভাঙ্গা দৃশ্য এশিয়ার অন্যতম দ্বীপরাষ্ট্র ফিলিপাইনের। গত ৮নভেম্বর হাইয়ানার আঘাতে দেশটির কয়েকটি প্রদেশকে যেন মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়।
ঘণ্টায় ৩৮৯ কিঃ মিঃ বেগের সমপরিমাণ শক্তির ঝড়ো হাওয়া নিয়ে দ্বীপরাষ্ট্র ফিলিপাইনে আঘাতহানে সুপার টাইফুন হাইয়ান। ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ এর নাম দিয়েছে ইওলোন্দা। পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলীয় প্রদেশ লেয়টে এবং সামারে আঘাতহানে এই ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়। সামার প্রদেশের গুইউয়ান শহর প্রায় পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়েছে। সেই শহরের জনসংখ্যা ছিল ৪০ হাজার। দেশের উত্তরের সেবু প্রদেশে কয়েকটি শহরের ৮০ থেকে ৯০ ভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওরিয়েন্টাল মিনডোরো প্রদেশের ৩৫ হাজার বাসিন্দার বাকো শহরটির ৮০ শতাংশ পানির নিচে। দ্বীপরাষ্ট্রের পূর্ব থেকে পশ্চিমে যাওয়ার সময় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায় ঝড়টি। এ সময় ৪৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায় উপকূলীয় এলাকা। ভারি বৃষ্টিতে ভূমিধসও ঘটে। টাইফুনের আঘাতে কেবল পূর্বাঞ্চলেই দশ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে বলে দাবি করছে জাতিসংঘ। যদিও দেশটির প্রেসিডেন্ট অ্যাকুইনো বলেছেন, আড়াই হাজারের বেশি নয়। বিস্তীর্ণ এলাকা ঢেকে গেছে জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে উঠে আসা কাদা আর আবর্জনার নিচে। লেইটি প্রদেশের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তাকলোবানের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এলাকা ধ্বংসস্তূপের নিচে। সেখানে প্রধান অগ্রাধিকার পাচ্ছে জীবিতদের জন্য খাবার ও পানি সরবরাহ করা এবং মৃতদের সত্কার করা।
ফিলিপাইনে রেডক্রসের সেক্রেটারি জেনারেল গেনডোলিন প্যাং জানান, প্রায় এক হাজার মানুষ পানিতে ভাসতে দেখা গেছে। বিধ্বস্ত জনপদ দেখে জাতিসংঘের দুর্যোগ মূল্যায়ন সমন্বয় দলের প্রধান সেবাস্তিয়ান রোডস স্টাম্পা বলেন, ২০০৪ সালে ভারত মহাসাগরের সুনামিতে এই চিত্র সর্বশেষ দেখেছি। বিমানবন্দরেও ১৩ ফুট উচ্চতায় পানি উঠেছিল। মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ায় উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য কর্মকর্তাদের শুধু রেডিওর উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সেবুর বাসিন্দা লিনলিন গোলফোন একটি টেলিভিশনকে জানান, আমি কখনো ভাবিনি যে ঝড় এতো শক্তিশালী হতে পারে এবং তাতে আমার ঘর ভেঙ্গে পড়তে পারে।
তাকলোবানের জনসংখ্যা ছিল প্রায় দুই লাখ ২০ হাজার। কিন্তু শহরটির পথে ঘাটে মাঠে প্রচুর লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। দেশটির স্বরাষ্ট্রসচিব ম্যানুয়েল রেক্সাস দাবি করেছেন, ঝড়ে তাকলোবানের সরকার ভেসে গেছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ মারা গেছেন, কেউ হারিয়ে গেছেন এবং কেউ এতটা ভেঙে পড়েছেন যে কোনো কাজ করতে পারছেন না। দায়িত্ব পালনের জন্য ২৯৩ জনের মধ্যে মাত্র ২০জনকে পাওয়া গেছে। দুর্গত এলাকায় ত্রাণের জন্য চলছে হাহাকার। ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত মানুষেরা লুটপাট করছে। খাবার লুট করতে গিয়ে দেয়াল ধসে আটজন ইতোমধ্যে মারা গেছে। ওই দেশে রণতরী পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। তাকলোবান শহরে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। নগর ও হাসপাতালের লোকেরা নিজ পরিবারের মানুষদের বাঁচানো ও খাবার সঞ্চয়ে উঠেপড়ে লেগেছে। স্থানীয় পুলিশ বাহিনী লুটপাটকারীদের হামলার শিকার হচ্ছেন। বাদ যাচ্ছে না তাদের পরিবারও। ফিলিপাইনের সমাজসেবা ও উন্নয়ন বিভাগের সচিব কোরিজন সোলিমান বলেছেন, তাকলোবানের ৪৫ হাজার পরিবারের এক তৃতীয়াংশের কাছে রিলিফ পৌঁছেছে। লুটপাটের ফলে বেশিরভাগ দোকান ধ্বংস বা বন্ধ হয়ে গেছে।
জাতিসংঘের হিসাব মতে, এক কোটি দশ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছয় লাখ ৭৩ হাজার মানুষ এখনো গৃহহারা যাদের মধ্যে অনেকের কাছেই খাবার পানি ও ওষুধের সুবিধা পৌছানো যাচ্ছে না। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন, ত্রাণের অংশ হিসেবে যুক্তরাজ্য লবণাক্ত পানিকে স্বাদু পানিতে রূপান্তর করার যন্ত্রসহ এইচএমএস সিঙ্গাপুর থেকে পাঠানো হয়েছে। হংকংয়ের তীরবর্তী অঞ্চল থেকে পাঁচ হাজার নাবিক ও ৮০টি যুদ্ধবিমান নিয়ে নিউক্লিয় শক্তি দ্বারা পরিচালিত ইউএস জর্জ ওয়াশিংটন ফিলিপাইন গেছে। রণতরীটির সঙ্গে আরো চার মার্কিন জাহাজ রয়েছে। ফিলিপাইনে ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকদের ত্রাণ সহায়তার জন্য ৩ কোটি ১০ লাখ ডলারের সাহায্যের আবেদন জানিয়েছে জাতিসংঘ। দুর্গত এলাকায় মানুষ সাহায্যের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। তাদের খাবার পানি আশ্রয় ও সুরক্ষা দরকার। জাতিসংঘ ইতোমধ্যে দুর্গত এলাকায় মানুষের তাত্ক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে দুই কোটি ৫০ লাখ ডলার সাহায্য দিয়েছে। সাহায্য হিসেবে জাতিসংঘ দেবে ২৫ মিলিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ২০ মিলিয়ন, যুক্তরাজ্য ১৬ দশমিক ১ মিলিয়ন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ১০ মিলিয়ন, অস্ট্রেলিয়া সাড়ে ৯ মিলিয়ন, কানাডা ৪ দশমিক ৮ মিলিয়ন, ইউ ৪ মিলিয়ন, নরওয়ে ৩ দশমিক ৪ মিলিয়ন, ডেনমার্ক ৩ দশমিক ১ মিলিয়ন, নিউজিল্যান্ড ১ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন, আয়ারল্যান্ড ১ দশমিক ৪ মিলিয়নসহ ভ্যাটিক্যান চীনও বাদ যাবে না।
৮১ বছর বয়সী বৃদ্ধ অ্যারিস্টোন জানিয়েছেন, তারা দুই দিন ধরে না খেয়ে আছেন। তাদের খাবার প্রয়োজন। তাকলোবানের চারপাশে ধ্বংস চিহ্ন ছাড়া আর কিছুই নেই। কিন্তু তারপরও এক শিশু সন্তানের জন্ম কিছুটা হলেও বেদনা ভুলিয়ে দিয়েছে স্বজনহারাদের। তাকলোবানের বিমানবন্দরে ২১ বছর বয়সী এমিলি ওর্তেগা একটি কন্যা শিশুর জন্ম দিয়েছেন। নাম রেখেছেন বিজয়। মৃতদের ভীড়ে এই প্রাণের স্পন্দন হাসি ফুটিয়েছে অনেকের মধ্যে। তবে শিশুটির জন্মকে অলৌকিক হিসেবে দেখছেন তার মা। কেননা ঝড়ে আঘাত হানার সময় তিনি একটি শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন। ঝড়ে আঘাত হানার পর পানির তোড়ে ভাসতে থাকেন তিনি। এরপর পৌঁছে যান বিমানবন্দরে। সেখানে সেনা চিকিত্সকদের সহায়তায় সন্তানের জন্ম দেন।
সরকার যখন এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত তখনই তাকলোবানের একটি কারাগারের অপরাধীরা আরো একটি বড় ধরনের অপরাধ করে বসলো। দেশটির সেনাপ্রধান জানিয়েছেন, কিছু কয়েদি কারাগার ভেঙ্গে সম্প্রতি পালিয়ে গেছে। কারারক্ষী ফাঁকা গুলি ছুঁড়লেও কিছু ফিরে আসে এবং বাকিরা পালিয়ে যায়। ওই জেলে ৬শ’ কয়েদি ছিল। তবে কতজন পালিয়েছে সেই সম্পর্কে তিনি কিছু বলতে পারেননি। জেনেভার অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বলছে, দুর্যোগের কারণে উদ্বাস্তু হয়ে পড়া শতকরা ৯০ভাগ ঘটনাই ঘটে বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো আবহাওয়াজনিত বিপদের কারণে। গত ৬ জুন অসলোতে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে কেন্দ্রটি এই সম্পর্কিত প্রতিবেদন উপস্থাপন করে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত দুই দশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা দু’শ’ থেকে বেড়ে চারশ’ হয়েছে। গত বছরের এশিয়া অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হেনেছে বেশি। আর এর ফলে ভারত, ফিলিপাইন, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, চীন এবং পাকিস্তানের বিপুল সংখ্যক মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছে।