নতুন নীতির প্রতি সন্তোষ চীনাদের

বিশ্বের শীর্ষ জনবহুল দেশ চীন। বর্তমানে জনসংখ্যা প্রায় ১৩৫ কোটি। বিশাল এই জনসংখ্যা যেমন উন্নয়নের হাতিয়ার তেমনি অগ্রগতির প্রতিবন্ধকও। যে কারণে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টিকে একটি কঠোর নীতিমালা গ্রহণে বাধ্য হতে হয়েছিলো। তা হলো এক সন্তান নীতি। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমাতে সত্তরের দশকের শেষদিকে এই নীতি চালু করে দেশটি। কঠোর এই নীতি চালু করে কোনো রকমে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে চীন। এই নীতিটি খুব কড়াভাবে কার্যকর করা হলেও সমালোচনা এড়াতে পারেনি সরকার। এ নীতির কারণে দেশে-বিদেশে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে কমিউনিস্ট সরকারকে। যে কারণে একটু ভিন্ন চিন্তা মাথায় এসেছে তাদের। সেটা হলো এক সন্তান নীতিতে পরিবর্তন আনা। এছাড়া চার দশক আগের থেকে চীনের বর্তমান আর্থ-সামাজিক চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর্থিক শক্তি হিসেবে বিশ্বে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করেছে চীন। জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় তারা অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। এসব দিকও এক সন্তান নীতি শিথিল করার চিন্তা-ভাবনাকে প্রভাবিত করেছে। বর্তমানে খুবই সীমিত সংখ্যক দম্পতির একের বেশি সন্তান নেয়ার অনুমতি রয়েছে। সংখ্যালঘুদের জন্য এই আইন কার্যকর ছিল না। আর গ্রামীণ এলাকায় যে সব দম্পতির প্রথম সন্তান মেয়ে হয়েছে তাদের দ্বিতীয় সন্তান নেয়ার অনুমতি দেয়া হতো। তবে এই নীতি সম্পূর্ণরূপে বাদ দেয়া হচ্ছে না। গত শুক্রবার চীনা সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া’র এক প্রতিবেদনে এ কথা জানানো হয়েছে। নতুন নীতি অনুযায়ী কোনো স্বামী বা স্ত্রী তাদের পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান হলে তারাই কেবল দ্বিতীয় সন্তান নিতে পারবেন। বলা হচ্ছে, চীনের আর্থ-সামাজিক সংস্কারের অংশ হিসেবে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি এক সন্তান নীতি শিথিল করছে। চীনা সরকারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার এত বিশাল যে এর মাধ্যমে কোটি কোটি চীনা নাগরিক উপকৃত হয়েছে। যে কারণে এ পরিবর্তনে কেউ মনক্ষুণ্ন হবে না। এছাড়া এক সন্তান নীতিসহ বিভিন্ন নীতির সংস্কারের বিষয়ে চীনা গণমাধ্যমগুলো আগেই আলোচনা করেছে। এ নীতি শিথিল করার কারণ কি শুধুই আর্থ-সামাজিক? তা অবশ্যই নয়। যত দূর জানা যায়, দিনে দিনে অজনপ্রিয় হয়ে উঠছিলো এই নীতি। চীনের ডানপন্থীরা এই এক সন্তান নীতির সমালোচনা করে আসছেন বহুদিন ধরে। মানবাধিকার কর্মীদের তথ্য মতে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে জোর করে গর্ভপাতের মাধ্যমে এই নীতি কার্যকর করা হয়েছে। যদিও চীনা সরকার বারবার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এর বাইরেও আরো কিছু বিষয় রয়েছে। যেমন, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশটির মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশের বয়স ৬৫ বছরের বেশি হয়ে যাবে। যে কারণে চীনা শ্রমবাজারে বড় চাপ পড়বে। এছাড়া এক সন্তান নীতির কারণে চীনের লৈঙ্গিক ভারসাম্যহীনতাও দিন দিন বাড়ছিলো। কারণ ছেলে সন্তানের প্রতি চীনাদের ঝোঁকটা বেশি। জনসংখ্যাবিদদের মতে, এ দশকের শেষে অতিরিক্ত চীনা পুরুষের সংখ্যা দুই কোটি ৪০ লাখ হবে। যাদের পক্ষে স্ত্রী খুঁজে পাওয়া কঠিনই হবে। এ লৈঙ্গিক বৈষম্য সামাজিক অস্থিরতারও জন্ম দেবে। এক সন্তান নীতি শিথিল করার ঘোষণার পর বেইজিংয়ের জনসাধারণ বিভিন্নভাবে তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। একজন যুবক বলেন, নতুন এই সিদ্ধান্তকে আমি স্বাগত জানাই। আমি পুরনো নীতির সাথে একেবারই একমত ছিলাম না। আমি একটি ছেলে সন্তানের পাশাপাশি একটি মেয়ে সন্তানও চাই। শুধু আমি নই বেশিরভাগ পরিবারই এখন দুটো সন্তান চায়। তবে একজন বৃদ্ধ বলছেন, পুরনো নীতিটিই ভালো ছিল। আমাদের দেশের জনসংখ্যা এক বিলিয়নের উপরে। আমরা যদি এখন দুটো সন্তান নেয়াটা সমর্থন করি তাহলে খুব তাড়াতাড়ি দেশের জনসংখ্যা ২ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে। আমি পুরনো নীতিতেই থাকতে চাই। অন্যদিকে, চীনের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। অনেক দম্পতি বলছে, তার সন্তান নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তি পাবে। সরকারের এ সিদ্ধান্ত জানানোর পর অনেকেই ইন্টারনেটে তাদের সন্তান গ্রহণে আগ্রহের কথা জানিয়েছে। তবে অনেকেই খুশি হতে পারছে না। কারণ চীনের শহরগুলোতে সন্তান লালন পালনে অনেক খরচ। এক সন্তানের লালন-পালন নিয়ে অনেকেই হিমশিম খাচ্ছে। আবার এমন অনেক দম্পতি আছে যারা অনেক আগে এক সন্তান নিয়েছেন। এখন সে সব মায়ের বয়সও বেড়ে গেছে। তারা চাইলে এই বয়সে সন্তান নিতে পারছেন না। এ নিয়েও অনেকের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। তবে অনেকেই বলছেন, এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সন্তান গ্রহণে এক ধরনের বড় স্বাধীনতাও মিলবে তাদের।