পুরুষরা গ্রামছাড়া হত্যা মামলা দায়ের
লিটন বাশার, চরকাউয়া থেকে ফিরে
প্রকাশ : ১৭ নভেম্বর ২০১৩, ২২:৩৭
নগর সংলগ্ন চরকাউয়া ইউনিয়নের চরআইচা গ্রামের পুরুষ সদস্যরা আর কেউ গ্রামে ফিরতে সাহস পাচ্ছে না। কলেজ ছাত্র হত্যাকাণ্ডের জের ধরে আগুনে পুড়িয়ে দেয়া সংখ্যালঘুদের ২৫টি পরিবারের সদস্য এখন একসঙ্গে রান্না করা খাবার খেয়ে বেঁচে আছেন। পরিবারের সদস্যরা তাদের ঘরবাড়ির একটি সুতাও রক্ষা করতে পারেননি। একই বস্ত্রে দু’দিন পার করে দিয়েছেন তারা। শিশুরা পোশাকের অভাবে শীতকষ্টে ভুগছে। পুরুষ সদস্যরা কে কোথায় কেমন আছে সে খবর নেয়ার ফুসরত নেই অনেকেরই। সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের পুরুষ সদস্যদের পাশাপাশি মুসলমান পরিবারের পুরুষ সদস্যরাও গ্রাম ছেড়েছে। থানায় হত্যা কিংবা বাড়ি-ঘরে হামলা-ভাংচুরের ঘটনায় তিন দিনেও মামলা হয়নি। পুলিশ যে ২৫ জনকে গ্রেফতার করেছিল তাদেরকে ৫৪ ধারায় আদালতে সোপর্দ করেছে। নিহত কলেজ ছাত্র পারভেজ গাজীর পিতা সেলিম গাজী গতকাল রবিবার বাদী হয়ে আদালতে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। হত্যাকাণ্ডের শিকার পারভেজ গাজীর পরিবার ও সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্যরা লোমহর্ষক এ ঘটনার জন্য পুলিশকে দায়ী করছেন।
গতকাল রবিবার সরেজমিনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে ভস্মীভূত হয়ে যাওয়া ঘরবাড়ির পাশেই আহাজারি করছেন নারী সদস্যরা। ধ্বংসস্তূপ থেকে কিছুই রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। বৃদ্ধ আলো রানী (৬৫) জানান, ঘরের সিঁদুর থেকে শুরু করে পালিত দু’টি গাভী চোখের সামনেই দগ্ধ হয়ে পুড়ে ছাই হতে দেখেছেন। হামলার পূর্বাভাস পেয়ে অধিকাংশরা ঘরবাড়ি ছাড়লেও আলো রানী জিনিসপত্রের মায়ায় নিজের ঘরেই অবস্থান করছিলেন। বৃদ্ধ স্বামী শ্যামল হালদারকে (৭৫) প্রতিবেশী এক মুসলমানের বাড়ির টেবিলের নীচে লুকিয়ে রেখেছিলেন। চোখের পলকেই হামলাকারীরা আলো রানীকে ঘর থেকে জোরপূর্বক বের করে দিয়ে পেট্রোল ও কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বেলে দেয়। এ দম্পতির একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলে পঙ্গু শন্তু হালদার ইটের ভাটায় নাইট গার্ডের কাজ করতেন। কিছুক্ষণ পর খবর এলো শন্তুকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। এখন আর বেঁচে থাকার কোনো অবলম্বন নেই এই বৃদ্ধ দম্পতির।
১৬টি বসতঘরসহ পার্শ্ববর্তী অন্যান্য বাড়িতে অগ্নিসংযোগের পূর্বে মালামাল লুট করে নিয়ে যায় কতিপয় উচ্ছৃখল যুবক। হামলার সময় তাদের টার্গেটে পরিণত হয় গ্রামের সচ্ছল পরিবার হিসেবে পরিচিত পণ্ডিত বাড়ি। গ্রামবাসীকে প্ররোচণা দিয়ে বিক্ষুব্ধরা অসচ্ছল হিন্দু পরিবারের ঘরে অগ্নিসংযোগ করলেও নেতৃত্বদানকারী সুবিধাবাদীরা সচ্ছল বাড়ি-ঘর থেকে বিভিন্ন মালামাল লুট করে নিয়ে যায়।
হত্যার সাথে জড়িতরাই হামলার মদদদাতা
যারা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত তারাও হামলার সময় উপস্থিত থেকে দু’টি সংখ্যালঘু পরিবারের ঘর রক্ষা করেছেন। রক্ষা পাওয়া ঐ দু’টি ঘরের মালিকদের মধ্যে একজন হাসপাতালের স্টাফ অপরজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। ঐ শিক্ষকের প্রয়াত ভাইয়ের বাড়িতেই বসবাস করত পারভেজকে হত্যার সাথে জড়িত পাভেল দাস ও সোহাগ দাস। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা জানান, যারা পারভেজ গাজীকে হত্যা করেছেন তাদের মদদেই নিরীহ হিন্দু সমপ্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা-ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়েছে। অথচ খুনীরা যে ঘরে বসবাস করত তা অক্ষত রয়েছে।
পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয় পারভেজকে
বাকেরগঞ্জের গোবিন্দপুর থেকে এসে নানা বাড়িতে আশ্রয় নেয়া সোহাগ দাস ও পাভেল দাসের সাথে ব্যাডমিন্টন খেলা নিয়ে বেশ কিছু আগে থেকেই কলেজ ছাত্র পারভেজ গাজী ও তার ছোট ভাই পাভেল গাজীর বিরোধ দেখা দেয়। জানা গেছে, এ বিরোধের জের ধরে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করে সোহাগ, পাভেল, পিযূষ ও ধীমান। তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী ঐদিন কৌশলে পাভেল ও পারভেজকে খেলার মাঠে ডেকে আনা হয়েছিলো। নিহত পারভেজ গাজীর মা জানান, শুক্রবার বিকালে প্রতিবেশী নাসির মোল্লার ছেলে রাজিব মোল্লা বাড়িতে এসে তার ছোট ছেলে পাভেলকে ব্যাডমিন্টন খেলার জন্য মাঠে ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে পাভেল যাওয়ার পরই পিযূষ, সোহাগ, পাভেল ও ধীমান তাকে র্যাগিং শুরু করে। এক পর্যায় তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে নির্যাতন শুরু করে। এরপর পাভেলকে জবাই করার জন্য নির্যাতনকারীরা ধারালো অস্ত্র আনতে গেলে পাভেল কৌশলে পালিয়ে যায়। ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঘটনাস্থলে এসে তারা পাভেলকে না পেয়ে পারভেজের মোবাইলে ফোন করে। পাভেলের কণ্ঠ নকল করে তাকে নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করার আকুতি জানানো হয়। ছোট ভাইয়ের উপর নির্যাতনের খবর পেয়ে ছুটে আসেন বড় ভাই পারভেজ। সাথে সাথে তাকে ধরে জবাই করে হত্যা করা হয়।
এদিকে সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার প্রতিবাদে গতকাল রবিবার নগরীর অশ্বিনী কুমার হলের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদ।
বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে হিন্দু-মুসলিম সংঘাত সৃষ্টির হোতা সাম্প্রদায়িক উস্কানিদাতা উজ্জল বিশ্বাসকে গ্রেফতারের দাবিতে গতকাল (রবিবার) বিকালে বাঁশখালী পৌর শহরে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছে কয়েক হাজার মানুষ। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শ্মশান নিয়ে মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন ও চাঁদা দাবির ঘটনায় বিক্ষুব্ধ জনতা এই বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধনের আয়োজন করে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এমপি সরোয়ার
সংখ্যালঘুদের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা গতকাল রবিবার পরিদর্শন করেছেন সদর আসনের সংসদ সদস্য বিএনপি’র কেন্দ ীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মজিবর রহমান সরোয়ার। তিনি চরকাউয়ার চরআইচা গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের নারী সদস্যদের সাথে কথা বলেন। একই সাথে হত্যাকাণ্ডের শিকার কলেজ ছাত্র পারভেজ গাজীর বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান।