অর্থ পাচার মামলা
বেকসুর খালাস তারেক রহমান মামুনের ৭ বছরের জেল
প্রকাশ : ১৭ নভেম্বর ২০১৩, ২২:৪৭
অর্থ পাচারের মামলায় বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বেকসুর খালাস দিয়েছে আদালত। একইসঙ্গে মামলার অপর আসামি তারেক রহমানের বন্ধু ব্যবসায়ী গিয়াসউদ্দিন আল মামুনকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৪০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। রায়ে আদালত বলেছে, তারেক রহমান ৫০ হাজার ডলারের কিছু বেশি টাকা মামুনের সিঙ্গাপুরের অ্যাকাউন্ট থেকে ভিসা কার্ডের মাধ্যমে উত্তোলনের কথা স্বীকার করে-ছিলেন। ২০০৭ সালে তার আয়কর বিবরণীতেও এ টাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। আর এই মামলাটি হয়েছে ২০০৯ সালে। ফলে অর্থ পাচারের অভিযোগ কোনভাবেই প্রমাণিত হয় না। গতকাল রবিবার ঢাকা মহানগর বিশেষ জজ আদালত-৩ এর বিচারক মোতাহার হোসেন এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার পরই বিএনপিপন্থী শত শত আইনজীবী আদালতপাড়ায় আনন্দ মিছিল ও মিষ্টি বিতরণ করেন। এ সময় বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা ওই মামলা পরিচালনাকারী দুদকের আইনজীবীদের ধাওয়া দেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা রায়ে হতাশা প্রকাশ করেন। দুদক কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, নিশ্চয়ই আমরা এ রায়ে সন্তুষ্ট নই। পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাওয়ার পর আপিলের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
রায় ঘোষণার পরই বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আদালত ন্যায়বিচার করেছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। এ রায়ে আজ প্রমাণ হয়েছে, তিনি একটি পয়সাও কোথাও পাচার করেননি।
এদিকে রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালতপাড়ায় নেয়া হয় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের। আদালত কক্ষের প্রবেশ মুখে বসানো হয় আর্চওয়ে।
প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালের ২৬ অক্টোবর নগরীর ক্যান্টনমেন্ট থানায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তারেক রহমান ও মামুনের বিরুদ্ধে এ মামলা দায়ের করে। মামলায় অভিযোগ করা হয়, টঙ্গীতে প্রস্তাবিত ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনের কার্যাদেশ পাইয়ে দেয়ার কথা বলে নির্মাণ কনস্ট্রাকশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক খাদিজা ইসলামের কাছ থেকে গিয়াস উদ্দিন আল মামুন ২০ কোটি ৪১ লাখ ২৫ হাজার ৮৪৩ টাকা নেন। পরবর্তী সময় সিঙ্গাপুরে এই টাকা লেনদেন হয়। মামলাটিতে বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তা ছাড়াও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) এজেন্ট ডেবরা লেপরোভেটসহ ১৩ জন সাক্ষ্য দেন। মামুনের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন ৫ জন। চলতি বছরের ২৪ অক্টোবর বাদী ও আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে রবিবার রায় প্রদানের জন্য দিন ধার্য করা হয়।
ধার্যকৃত দিনে জজ মো. মোতাহার হোসেন বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে রায় পড়া শুরু করেন। দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে রায় পড়া শেষ হয়। আদেশের অংশটুকু ঘোষণা করে বিচারক এজলাস ত্যাগ করে খাস কামরায় চলে যান। ঘোষিত রায়ে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০০২ এর ১৩ (২) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে মামুনকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। এছাড়া পাচারকৃত ২০ কোটি ৪১ লাখ ২৫ হাজার ৬১৩ টাকা রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করারও নির্দেশ দেয় আদালত। রায় ঘোষণার সময় মামুন কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। তবে মামলার শুরু থেকেই অনুপস্থিত ছিলেন তারেক রহমান।
রায়ে বলা হয়, যদিও মামলার প্রধান সাক্ষী নির্মাণ কনস্ট্রাকশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খাদিজা ইসলাম মামুনকে ঘুষ নয় বরং কনসালটেন্সি ‘ফি’ হিসাবে দিয়েছেন মর্মে সাক্ষ্য দিয়েছেন। মামুনও আত্মপক্ষ সমর্থনে দেয়া বক্তব্যে ওই টাকা নেয়ার কথা স্বীকার করেছেন। কিন্তু ওই পরিমাণ টাকা ‘ফি’ হিসাবে নেয়ার মতো কনসালটেন্সি ফার্ম মামুনের ছিল না। ওই টাকা অনৈতিকভাবে চাপ দিয়ে নেয়া হয়েছে মর্মে প্রমাণিত হয়েছে। কেননা চাঁদাবাজির অভিযোগে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানায় এ মামলা করা হয়েছিল। ওই টাকা দেশে গ্রহণ করলে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হতে পারে আশঙ্কায় বিদেশে টাকা গ্রহণ করা হয়। যা মানিলন্ডারিং আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
রায়ে আরো বলা হয়, মামুনের সিঙ্গাপুরের অ্যাকাউন্ট থেকে ইন্টারন্যাশনাল সাপ্লিমেন্টারী ভিসা কার্ডের মাধ্যমে ৫০ হাজার ডলারের চেয়ে কিছু বেশি টাকা উত্তোলন করে খরচ করেছেন বলে তারেকের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হয়েছে, ওই টাকা খরচ করার কথা তারেক রহমান অস্বীকার করেননি। ২০০৭ সালে তারেক রহমান দুদকে দাখিল করা হিসাব বিবরণীতে তা উল্লেখ করেছেন। সেক্ষেত্রে তারেকের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে খালাস দেয়া হলো। বিগত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে তারেকের বিরুদ্ধে ১৬টি মামলা হলেও এই প্রথম কোনো মামলার নিষ্পত্তি হলো। এর আগে অর্থপাচার একটি মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে ৬ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল ঢাকার একটি বিশেষ আদালত।
অপরদিকে আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীদের তোপের মুখে পড়েন দুদকের আইনজীবীরা। তারা দুদকের আইনজীবীদের গালমন্দ এবং বিচারকের কক্ষের দরজায় লাথি, জানালার গ্লাস ভাঙ্গার চেষ্টা করেন। এ সময় পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
এদিকে রায়ের পরই সুপ্রিম কোর্টে আনন্দ মিছিল বের করে জাতীয়তাবাদী আইনজীবীরা। মিছিলে নেতৃত্ব দেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন এমপি, অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, ব্যারিস্টার নাসিরউদ্দিন আহমেদ অসীম, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরী, অ্যাডভোকেট গাজী কামরুল ইসলাম সজলসহ অর্ধশত আইনজীবী। তারা তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করার অভিযোগে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া
ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম বলেন, মন্ত্রীদের পদত্যাগের কারণে হয়তোবা এই মামলায় আংশিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যদি দুজনকেই খালাস দেয়া হতো সেটা আরো বেশি ন্যায়ানুগ হতো। কারণ এই অর্থ বাংলাদেশ থেকে পাচার করা হয়েছে এমন অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করব।
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, রায়ে আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি। সারা বাংলাদেশের আবাল-বৃদ্ধবনিতা এ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ এবং আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জ্ঞাপন করছে।
মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, এ রায়ে প্রমাণিত হলো ভয় দেখিয়ে বিচারকের বিবেককে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিক্রিয়া
অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, বিচারক পুরো রায় পড়েননি। খণ্ড খণ্ড রায় পাঠ করেছেন। পূর্ণাঙ্গ রায় না দেখে কোন মন্তব্য করব না।
অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, আশা করেছিলাম, আদালত আসামিদেরকে সর্বোচ্চ সাজা দেবে। তবে দেয়নি। রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি হাতে পাওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে।