গুজবের কারণে গার্মেন্টসে শ্রমিক অসন্তোষ, হামলা

গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৫ হাজার ৩০০ টাকা মালিকপক্ষ মেনে নিলেও এই খাতে অসন্তোষ থামছে না। বরং প্রতিদিনই নতুন নতুন ইস্যুতে অসন্তোষ ছড়াচ্ছে। একের পর এক হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে নতুন নতুন কারখানা। শুরুতে ৫ হাজার ৩০০ টাকা বাস্তবায়নের দাবি থাকলেও এখন ৮ হাজার টাকার দাবিতে আন্দোলন হচ্ছে। দেশের অন্য এলাকায় অসন্তোষ খুব একটা দেখা না গেলেও আশুলিয়া ও গাজীপুর ঘিরেই অসন্তোষ হচ্ছে। গার্মেন্টস মালিক, শ্রমিক নেতৃবৃন্দ ও আশুলিয়া এলাকার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, একশ্রেণীর শ্রমিক সংগঠনের নেতারা প্রতিনিয়ত এসব শিল্প এলাকার শ্রমিকদের কাছে নানা গুজব ছড়াচ্ছে। আর সরকারের শেষ সময়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে শ্রমিকদের উস্কে দিতে একটি পক্ষ কাজ করছে। অতি উত্সাহী শ্রমিকরা এসব গুজবে কান দিচ্ছে। মজুরি বোর্ডে শ্রমিক নেতা সিরাজুল ইসলাম রনি’র কাছে গত শনিবার একটি বার্তা এসেছে যে, সাভারে ২ জন গার্মেন্টস শ্রমিককে হত্যা করা হয়েছে। তাদের লাশ সাভারে স্থানীয় একটি হাসপাতালে রয়েছে। তিনি খোঁজ নিয়ে দেখলেন, তথ্যটি মিথ্যা। মালিক পক্ষ ৫ হাজার ৩০০ টাকা মেনে নেয়ার পর একটি তথ্য এখন শ্রমিকদের মধ্যে প্রচার হচ্ছে, তাদের মূল মজুরি কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া দক্ষ-অদক্ষ সব শ্রমিকের মজুরি ৫ হাজার ৩০০ টাকা হবে। সাভারের জামগড়ায় বিজিএমইএ’র সভাপতি আতিকুল ইসলামের মালিকানাধীন ইসলাম গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান রোজ গার্মেন্টস কারখানাও এ গুজবের হাত থেকে রেহাই পায় নি। সেখানে গতকাল রবিবার প্রচার করা হলো, নতুন মজুরি কাঠামো অনুযায়ী, সব শ্রমিকই ৫ হাজার ৩০০ টাকা মজুরি পাবে। অর্থাত্ যারা দক্ষ শ্রমিক (৩ বা ৪ নম্বর গ্রেডে যাদের অবস্থান) তারাও অদক্ষ ব আধা দক্ষদের মত মজুরি পাবে (যে তথ্যটি আসলে সঠিক নয়)। শুরু হলো অসন্তোষ। এর জেরে মালিক পক্ষ কারখানা ছুটি দিতে বাধ্য হলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে প্রায় ৬০টি গার্মেন্টস শ্রমিক সংগঠন রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে সক্রিয়ভাবে কাজ করে মাত্র ১০ থেকে ১৫টি সংগঠন। বাকি সংগঠনগুলো নাম সর্বস্ব। আলোচনার টেবিলে তাদের সরব উপস্থিতি থাকলেও মাঠে শ্রমিকদের সাথে তাদের খুব একটা সম্পর্ক নেই। শ্রমিকদের উপর তাদের কোন নিয়ন্ত্রণও নেই। ফলে শ্রমিকরা আন্দোলন করবে না বলে তাদের প্রতিশ্রুতি কার্যত প্রভাব পড়ে না। গত শনিবার বিজিএমইএর সাথে ৫২টি শ্রমিক সংগঠনের নেতারা বৈঠক করে শ্রমিক আন্দোলন হবে না বলে সমঝোতা করে আসলেও এর পরদিন গতকালই গাজীপুর আশুলিয়ায় ব্যাপক অসন্তোষ হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত প্রায় ১৫ দিন যাবত্ যে বিচ্ছিন্ন শ্রম অসন্তোষ এবং এর জেরে হামলা হয়েছে এর বেশিরভাগই এমন গুজবে ভর করে। এই গুজবের আগুনে ঘি দিচ্ছে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা, রাজনৈতিক গোষ্ঠী, আর কোন কারখানা থেকে সুবিধা নিতে ব্যর্থ হওয়া স্থানীয় চক্র। অনেক সময় কারখানার ঝুট বিক্রি, ছোটখাট কাজ পাওয়া না পাওয়ার হিসাবে কারখানার মালিকপক্ষের সঙ্গে স্থানীয় কোন চক্রের বিরোধ তৈরি হয়। তারা যে কোন উপায়ে কারখানার ক্ষতি করার জন্য এমন অস্থির পরিস্থিতির অপেক্ষায় থাকে। এসব চক্রের অনেকে স্থানীয় বাড়ির মালিক। তাদের বাসায় যে সব শ্রমিক ভাড়া থাকে তাদের ইন্ধন দিয়ে অনেক সময় অসন্তোষ তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া মালিক ও শ্রমিক পক্ষের একটি অংশ মনে করছে, বর্তমান সরকার বিরোধী শক্তি শ্রমিকদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজে লাগাচ্ছে। আশুলিয়া এলাকার শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে জামায়াতের কর্মী ঢুকেছে। তারা শ্রমিকদের উস্কে দিচ্ছে। কিন্তু কারা এমন গুজব ছড়াচ্ছে বা উস্কে দিচ্ছে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারছেন না কেউই। বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, গুজবের মাথা এখানে কিন্তু লেজ যে কার কাছে এর সন্ধান পাচ্ছি না। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, এটি (অসন্তোষ) এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এখন আল্লাহ ছাড়া আর কে রক্ষা করবে? গতকাল ইত্তেফাককে তিনি বলেন, ৩ হাজার টাকার মজুরি ৫ হাজার ৩০০ টাকা হয়েছে। এটিকে কেন স্বাগত জানানো হচ্ছে না? শ্রমিকদের মূল মজুরি কমানো হয়েছে এমন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগে ২ হাজার টাকা মূল মজুরি ছিল এখন সেটি ৩ হাজার টাকা। মজুরি বোর্ডের প্রস্তাব অনুযায়ী ৩২০০ টাকা মূল মজুরি হলেও নতুন কাঠামো অনুযায়ী তা ৩ হাজার টাকা করা হয়েছে। তবে ৫ হাজার ৩০০ টাকার মূল অংকে হেরফের হয় নি। খাদ্য ভাতা বাড়িয়ে ৬৫০ টাকা করা হয়েছে। শ্রমিকদের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে এ খাতকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে বলে মনে করছেন জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক লীগের সভাপতি ও মজুরি বোর্ডে শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধি সিরাজুল ইসলাম রনি। তিনি বলেন, মজুরি নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে কিছু শ্রমিক সংগঠন। তারা সেখানে প্রচার করছে, সব শ্রমিকের মজুরি একই। অথচ এই মজুরি কেবল সহকারী অপারেটর বা অদক্ষ বা আধা দক্ষ শ্রমিকদের। অতিরিক্ত সময়ে কাজ মিলিয়ে একজন অপারেটরের মজুরি ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা হবে। এমন গুজবে কারখানায় অসন্তোষ হলেও সেখানে ট্রেড ইউনিয়ন না থাকায় কেউ দায়িত্ব নিচ্ছে না। ট্রেড ইউনিয়ন থাকলে এমন অসন্তোষের ঘটনা ঘটত না বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, গত তিন বছরের ব্যবধানে এই খাতে ৭৭ শতাংশ মজুরি বেড়েছে। অন্য কোন খাতে এত মজুরি বা বেতন বাড়েনি। এটি নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি থাকার কথা নয়। তিনি অভিযোগ করে বলেন, বর্তমানে অনেক ভুঁইফোড় শ্রমিক সংগঠন রয়েছে, যারা সব ধরনের বৈঠকের যোগ দিয়ে সমঝোতার কথা বললেও শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণে তাদের কোন ভূমিকা নেই। আবার কিছু সংগঠনের নেতারা শ্রমিকরা আন্দোলন করবে না বললেও বাইরে এসে করে তার উল্টোটা। এছাড়া বিজিএমইএ নিজের স্বার্থেও কিছু সংগঠন তৈরি করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।