‘এর চেয়ে সুন্দর বিদায় সম্ভব নয়’
প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০১৩, ২০:৩৪
স্বজন-সতীর্থ-সমর্থকদের সমারোহ, সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধা, পুরনো দিনের কথা মনে করিয়ে দেয়া এক ইনিংস আর ভারতের বিশাল জয়। সব মিলে ক্রিকেট রূপকথার নায়ক শচীন টেন্ডুলকারের বিদায়টা হলো রূপকথার গল্পের মতোই। ভারত তো বটেই গোটা ক্রিকেট বিশ্বকে আবেগের বন্যায় ভাসিয়ে ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর দুইদিন পর ভারতীয় একটি টিভি চ্যানেলকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে শচীন গতকাল নিজেও বললেন, এর চেয়ে সুন্দর কোন বিদায় অনুষ্ঠানের কথা কল্পনা করেননি তিনিও। শুধু বিদায় নয়, ২২ গজের ভেতর-বাহিরের নানা ঘটনা, চব্বিশ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার, ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা প্রভৃতি নানা বিষয় উঠে এসেছে সেখানে। ইত্তেফাকের পাঠকদের জন্য সেই সাক্ষাত্কারের প্রায় পুরোটাই তুলে ধরা হলো।
এর চেয়েও সুন্দরভাবে বিদায় নেয়ার কোন দৃশ্যকল্প কি আপনার ভাবনায় ছিল? দর্শক, আবেগ, আপনার ইনিংস। সবমিলে রূপকথার গল্পের মতোই হলো বিষয়টি। তাই না?
শচীন: সত্যিই তাই। আমার মনে হয় যেই মুহূর্তে আমি অবসরের ঘোষণা দিলাম, ঠিক তখন থেকেই মানুষের প্রতিক্রিয়া ছিল অসাধারণ। লাহলিতে আমি আমার শেষ রঞ্জি ট্রফি ম্যাচ খেলেছি, সেখানে সমর্থকরা দারুণভাবে গ্রহণ করেছে।এরপর কলকাতা গেলাম ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে (সিরিজের) প্রথম টেস্ট খেলতে। সেখানে যেটা হলো, সেটা ছিল অবিশ্বাস্য। যেখানেই আমি গিয়েছি সেখানেই সবাই যেভাবে আমাকে বরণ করে নিয়েছে, সেটা ছিল সত্যিই বিশেষ একটা অনুভূতিকর। আর মুম্বাইয়ের মানুষের প্রতিক্রিয়া ছিল বিস্ময়কর। এ ধরনের বিষয়গুলো আপনি কখনোই পরিকল্পনা অনুযায়ী করতে পারবেন না। এগুলো ছিল পুরোপুরিই স্রষ্টা নির্ধারিত। আমি শুধু সবাইকে ধন্যবাদই জানাতে পারি। ঈশ্বরকেও ধন্যবাদ। কোন সন্দেহ নেই তিনি নিজের হাতেই আমার জন্য এই চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিলেন।
যে বিদায়ী ভাষণ আপনি দিলেন, এরপর অনেকেই এরমধ্যে বলতে শুরু করেছেন যে আপনার রাজনীতিতে আসা উচিত। অথবা শুধু ভাষণ দেয়াকেও আপনি পেশা হিসেবে বেছে নিতে পারেন। কিংবা দুটোকেই।
শচীন: (হেসে)। আমি আসলে একটু অপ্রস্তুত বোধ করছি। তবে আমার মনে হয় একজন খেলোয়াড়ের উচিত মনে-প্রাণে নিজেকে সবসময় খেলোয়াড় মনে করা।
তাহলে এই ভাষণের বিষয়টি কিভাবে মাথায় এলো? আপনি কি এটা আগে থেকেই সাজিয়ে রেখেছিলেন?
শচীন: না। আমার হাতে ধরা ঐ তালিকায় কেবল তাদেরই নাম ছিল যাদেরকে ধন্যবাদ জানানোর বিষয়টি আমি আগে থেকেই চিন্তা করেছিলাম। আমি আসলে চাইনি ঐ নামগুলো থেকে কারো নাম বাদ পড়ুক। তবুও অনেক নামই আমি ভুলে গেছি। আমার জন্য আসলে তখন কথা বলাটা ছিল খুবই কঠিন আর একারণেই আমি সাথে এক বোতল পানিও রেখেছিলাম। বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে গেলেই, আমি বোতলে একটু করে চুমুক দিচ্ছিলাম। তবে কোন সন্দেহ নেই কথাগুলো আমার হূদয় থেকেই উঠে আসছিল। আমার যা মনে হচ্ছিল আমি শুধু সেটাই বলছিলাম। সুতরাং আগে থেকে লিখে আনার কোন বিষয় ওখানে ছিল না।
আপনি যখন প্রথমবার মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে আসছিলেন এবং পরে আবার যখন প্রণাম করতে পিচের কাছে গেলেন, দুই বারই আমরা আপনার চোখে পানি দেখেছি। পুরো স্টেডিয়াম ভর্তি মানুষই তখন চোখ মুছছিল। মাঝ বয়সী মানুষকেও আমরা শিশুর মতো কাঁদতে দেখেছি। দ্বিতীয়বার পিচের কাছে যাওয়াটা আপনার জন্য কতটা কঠিন ছিল?
শচীন: সত্যিই এটা ছিল দারুণ কঠিন। পুরো দল যেভাবে আমাকে বিদায় সংবর্ধনা দিল তাতে আমি সত্যিই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের নবম উইকেটের যখন পতন ঘটলো, আমরা সবাই মাঠের মাঝখানে জড়ো হলাম। তখন ধোনি আমাকে বললো, ‘পা জি আপনি দয়া করে দূরে সরে যান। আমরা আপনাকে নিয়ে একটি পরিকল্পনা করছি। সুতরাং আমরা চাই না আপনি সেটা জেনে ফেলুন।’
আপনারা সবাই হয়তো দেখবেন যে, তখন সবাই মাঠের মাঝে ছিল আর আমি একা ডিপ স্কয়ার লেগের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলাম। আমি ভাবছিলাম তাদের পরিকল্পনাটা কি! আর পরে তারা যেভাবে আমাকে বিদায় জানালো, পুরো বিষয়টি ছিল অসাধারণ। আমি তখন ভাবছিলাম যে এরপর আমি হয়তো চ্যারিটি ম্যাচ বা প্রদর্শনী ম্যাচ খেলবো; কিন্তু ভারতের হয়ে আমার আর খেলা হবে না। আর এই বিষয়টি আমাকে আরো বেশি আবেগাক্রান্ত করে ফেলে। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়ে যাবার পর আমি আবার উইকেটের কাছে যাই মূলত আমাকে এত এত কিছু দেয়ার জন্য ক্রিকেটকে ধন্যবাদ জানাতে। আমি আজ যা কিছু হয়েছি, তার সবকিছুই ক্রিকেটের অবদান। আর যখনই আমি এটা ভাবি, তখনই আমি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি।
আপনি ক্রিকেটের কোন বিষয়টাকে সবচেয়ে বেশি মিস করবেন। ক্রিকেট খেলাটা, সতীর্থদের সাথে কাটানো সময়টাকে নাকি ড্রেসিংরুমের পরিবেশ?
শচীন: আমার মনে হয় সতীর্থদের সাথে কাটানো সময়টা। কারণ, আপনি যখন দলের সাথে থাকবেন তখন সবসময়ই আপনাকে অদৃশ্য একটি শক্তি ঘিরে থাকবে। আপনি যতবারই প্রতিপক্ষের কথা ভাববেন ততবারই আপনার মনে হবে কিভাবে তাদের চাইতে এক ধাপ এগিয়ে থাকা যায়। সুতরাং খাওয়া, সতীর্থদের সাথে মজা করা কিংবা অন্য যেখানেই আপনি থাকেন না কেন আপনার সব সময়ই আপনি ভাবতে থাকবেন কিভাবে নির্দিষ্ট কোন ব্যাটসম্যানকে বল করবেন কিংবা কোন বোলারের বল মোকাবেলা করবেন। অর্থাত্ আপনার অবচেতন মন সবসময়ই খেলা নিয়েই ভাবতে থাকবে। আমার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আর ঘটবে না, এই চিন্তাই আমাকে দুঃখী করে তোলে। ক্রিকেটই ছিল আমার সবকিছু, সুতরাং আমি আর ব্যাট হাতে নেব না এটা চিন্তা করা আমার জন্য কঠিনই বটে। যদি কখনোবা ব্যাট হাতে মাঠে নামিও সেটা হবে নিছকই মজা করার জন্য। সেখানে ব্যর্থ হলে আমাকে নির্ঘুম রাত কাটাতে হবে না। ভারতের হয়ে খেলাটা সব সময়ই ছিল বিশাল এক দায়িত্ব। আর আমি সেখানে কোন কিছুকেই হালকাভাবে নেইনি। আর এখন আমি এমন এক অবস্থায় আছি যখন আমি চাইলেই দুইটি বল খেলতে পারি, না চাইলে না। বল মিস করলেও কোন সমস্যা নেই।
আপনি এখন চাইলেই অর্জুনের সাথে খেলতে পারবেন। তাছাড়া আপনি প্রতিজ্ঞা করেছেন, তার সাথে যে জিনিসগুলো আপনি মিস করেছেন সেগুলো এখন আপনি পালন করবেন।
শচীন: হ্যাঁ, ঠিক। অর্জুন এবং সারার জন্য আমার খারাপ লাগে কারণ আমাকে অনেকটা সময় তাদের থেকে দূরে কাটাতে হয়েছে। জন্মদিন, খেলার দিন, ছুটির দিনগুলোতে বাচ্চারা চায় তাদের মা-বাবার সাথে সময় কাটাতে; কিন্তু অনেক সময়ই ক্রিকেটের সাথে আমার প্রতিজ্ঞার কারণে তাদের সাথে আমি সময় কাটাতে পারিনি। এখন তারা বড় হয়েছে। জীবনের বাকি সময়টা আমি তাদের সাথেই কাটাতে চাই। আর এই মুহূর্তে এটাই আমার মূল কাজ।
মানুষ আপনার কাছ থেকে একটা আত্মজীবনীও হয়তো আশা করে আছে?
শচীন: হ্যাঁ, আমারও ইচ্ছা আছে সেরকম কিছু করার। এর পেছনে অনেক সময় অবশ্য ইতোমধ্যেই ব্যয় হয়েছে, যদিও অনেক কাজই এখনো বাকি আছে। এরকম কিছু বিষয় আছে যেগুলো আমি চাই মানুষ জানুক।
পুরো ক্যারিয়ারের দিকে চাইলে কোন স্মৃতিটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত করে? এটা কি এপ্রিল ২ ২০১১?
শচীন: ঠিক তাই। বিশ্বকাপের চাইতে বড় আর কিছুই হতে পারে না। পুরো জাতিই এই উপলক্ষ উদযাপন করেছে। আমি এমন সব মানুষের সাথে এ বিষয়ে কথা বলেছি যাদের বয়স ৭০ কিংবা ৮০ পেরিয়ে গেছে। তারাও বিশ্বকাপ উপলক্ষে নাচানাচি-লাফালাফি করেছে। বিশ্বকাপের মাহাত্মই এখানে। অনেক বছর খেলার পর নিজের হাতে ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরার ঐ অনুভূতি ছিল সত্যিই অসাধারণ।
তাহলে আপনি নিশ্চিত এটাই আপনার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সুখের মুহূর্ত?
শচীন: (হেসে) এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
আর সবচেয়ে বাজে মুহূর্ত?
শচীন: আমার মনে হয় কিছু কিছু ইনজুরি আমাকে ক্যারিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম আমার ক্যারিয়ার শেষ। তবে তারপরও সবচেয়ে হতাশাজনক সময় হিসেবে আমি বলবো ২০০৩ বিশ্বকাপকে। আমরা বিশ্বকাপের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম। ফাইনালে গিয়ে আমরা সুযোগ হারাই। দারুণ হতাশার ছিল এটি।
আপনি জানেন দেশের মানুষ আপনাকে কি ভাবে। দেশের মানুষের সাথে আপনার যে যোগাযোগ, সেটা কখনোই মলিন হবার নয়। মানুষ মনে করে তারা আপনার কাছে ঋণী।
শচীন: গত সাত দিনে একেবারেই অন্যরকম কিছু অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। আমার কাছে দিনগুলোকে কেমন যেন অবাস্তব লাগে। এমন যেন, আমি ঘুম থেকে জেগে দেখবো আমি স্বপ্ন দেখছি। আপনি কখনোই পরিকল্পনা করে এমন কিছু কখনো করতে পারবেন না। মানুষ শচীন, শচীন বলে চিত্কার করছে আর বলছে ‘অবসরে যেও না শচীন’। এমন কিছুতে আমি সত্যিই অভিভূত। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই চিত্কার আমার কানে বাজবে।