স্মরণীয় বরণীয় :মুনীর চৌধুরী
প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর ২০১৩, ১৯:০০
তাঁকে বলতেই হবে একজন খ্যাতিমান সাহিত্যশিল্পী। বাংলাদেশের সাহিত্যে আধুনিকতার স্থপতি হিসেবেও তাঁকে মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে। ছিলেন একাধারে সফল শিক্ষক, ব্যতিক্রমী নাট্যকার, তীক্ষ্মধী সমালোচক ও দক্ষ অনুবাদক, অন্যদিকে অসাধারণ বাগ্মী— সব মিলিয়ে অভিনন্দন যোগ্য একজন পণ্ডিত।
মুনীর চৌধুরী তাঁর নাম। জন্মে ছিলেন ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জে ১৯২৫ সালের ২৭ নভেম্বর। বাবা আবদুল হালিম চৌধুরী ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। চৌদ্দ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়।
কৈশোর থেকেই মুনীর ছিলেন প্রখর বুদ্ধি আর জ্ঞানের অধিকারী। যুক্তিতর্কে তাঁকে হারাতে পারে এমন লোকের জুড়ি মেলা ছিল ভার। পড়াশোনা করতেন কম, ফলাফল করতেন ভালো। তার প্রমাণ তিনি রেখেছেন জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষায়। ১৯৪১ সালে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ঢাকা বোর্ডের ম্যাট্রিক পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হন প্রথম বিভাগে। আলীগড় থেকে দ্বিতীয় বিভাগে আই.এস.সি পাস করে ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগে, অনার্স কোর্সে। ভর্তি হয়েই যোগ দিলেন ঢাকার বামপন্থী সংগঠন ‘প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘে’। নিজের লেখা গল্প কবিতা পাঠ ছাড়াও ওই সংঘে রাজনৈতিক তত্ত্বীয় আলোচনা হত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ফ্যাসিবাদ বিরোধী তত্পরতা কীভাবে জোরদার করা যায় তার কর্মসূচি গৃহীত হত এবং সাধারণভাবে সাম্রাজ্যবাদ উপনিবেশবাদ, সামস্তবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হত। সংগঠনের সবকিছুতেই তাঁর ছিল সক্রিয় অংশগ্রহণ। এ কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ছোটগল্প রচনাও চলতে লাগল সমান তালে। অল্প সময়ের মধ্যে প্রতিশ্রুতিশীল ছোটগল্পকার হিসেবে তিনি লাভ করলেন পরিচিতি। এ সংঘের এক সাহিত্য সভায় তেতাল্লিশ সালের দুর্ভিক্ষের পটভূমিকায় তীব্র আবেদনময় একটি স্বরচিত গল্পপাঠ করলে সভায় উপস্থিত কথাশিল্পী মানিক বন্দোপাধ্যায় মন্তব্য করেন ‘জিনিয়াস’। ইতোমধ্যে তাঁর পড়াশোনাও অনেকদূর এগিয়ে গেল। ’৪৬ সালে তিনি ইংরেজীতে অনার্স এবং ’৪৭ সালে এম.এ পাস করেন।
মুনীর চৌধুরী ছিলেন অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী মানুষ। সবধরনের ধর্মীয় গোড়ামির বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন একেবারে সোচ্চার। সবার উপরে মানুষ সত্য— এ ধরনের একটি সুমহান চেতনা উঠে এসেছে তাঁর মানুষ নামের সুবিখ্যাত একাংকীকাটিতে। যেখানে সকল সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির ঊর্ধ্বে মানবিক মূল্যবোধ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। ১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সর্বপ্রথম যে সাধারণ ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয় মুনীর চৌধুরী তাতে বক্তৃতা করেন। কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৪৯ সালে ইংরেজীর অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়ে। এক বছর পরেই যোগ দেন ঢাকার জগন্নাথ কলেজে। একই সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাময়িক শূন্যপদে যোগদান করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ আরও অনেক শহীদের প্রাণদানে সারা দেশ জ্বলে ওঠে প্রতিবাদে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আহ্বান করেন প্রতিবাদ সভা। এ সভায় মুনীর চৌধুরীর সক্রিয় ভূমিকা শাসকদের ক্ষুব্ধ করে এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি তিনি নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার হন।
কারারুদ্ধ অবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে এম.এ প্রথম পর্বের পরীক্ষা দেন ১৯৫৩ সালে, সে পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন তিনি। একই সালে তিনি জেলে বসেই রচনা করেন ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে তাঁর বিখ্যাত নাটক ‘কবর’, ১৯৫৫ সালের ৮ আগস্ট তিনি ইংরেজী বিভাগ ত্যাগ করে যোগ দেন বাংলা বিভাগে। ১৯৬২ সালে তিনি রচনা করেন পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ অবলম্বনে ইতিহাসভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ নাটক ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’। এ নাটকের জন্য তিনি লাভ করেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন জাতীয় পরিষদে এক প্রশ্নোত্তরে রবীন্দ্র সংগীত পাকিস্তানের জাতীয় আদর্শ ও ভাবধারার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে বেতার ও টেলিভিশনে রবীন্দ্র সঙ্গীত প্রচার নিষিদ্ধ করেন। ১৯৬৭ সালের ২৩ জুন ‘দৈনিক পাকিস্তানে’-এ খবর প্রকাশিত হলে ১৮ জন বুদ্ধিজীবীর এক বিবৃতিতে প্রথম স্বাক্ষর করেন মুনীর চৌধুরী। একই সালে মোনায়েম খানের ইঙ্গিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বর্ণমালা ও বানান পদ্ধতি সংস্কারের নামে দুরভিসন্ধিমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করলে মুনীর চৌধুরী এর বিরোধিতা করে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে মুনীর চৌধুরী তার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে ১৯৬৬ সালে প্রদত্ত ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’ খেতাব বর্জন করেন। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হবার মাত্র দু’দিন আগে আলবদর বাহিনী তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পণ্ডিত, গবেষক সমালোচক নাট্যকার ও বাংলা টাইপ রাইটারের জন্য নতুন উন্নতমানের কী বোর্ডের উদ্ভাবক মুনীর চৌধুরীর ৮৮তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি জানাচ্ছি আন্তরিক শ্রদ্ধাঞ্জলি।