মুক্তির অপেক্ষায়

প্রতিটি সূর্যোদয়ই তার কাছে মনে হয় নতুন সময়ের বার্তা। তাই খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা নয়, বরং যতদিন বেঁচে থাকা ততদিন নিজের মতো করে জীবনকে উপলব্ধি করা আর উপভোগ করার মধ্যেই জীবন রচনায় বিশ্বাসী এ সময়ের জনপ্রিয় মুখ লাক্সতারকা ফারহানা শাহরীন ফারিয়া। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে মুক্তি পাচ্ছে সামিয়া জামানের পরিচালনায় তার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র ‘আকাশ কত দূরে’। এই চলচ্চিত্র নিয়ে ফারিয়ার প্রত্যাশা ও আগামী ভাবনার গল্প শোনাচ্ছেন মোর্শেদ নাসের ঘুম কাতুরে একজন। দিনের বেশির ভাগ সময় নিজেকে ঘুমের রাজ্যে রেখে দিতেই পছন্দ করেন। তবে প্রতিদিনের ব্যস্ততা, পড়াশোনার চাপ আর মাঝে মাঝেই বাস্তবতা যেন সেই আলসেমিকে ছুটি জানায়। ইদানীং ফিটনেসের চিন্তাটাও মাথায় জমাট বেঁধেছে অনেকখানি। তাই বলে ফিটনেস নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কোনো শখ নেই তার। নিজের ওপর আস্থা আছে পুরোপুরি। শুধু খাদ্য আর খাওয়ার প্রক্রিয়াতে নিজের ইচ্ছার প্রাধান্য দেওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না বলেই মাঝে মাঝে মনে হয় একটু ফিটনেস সচেতন হতে পারলে ক্ষতি কি! এ সবকিছুই যাকে নিয়ে বলা, তিনি হচ্ছেন লাক্সতারকা ফারিয়া। অভিনয়, মডেলিং আর উপস্থাপনার বাইরে তার পরিচয় আইন পেশায় পড়ুয়া একজন হিসেবে। নিজেকে যেমন মিডিয়ার গণ্ডিতে জনপ্রিয় ও খ্যাতিমান একজন হিসেবে দেখতে চান, তেমনি আইন পেশাতেও নিজের একাগ্রতা আর একাডেমিক দক্ষতায় পৌঁছাতে চান ঈর্ষণীয় সাফল্যে। ছোটবেলা থেকেই পর্দাপ্রীতি আছে তার। ছোটপর্দা কিংবা বড়পর্দা যে আখ্যাই দিই না কেন, ফারিয়া আসলে নিজের সাফল্যটা দেখতে চান মিডিয়াতে।’ শুধু এই চাওয়াটাই নয়, বরং ছোটবেলা থেকেই ফারিয়ার স্বপ্ন ছিল খ্যাতিমান হয়ে ওঠা। ক্লাস থ্রিতেই তাই ‘নতুন কুঁড়ি’র মতো প্রতিযোগিতায় নিজের নাম লেখান। তবে তখন থেকেই চারপাশ থেকে শুনতে হয়েছে মিডিয়া সম্পর্কে নানা রকম নেতিবাচক মন্তব্য। অথচ তার অভিজ্ঞতা কিন্তু ভিন্ন। তার মতে, আর সবক্ষেত্রের মতোই মিডিয়াতে যেমন ভালোটা আছে, তেমনি মন্দও আছে। ভালোতে মিশে যাওয়া না মন্দতে হারিয়ে যাওয়া—এর পুরোটাই নির্ভর করে ব্যক্তিগত অভিরুচি আর কর্মপন্থার উপর, এমনটাই বিশ্বাস করেন ফারিয়া। হয়তো কাজের সংখ্যা কম কিন্তু যোগ্যতম ও গ্রহণযোগ্য কাজের মধ্য দিয়েই নিজের অস্তিত্ব সবার কাছে তুলে ধরতে চান তিনি। তার মতে শিক্ষিত, রুচিশীল আর আধুনিক মানসিকতার ছেলেমেয়েরা যদি এই ক্ষেত্রে এগিয়ে না আসে তবে পরিবর্তনটা ধরে রাখা কিংবা এগিয়ে যাওয়ার মিছিলটাকে বেগবান করা হয়তো সম্ভব হবে না। ফারিয়া বিশ্বাস করেন অন্যসব ক্ষেত্রের মতোই এই জায়গাটিও প্রতিযোগিতায় পরিপূর্ণ। যে মডেলিং দিয়ে ফারিয়ার পরিচিতির ক্ষেত্রের সূচনা, সেই মডেলিং জগতেই গত পাঁচ বছরে অনেক নতুন মুখ এসেছে। তাই এই ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার দৌড়টা অসম হয়ে উঠতে পারে খুব সহজেই। সময়ের ধারাবাহিকতায় সব সময়ই যে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকতে হবে এমনটায় বিশ্বাস করেন না ফারিয়া। তাই নিজের দৃঢ়তা, কাজ পছন্দ করার ক্ষেত্রে অভিরুচি আর দূরবর্তী লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতাকেই সময়ের সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করতে চান এই লাক্স তারকা। নোয়াখালীর মেয়ে ফারিয়া লাক্স-চ্যানেল আই সুপার স্টার ২০০৭ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মিডিয়ার সঙ্গে পরিচিতির বড় ব্যাপ্তি ঘটালেও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, তার জীবনের বড় টার্নিং পয়েন্ট বাংলালিংকের কাস্টমার কেয়ারের বিজ্ঞাপনটি। এই বিজ্ঞাপনে একজন কর্পোরেট এক্সিকিউটিভের চরিত্রে নিজেকে অল্প সময়ের ফ্রেমে খুব দৃঢ়ভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন বলেই আজও পথেঘাটে তাকে শুনতে হয় ‘কথা দিলাম’। সত্যিই যেন কথা দিলেন। নিজের কাছেও কথা দেওয়ার ছিল অনেক কিছু। তাই সেই সময়ের সাফল্যে গা না-ভাসিয়ে নিজের কাজ, পড়াশোনা আর পরিবারের চাওয়া-পাওয়াকে সবচেয়ে বেশি বিবেচনায় নিয়েছেন এই প্রিয়মুখ। খুববেশি নাটক কিংবা বিজ্ঞাপন চিত্রে অংশ নেননি। পড়ালেখা আর পরিবারের অমতের কারণেই দীর্ঘ ধারাবাহিক করা হয়ে উঠেনি। বরং এক পর্বের নাটক আর টেলিফিল্মেই বেশি দেখা যায় ফারিয়াকে। বর্তমানে তার তিনটি বিজ্ঞাপনচিত্র বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচার হচ্ছে—‘প্রাণ চাল’, ‘প্রাইম ব্যাংক’ ও ‘প্রাণ আরএফএল চেয়ার’। এ প্রসঙ্গে ফারিয়া বলেন, ‘টিভি নাটকে অভিনয়ের চেয়ে আমি বিজ্ঞাপনে মডেল হিসেবে কাজ করাটাকেই বেশি প্রাধান্য দিই। কারণ একটি নাটক একবার কিংবা দুবার প্রচার হয়ে থাকে। কিন্তু একটি বিজ্ঞাপন বারবার টেলিভিশনে প্রচার হয়। তাই আমি বিজ্ঞাপনে মডেল হিসেবে কাজ করতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।’ ফারিয়া জানান, তার হাতে আরও কয়েকটি বিজ্ঞাপনের প্রস্তাব রয়েছে। পর্যায়ক্রমে তিনি সেগুলোরও শুটিং করবেন। অভিনয়ের একটা বড় আশাবাদ নিয়ে ফারিয়া অপেক্ষা করছেন তার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্রটির মুক্তির দিনক্ষণটির জন্য। সামিয়া জামানের পরিচালনায় ‘আকাশ কত দূরে’ ছবিটি আগামী ৬ ডিসেম্বর মুক্তি পাবে। অনাথ ছেলে বিচ্ছু কখনোবা এতিমখানার অবহেলা আর অত্যাচারের শিকার, কখনোবা অপরাধচক্রের শিকার, আবার কখনও নায়করাজ রাজ্জাকের স্নেহ ও ভালোবাসায় আশ্রিত। অপরাধচক্রের আরেক শিকার পরী। অনাথ ছেলে বিচ্ছু আর পরীর সুখ-দুঃখের অজানা সব কাহিনী নিয়ে এ ছবি গল্প এগিয়েছে। এর কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপ ও গীত রচনা করেছেন জুলফিকার রাসেল। ছবিটি সরকারি অনুদানে নির্মিত। প্রযোজনা করেছে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লি. ও ভার্সা মিডিয়া। ফারিয়া ছাড়াও এ ছবিতে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন নায়করাজ রাজ্জাক, শর্মিলী আহমেদ, মোস্তফা প্রকাশ, মিশা সওদাগর, অঙ্কন প্রমুখ। চিত্রগ্রাহক খায়ের খন্দকার। সংগীত পরিচালনা করেছেন ইবরার টিপু ও বেলাল খান। আবহ সংগীত সুজন বিন ওয়াদুদ। বিভিন্ন গানে কণ্ঠ দিয়েছেন ইবরার টিপু, কণা, বেলাল খান, খেয়া, প্রান্তি প্রমুখ। এই চলচ্চিত্রে অভিনয় প্রসঙ্গে ফারিয়া বলেন, ‘এখানে আমার চরিত্রের নাম পরী। আমি ছোটবেলায় মা-বাবাকে হারাই। ছিবিতে মিশা সওদাগর অন্ধকার জগতের হোতা। সে আমাকে অন্ধকার জগতে নিয়ে যায়। আমি বিভিন্ন ছেলেদের ধোঁকা দিই এবং তাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিই। সব মিলিয়ে আমার চরিত্রটি মজার। এ রকম চরিত্রে অভিনয় করতে পেরে আমি আনন্দিত।’ জীবনের প্রথম চলচ্চিত্র নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কেমন? এমন প্রশ্নের উত্তরে ফারিয়ার সাবলীল উত্তর, ‘প্রথম চলচ্চিত্র নিয়ে প্রত্যাশা সবাই করে। আমি মনে করি সামিয়া আপু যেহেতু ছবিটি নির্মাণ করেছেন, তাই দর্শকরা ভালোভাবেই নিবে। আর আমিও চেষ্টা করেছি সর্বাত্মক ভালো অভিনয় করতে।’ সংখ্যাতত্ত্বে বিশ্বাস করেন না বলেই কাজের গুণাগুণ নিয়েই তার প্রত্যাশা বেশি। কতগুলো কাজ করলেন সেই হিসাব নয়, বরং কত ভালো কাজ করলেন আর নিজের কাছে সেই কাজের সাফল্যের বিবেচনা কতটুকু তাই প্রধানতম হয়ে উঠে। শুধু কাজের ক্ষেত্রে নয়, জীবনের স্বপ্নের ক্ষেত্রেও ফারিয়ার ভাবনা তেমনই। প্রতিটি সূর্যাস্ত তার কাছে মনে হয় শেষ সময়ের বার্তা। তাই খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা নয়, বরং যতদিন বেঁচে থাকা ততদিন নিজের মতো করে জীবনকে উপলব্ধি করা আর উপভোগ করার মধ্যেই বেঁচে থাকতে চান। জীবনসঙ্গী হিসেবে এমন একজনকে চান যিনি তাকে তার মতো করে বাঁচতে শেখাবে, ভালোবাসবে আর তার চারপাশটা ভরে রাখবে। যে মানুষটা এই অনুভূতিকে ধারণ করতে পারবে তাকে রাজপুত্র না হলেও চলবে। শুধু জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সে যেন তার সর্বস্ব দিয়ে তাকে সুখী করতে চায়—এতটুকুই প্রত্যাশা।